মেইন ম্যেনু

বৃহত্তম ঈদ জামাতের জন্য প্রস্তুত ঐতিহাসিক শোলাকিয়া

প্রতিবছরের মতো এবারও উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে। এবারের ঈদ জামাত হবে এ ঈদগাহ ময়দানে ১৮৯তম । ইতোমধ্যে ঈদ জামাত অনুষ্ঠানে সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠেয় এ ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ।

জামাতে অংশ নিতে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে ঈদগাহ কমিটির পক্ষে । মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য এবারও থাকছে শোলাকিয়া স্পেশাল নামের দুটি ট্রেন। সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে ময়মনসিংহ থেকে একটি ট্রেন ছেড়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশানে পৌছাবে সকাল সাড়ে ৮টায়। এছাড়াও ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ স্টেশানে আসবে সকাল ৮টায়। দুটি ট্রেনেই দুপুর ১২টার দিকে ছেড়ে যাবে বলে জানিয়েছে কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন মাস্টার জহিরুল ইসলাম।

শোলাকিয়ায় গত বছর মুসল্লি সমাগম ছিল ৩ লক্ষাধিক। লাখো মুসল্লিদের সঙ্গে নামাজ আদায় করলে দোয়া কবুল হয়, সেই আশায় এবারও শোলাকিয়া ঈদগাহে দেশ-বিদেশের লাখো-লাখো মানুষের ঢল নামবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ঈদ জামাত নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠের বিভিন্ন প্রবেশ পথে থাকছে মেটাল ডিটেক্টর ও ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা। মাঠের প্রতিটি প্রবেশ পথে থাকবে র্যা ব-পুলিশের নিরাপত্তা চৌকি। নামাজ শুরুর আগে পুরো মাঠ তল্লাশী করা হবে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে। ইতোমধ্যে ঈদগাহ ময়দানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন খান মাঠ পরিদর্শন করতে এসে সংবাদকর্মিদের বলেন, মুসল্লিরা যাতে নির্ভয়ে এবং নিরাপদে এই শোলাকিয়া মাঠে নামাজ আদায় করতে পারেন সেজন্য ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যেকোন ধরনের নাশকতা এড়াতে গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ মাঠে থাকবে।

তিনি বলেন, যেহেতু এটি একটি ঐতিহাসিক ঈদগাহ ময়দান এবং লাখ লাখ মুসল্লির সমাগম ঘটে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।

ঈদ জামাতের জন্য শোলাকিয়া মাঠ পুরোপুরি প্রস্তুত জানিয়ে জেলা প্রশাসক ও মাঠ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, মুসল্লিরা যেন নিরাপদে নামাজ আদায় করতে পারেন, সেজন্য সব ধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দুর-দুরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের জন্য ঈদের আগের রাতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করতে রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যসহ বিশিস্ট নাগরিকদের আমন্ত্রণ জানানোর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করা হচ্ছে এবারও লাখো লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগম ঘটবে। সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণভাবে ঈদের জামাত সম্পন্ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে। মসনদ-ঈ-আলা ঈশাখাঁর ষষ্ঠ বংশধর দেওয়ান হয়বত খানের উত্তরসুরী দেওয়ান মান্নান দাদ খান ১৯৫০ সালে ৪ দশমিক ৩৫ একর ভূমি শোলাকিয়া ঈদগাহকে ওয়াকফ করে দেন। এ মাঠের বর্তমান জমির পরিমাণ হয়েছে প্রায় ৭ একর। মাঠে প্রবেশের মূল সড়কে একটি তোরণ ও একটি দ্বিতল মিম্বর রয়েছে।

শোলাকিয়া কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের একটি বৃহৎ ও পুরাতন জনবসতি এলাকা। বর্তমান শোলাকিয়ার পূর্বনাম ছিল রাজাবাড়িয়া। কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্ব উত্তরকোনে নরসুন্দা নদীর অববাহিকায় শোলাকিয়া এলাকাটির অবস্থান। জনশ্রুতি আছে যে, শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রথম বড় জামায়াতে সোয়ালাখ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্য মতে মূঘল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়ালাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়ালাখ থেকে সোয়ালাখিয়া, সেখান থেকে বর্তমান শোলাকিয়া নামের উৎপত্তি।

দেওয়ান মান্নান দাদ খান যে জমি ১৯৫০ সনে ওয়াকফ করেছেন, সে ওয়াকফ নামায় ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত হয়ে আসছে বলে লেখা আছে। সে হিসেবে মাঠের বর্তমান বয়স ২৬২ বছর। এছাড়া জানা যায় যে, ১৮২৮ সাল থেকে জঙ্গলবাড়ির জমিদার এ মাঠে নামাজ পড়তে শুরু করেন। তখন থেকে বড় জামাত শুরু হয়। সে হিসেবে শোলাকিয়া ঈদগাহে এবার ঈদুল ফিতরের ১৮৯তম জামাত অনুষ্ঠিত হবে।

১৯৫০ সন থেকে ওয়াকফের দলিল মূলে হয়বতনগর জমিদার বাড়ির দেওয়ান মান্নান দাদ খান থেকে বংশানুক্রমিক জৈষ্ঠ্য পুত্রগণ শোলাকিয়া ঈদগাহের মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমানে দেওয়ান ফাত্তাহ দাদ খান মঈন মোতাওয়াল্লী ও দেওয়ান মো. রউফ দাদ খান নায়েবে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করছেন। ১৮২৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় জামায়াতের ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমদ। বরকতময় শোলাকিয়া ঈদগাহে যুগে যুগে খ্যাতনামা আলেমগণ ইমামের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

২৬৫টি কাতার সম্বলিত শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতি বছর লাখ লাখ মুসল্লির সমাবেশ ঘটে। ঈদের নামাজ মাঠে পড়া সুন্নতে মোয়াক্কাদা এবং যে জামায়াতে মুসল্লি যত বেশি হয় ছওয়াব ও তত বেশি হয় ও গোনাহ মাফ হয়। এ বিশ্বাস থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ মাঠে নামাজ পড়তে আসেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের এ বিশাল জামাতে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মুসল্লির সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মুসলমান নামাজে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ভারত, মিশর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু মুসল্লি প্রতিবারই এ মাঠে নামাজ আদায় করে আসছেন।

বিশাল এই জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে বন্দুকের তিনটি গুলি ফুটিয়ে সতর্ক করা হয়। এরপর তিন মিনিট আগে ২টি এবং নামাজ শুরুর এক মিনিট আগে ১টি গুলি ফুটিয়ে নামাজের নিয়ত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই রীতি চলে আসছে শোলাকিয়া ঈদের মাঠে।

ঈদগাহ ময়দানের পশ্চিম দিকে বসা ঈদ মেলাটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই মেলায় বেতের সুন্নতী লাঠিসহ বিভিন্ন গৃহস্থালী সামগ্রির সাজানো পসরা মুসল্লিদের আকৃষ্ট করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরেই শোলাকিয়া মাঠের এই মেলাটি বসে আসছে।






মন্তব্য চালু নেই