মেইন ম্যেনু

বোকা মেয়ের ডায়রি: আপনার স্তন কেবলমাত্র দুটি মাংসপিণ্ড নয়!

এই লেখাটি নিয়ে আমি বসে আছি আজ প্রায় ৪ মাস। প্রতিদিনই ভাবি লিখব। কিছুদূর লেখার পর আর ইচ্ছে হয় না। কেননা আমি জানি, এই লেখাটি আমি যাদের জন্য লিখব, তাঁরাই আমাকে সবচাইতে বেশী গালিগালাজ করবেন।

হ্যাঁ, এই লেখাটি কেবলই মেয়েদের জন্য। এবং পড়ার আগেই, কেবল শিরোনাম দেখেই যে অনেক নারী আমার ওপরে রুষ্ট হবেন, বাজে মন্তব্য করবেন সেটা আমি নিশ্চিত জানি। পড়ার পর খুব কম নারী আমার সাথে একমত হবেন এবং বাকিরা আরও দুটি কথা শোনাবেন আমাকে, সেটাও আমার জানা। কিন্ত তবুও আমি কথাগুলো লিখব। কারণ কিছু কথা বলতে হয়। কিছু কথা গালাগাল শোনার পরও লিখতে হয়। এখন সময় এসেছে বদলাবার। কাউকে না কাউকে তো পরিবর্তনের সূচনা করতেই হবে। এই কথাগুলো, নিজের জীবনের এই অভিজ্ঞতাটি না বলতে পারলে নিজের ভেতরেই মাথা কুটে মরতে থাকব আমি।

লাইফ স্টাইল বিষয়ক লেখালিখি করি বলে আবার ইনবক্স বা পেজে মেসেজের কখনো অভাব হয় না। কোন খাবারের কী রেসিপি থেকে শুরু করে ব্রেকআপ, সন্তানের মাদকাসক্তি, পারিবারিক অশান্তি, রূপচর্চা ইত্যাদি হরেক রকম বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করেন অনেকেই। এবং সত্যি বলতে কি, বিষয়টিতে আমি খুবই সম্মানিত বোধ করি। সম্মানিত বোধ করি এই কারণে যে কিছু মানুষ নিজের সমস্যাটি শেয়ার করার মত যোগ্য মনে করেন আমাকে। যাই হোক, এত সব সমস্যার ভিড়ে নারীদের কাছ থেকেই প্রশ্ন আসে বেশী। কিন্তু আন্দাজ করতে পারেন কি, কোন প্রশ্নটি সবচাইতে বেশী পাই?

না, আন্দাজ করতে পারছেন না। আসলেই না। অন্য সকল প্রশ্নের চাইতে সবচাইতে বেশী প্রশ্ন করেন নারীরা তাদের স্তন বিষয়ে। কীভাবে স্তন আরও বড় করবেন, কীভাবে ব্রেস্ট ইমপ্ল্যান্ট করাবেন, কোথায় গেলে এইসব ইমপ্ল্যান্ট করাতে পারবেন, ছোট স্তনের সমস্যা ইত্যাদি বিষয়ে হরেক রকমের প্রশ্ন করেন তারা। আমি সাধারণত এসব প্রশ্নের জবাব দিই না। দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। নিজের স্তনকে একজন নারী যদি কেবলই পুরুষের “মনোরঞ্জনের” জন্য জরুরী মাংসপিণ্ড হিসাবে দেখতে চান, সেক্ষেত্রে আমার বলার কিছুই নেই। মাঝে মাঝে অবাক হই এটা দেখে যে একজন নারীও স্তন ক্যান্সার বিষয়ক কিছু জিজ্ঞেস করেন না। এত ভয়াল এই রোগটি সম্পর্কে কারো কোন রকমের সচেতনতাই নেই। কোন প্রশ্ন নেই, কোন জিজ্ঞাসা নেই, যেন রোগটি তেমন আহামরি কিছুই নয়।

হয়তো এই বিষয়টি নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না একেবারেই। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে একজনের সাথে আমার পরিচয় ঘটে, এবং তারপর যে ঘটনাগুলো ঘটে সেটা আমাকে বড় ধরণের ধাক্কা দেয়। সেই ঘটনাটি বলার জন্যই এত বড় একটা লেখার অবতারনা।

একটি মেসেজ আসে আমার ফেসবুক আইডিতে। সঙ্গত কারণেই আম নাম প্রকাশ করছি না। একজন ভদ্রমহিলা লিখেছেন বাংলিশে-

“আমার বয়স ৩৬, দুইটি বেবি আছে। আমার স্তন অনেক ছোট। বাচ্চা হবার পরও অনেক ছোট। আমি অনেক রকমের ক্রিম ইউজ করেছি কিন্তু স্তনের শেপ সুন্দর হয় না। বরং মনে হচ্ছে একটা স্তনের শেপ কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে মনে হয়, ঝুলে গেছে। আমি স্তন বড় করতে চাই। আমার স্বামীর বড় স্তন খুব পছন্দের। এটা নিয়ে সে আমাকে কথা শোনায়। বিয়ের পর থেকেই শোনায়। প্লিজ এমন একটা ক্রিমের নাম বলো যেইটা স্তন বড় করবে। আমার খুব প্রয়োজন।”

মেসেজটি পড়ে বলাই বাহুল্য যে আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়। বয়সে ভদ্রমহিলা বড়, দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর কিছু লেখা থেকে বিরত থাকি। কিন্তু একটি লাইনে চোখ আটকে যায় “বরং মনে হচ্ছে একটা স্তনের শেপ কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেছে। চামড়া কুঁচকে গেছে মনে হয়।” এটা পড়ে কেমন যেন খটকা লাগে। বিনা কারণে স্তনের আকৃতি কেন নষ্ট হবে আর চামড়া কুঁচকে গেছেই বা কেন মনে হবে? যাই হোক, আমি মহিলাকে আজেবাজে ক্রিম ব্যবহার করতে মানা করে অবিলম্বে ডাক্তারের কাছে যেতে বলি। মহিলা খানিকক্ষণ পীড়াপীড়ি করেন ক্রিমের নামের জন্য। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করি যে বিষয়টি স্তন ক্যান্সার হতে পারে। ডাক্তারের কাছে গিয়ে একবার চেকআপ করাতে কোন অসুবিধা নেই। জবাবে তিনি লেখেন- স্তন ক্যান্সার “খারাপ” মেয়েদের হয়। যেসব মেয়েদের স্তন ক্যান্সার হয়, তিনি মোটেও তেমন কোন মেয়ে না। জীবনে কোন খারাপ কাজ করেন নি ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বলে তিনি আমাকে ব্লকও করে দেন।

বিষয়টি আমি ভুলেই গেছিলাম। কিন্তু মার্চের শেষে আমার কাছে আরও একটি মেসেজ আসে। ভদ্রমহিলা আমাকে আনব্লক করেছেন এবং মেসেজ পাঠিয়েছেন। হ্যাঁ, শেষমেশ তিনি ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। এবং হ্যাঁ, সেটা স্তন ক্যান্সারই ছিল। স্তন বড় করার চক্করে তিনি সারা জীবন এটা সেটা মেখেছেন স্তনে, অথচ নিজের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র খেয়াল করেন নি। স্বামী বড় স্তন পছন্দ করে বলে সেটাকে বাড়ানোর কৌশল নিয়ে ভেবেছেন, একবার মনে করেন নি যে স্তনের অসুখে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

তিনি সেদিন জানিয়েছিলেন যে তাঁর একটি স্তন কেটে ফেলতে হয়েছে। যদিও তাতে ক্যান্সার নির্মূল হয়নি, স্তনে আশেপাশের সমস্ত এলাকায় সেটি ছড়িয়ে গেছে। কেমো শুরু হতে চলেছে। তাঁর বেঁচে থাকার খুব ইচ্ছা। বাচ্চাগুলোর কথা ভেবে সারাদিন কাঁদেন আর আল্লাহকে ডাকেন।

সেই ভদ্রমহিলার সাথে আমার আর কথা হয়নি। মেসেজ পাবার কিছুদিন পর তাঁর আইডিটি ডিএকটিভ হয়ে যায়। আমি জানিনা তিনি বেঁচে আছেন কিনা। আশা করি তিনি বেঁচে আছেন, ধরে নিই যে হয়তো খুব অসুস্থ অবস্থায় আছেন তাই আর যোগাযোগ করেন নি… আমি আশা নিয়ে থাকতে চাই যে তিনি বেঁচে আছেন। একদিন তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তাঁর বাচ্চাদুটিকে বুকে আগলে বেঁচে থাকবেন। আমি আজীবন এই আশাটি নিয়ে অপেক্ষা করবো তাঁর মেসেজের…

পরিশিষ্ট

স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা মূলক পোস্ট আমি প্রায়ই লিখি। প্রিয়.কম হতে নিয়মিত প্রকাশ করি স্তন ক্যান্সার বিষয়ক লেখা। এবং সত্যি বলি, বেশিরভাগ মানুষ আমাদের গালাগাল করেন। কেউ জানতে চান না ভয়াল এই রোগটি সম্পর্কে, কেউ জানাতে চান না। মেয়েদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি নিয়ে সবাই কথা বলতে চান, মেয়েদের স্বাস্থ্য নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না। বরং আমরা জানাতে চাই বলে কুৎসিত গালাগাল শুনি প্রতিনিয়ত।

নারী, আপনাকেই বলছি…
আপনার স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন হতে হবে আপনাকেই। আপনার হয়ে এই কাজটি অন্য কেউ করে দেবে না। আপনার স্তন আপনার শরীরের দুটি অংশ, আপনার দেহের দুটি মূল্যবান অঙ্গ। এই কারণে মূল্যবান নয় যে আপনার স্তন দুটি পুরুষের কাছে আকর্ষণীয়। বরং এই কারণে মূল্যবান যে দেহের এই অঙ্গে অসুখের কারণে আপনি প্রাণ হারাতে পারেন। এই স্তন দিয়েই সন্তানকে দুধ পান করান আপনি। আপনার স্তন দুটি কেবল পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরি মাংস পিণ্ড নয়। স্তনকে কীভাবে বড় করা যায়, সেটার চাইতে অনেক বেশী জরুরী এই যে কীভাবে আপনি একে সুস্থ রাখবেন।

একটা কথা মনে রাখবেন, স্তন ক্যান্সারের সাথে আপনার চরিত্রের কোন সম্পর্ক নেই। স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতন হলে আপনি চরিত্রহীন হয়ে যাবেন না। এই অসুখ যে কারো হতে পারে, যে কোন বয়সে হতে পারে। এবং আর্লি স্টেজে ধরা পড়লে এই অসুখটি নিরাময় করা সম্ভব। কেবলমাত্র লজ্জা পেয়ে… হ্যাঁ, কেবলই লজ্জার কারণে গোপন করে আমাদের আগে অসংখ্য নারী এই অসুখে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্ত এখন সময় এসেছে বদলাবার। এখন সময় এসেছে সচেতন হবার। লজ্জা নয়, সচেতনতা জরুরী।

আপনার শরীরটিকে যদি আপনি নিজেই সম্মান না করেন, কোন পুরুষ একে সম্মান করবে বা আপনার স্বামী-প্রেমিক এই শরীরকে সম্মান করবে সেটা ভেবে নেবেন না। যে পুরুষ আপনার স্তনের আকৃতি দেখে আপনাকে ভালবাসবে, তেমন ভালোবাসার আসলে কোন প্রয়োজন নেই। কেননা সেটা ভালোবাসাই নয়! অনুগ্রহ করে স্তন বড় করার জন্য বাজারে প্রচলিত ক্রিম গুলো মাখবেন না। চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ নিয়ে নিজেকে বড় ধরণের ঝুঁকির মাঝে ঠেলে দেবেন না। প্লিজ! (রুমানা বৈশাখী)






মন্তব্য চালু নেই