মেইন ম্যেনু

বোবা এবং কানে শুনে না, তবুও পরীক্ষায় চমক দেখালেন সুমাইয়া

হাস্যময় মুখ। কোনো বিষণ্নতা তাকে স্পর্শ করেনি। চোখভরা স্বপ্ন। নির্মল চেহারার ঝকঝকে মেয়ে। কিন্তু সে কথা বলতে পারে না, কানেও শোনে না। ভরসা শুধু এক জোড়া চোখ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকেরা যখন পড়াতেন, তখন শুধু চেয়ে থাকত। কাগজের টুকরো এগিয়ে দিত সহপাঠীর দিকে। পাঠের বিষয় ও বাড়ির কাজ লিখে দিত সহপাঠীরা। বাড়িতে এসে বইখাতা খুলে পড়ার টেবিলে আপন মনে পড়ত। প্রতিবারই পরীক্ষা শেষে ফলাফলে চমকে দিত সবাইকে।

নাম তার সুমাইয়া রহমান ওরফে রিয়া। বগুড়ার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী এই অসামান্য মেয়ের সাফল্যে বাবা-মা তো বটেই, শিক্ষক-সহপাঠীরাও আনন্দিত, আপ্লুত। সুমাইয়া বগুড়া শহরের ফুলবাড়ী এলাকার জাহেদুর রহমান ও মাসুমা রহমানের মেয়ে। শহরের তালুকদার মার্কেটে স্টেশনারির ব্যবসা করেন বাবা। মা গৃহিণী। দুই বোন, এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট সে।

বাবা জাহেদুর রহমান বলেন, শুধু পড়াশোনা নয়, খুব ভালো ছবি আঁকে রিয়া। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ৮০টির মতো পুরস্কার পেয়েছে। ওর ঘরভর্তি ক্রেস্ট, পদক ও সনদ। শ্রেণিকক্ষে পড়া না শুনেও কীভাবে এমন ফলাফল করা সম্ভব হলো, তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন কী এসব বিষয় লিখে জানতে চাই সুমাইয়ার কাছে। লিখিত উত্তরে সে জানায়, ‘কথা বলতে পারি না। কানেও শুনি না। তবে ইশারায় বুঝে নিই। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখছি, পড়াশোনা করে বড় কিছু হব। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই। সবাই বলে বোবাদের ভরসা চারুকলা। কিন্তু আমি চারুকলায় পড়তে চাই না। উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ব্যাংকে চাকরি করতে চাই। আমি ভালোভাবে কম্পিউটার চালাতে পারি। কম্পিউটার চালাতে মুখের ভাষার প্রয়োজন হয় না। কানেও শুনতে হয় না। কী কাজ করতে হবে, কেউ লিখে দিলেই আমি তা কম্পিউটারে করতে পারব। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কেও ভালো ধারণা আছে আমার।’ সুমাইয়া আরও লেখে ‘বাধা পেরিয়ে শুধু ইচ্ছে শক্তির জোরেই এ ফল করেছি। তবে মা-বাবা এবং শিক্ষক ও সহপাঠীরা ইশারায় আমাকে পড়া বুঝতে সাহায্য করেছে। ভবিষ্যতে প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে স্বপ্ন ছুঁতে চাই।’

মা মাসুমা বললেন, ‘স্বাভাবিক জন্ম হয়েছিল মেয়েটার। দুই বছর বয়স পর্যন্ত বুঝতে পারিনি, মেয়ে আমার বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। বড় হতে থাকে, মুখে কথা ফোটে না। তখন বুঝতে পারি ও জন্মপ্রতিবন্ধী।’ বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন বছর বয়সে শহরের একমাত্র মূক ও বধির স্কুলে সুমাইয়াকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু ওখানে কিছুই শিখতে পারে না। ছয় মাস পর ভর্তি করা হয় ফুলবাড়ী এলাকার একটি কিন্ডারগার্টেনে। প্রেমা নামের একজন নারী শিক্ষক বাড়িতে এসে তাকে বর্ণমালা শেখান। পড়ালেখার প্রতি তার ব্যাপক আগ্রহ দেখে নার্সারিতে ভর্তি করে দেওয়া হয় শহরের আর্মড পুলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজে।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মেয়েটা বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী হলেও অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তুখোড় মেধাবী। সহপাঠী ও শিক্ষকেরা লিখে ওকে পড়া বোঝাতেন। তাতেই স্বাভাবিক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সে প্রতিযোগিতা করেছে। প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। এসএসসিতেও চমকে দিয়েছে।-প্রথম আলো






মন্তব্য চালু নেই