মেইন ম্যেনু

ব্যতিক্রম স্বপ্নের মানুষ তারানা হালিম

একেক মানুষের স্বপ্ন থাকে একেক রকম। কেউ হতে চান চিকিৎসক, কেউবা প্রকৌশলী, বৈমানিক কিংবা আইনজীবী। সেখানে তার স্বপ্ন ছিল ব্যতিক্রম। রাজনীতিতে আসবেন, রাজনীতি করবেন সেটা জীবন গঠনের শুরুতেই নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন তিনি। এখন তিনি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য। তিনি অ্যাডভোকেট তারানা হালিম। আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। একজন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠক। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির এই রাজনীতিবিদ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়ও।

তারানা হালিমের জন্ম চট্টগ্রামে। বাবা মরহুম এম এ হালিম (প্রথমে আয়কর কমিশনার পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব) ও মা আখতার হালিমের (স্কুলশিক্ষিকা) তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি। প্রাথমিক শিক্ষাশেষে ১৯৮২ সালে আজিমপুর অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন তারানা হালিম। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে মেধাতালিকায় নবম স্থান লাভ করেন তিনি। এরপর ১৯৮৪ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি প্রথম বিভাগে। এবারও ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে তার অবস্থান নবম। পরিবারের বেশির ভাগই ছিলেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তাই বাবা মায়ের ইচ্ছা ছিল বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বড় কর্মকর্তা হবেন, নিদেনপক্ষে বিচার বিভাগে যোগ দিয়ে বিচারক হিসেবে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে সঁপে দেবেন। কিন্তু রক্তে যার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেতনা, চিন্তা, ধ্যান ধারণাতেও, তিনি তো তাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করবেন। এইচএসসি পাসের পর তারানা হালিম ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি।

সুঅভিনেত্রী হিসেবে নাম ছিল তার। জীবনের প্রথম অভিনয় করেন মাত্র ৫ বছর বয়সে, ছোটদের নাটক ‘ঘুঘু ও শিকারী’ নাটকে পিঁপড়া চরিত্রে। এরপর আলোচিত নাটক ‘ঢাকায় থাকি’তে অভিনয় করেন কলেজে ওঠার পরপরই। আলোচনায় আসেন বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিয়া ভাই’ খ্যাত ফারুকের সঙ্গে তার ছোট বোনের চরিত্রে ‘সাহেব’ নামের ছবিতে অভিনয় করে। তখন কেবল দশম শ্রেণীর ছাত্রী তিনি। চলচ্চিত্রে অভিনয় সেই শেষ। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালে ‘অয়োময়’ নাটকে মদিনা চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেন তারানা হালিম।

তারানা হালিম জানান, কৈশোর বয়স থেকেই বঙ্গবন্ধুর প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা, সম্মান ও ভালবাসা জন্মে তার। তখন থেকেই রাজনীতির প্রতি ঝোঁক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ঝোঁক আরও বেড়ে যায়। অবশ্য পরিবারে রাজনীতির কোন ইতিহাস না থাকলেও স্বাধীন বাংলার স্থপতি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অন্ধভক্ত ছিলেন পিতা এম এ হালিম। তিনিই তাকে বঙ্গবন্ধু ও বিভিন্ন মনীষীকে নিয়ে লেখা বই পড়তে দিতেন। বই পড়তে পড়তেই তার ভাষায় ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হই আমি’। একসময় বাবাকে অবাক করে দিয়ে বলে দিই ‘আমি রাজনীতি করবো, তাই সরকারি চাকরি করা সম্ভব হবে না’। তবে এ নিয়ে পরিবারের কেউই উচ্চবাচ্য করেনি। রাজনীতিতে আসার পর তারাও তাকে যথেষ্ট উৎসাহ উদ্দীপনা দিয়েছেন। পরিবার থেকেই শিক্ষা পেয়েছেন আদর্শিক জীবনযাপনের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালেই যুবলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। তারপর পর্যায়ক্রমে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে একই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আলোচিত এই নারী নেত্রী।

রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই তার আদর্শ জানিয়ে তিনি বলেন, আমি তাকে স্বচক্ষে দেখিনি। কিন্তু তিনি ৪০ বছর আগে যা বলেছিলেন আজকে তারই প্রতিফলন দেখতে পারছি। তার মানে আজকের যে বাংলাদেশ সেই স্বপ্ন তিনি আগেই দেখেছিলেন। তার কন্যা শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছেন। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, তার ত্যাগ, তার ভিশন, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্য, আসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাংলার মানুষের প্রতি তার ভালবাসা আমাকে এত আপ্লুত করে যে, মনে হয় আজ আমি মরে গেলে যদি তিনি ফিরে আসতেন তাতেও আমি রাজি।

তারানা হালিম জানান, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় বন্দি শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য রাজপথে নেমে পড়েন তিনি। আওয়াজ তোলেন ‘শেখ হাসিনার মুক্তি চাই’। তিনি বলেন, নেত্রী গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই সাব-জেলের সামনে দিনরাত পড়ে থেকেছি। অনেক হুমকি ধমকি এসেছে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলাম। বিশ্বাস ছিল তিনি (শেখ হাসিনা) আবারও আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে দেশের হাল ধরবেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে প্রথম শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আমার। তাকে বলি আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে আপনি ও আওয়ামী লীগের পাশে থাকতে চাই।

জীবনে প্রথমবার এমপি হওয়ার স্মৃতিচারণা করে তারানা হালিম বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। রাজপথে নেমেছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি আমি কোনদিন এমপি হবো। সংসদে যাবো। একজন জনপ্রতিনিধি হবো। আওয়ামী লীগে আমার চেয়েও অনেক যোগ্য নেতা ছিলেন। কিন্তু আমি আসলেই সৌভাগ্যবান। ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রথম নির্বাচিত হই। তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি সংসদে যাচ্ছি। যাই হোক, এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম প্রথম ভয় কাজ করছিল। সংসদে আমার কাজ কি হবে? অন্যদের সঙ্গে কিভাবে নিজেকে মানিয়ে নেবো? আমি কি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবো? এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি বলে প্রথমদিকে কাজ করতেও কিছুটা সমস্যা হতো। কিন্তু একসময় আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। সংসদে নিজের কর্তব্যকাজে মনোযোগ দিই। এরপর দশম সংসদেও এমপি নির্বাচিত হয়েছি। এখন দায়িত্ব পালন করছি তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবেও।

অবেগাপ্লুত তারানা হালিম বলেন, চারদিকে এত সমস্যা! স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ মাথাছাড়া দিয়ে উঠছে, প্রতিনিয়ত নারীরা লাঞ্ছনা, অবমাননার শিকার হচ্ছেন। পেট্রলবোমা মেরে পুড়িয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। কিন্তু আমরা তথাকথিত নিরপেক্ষতার নামে সবকিছু এড়িয়ে যাচ্ছি। মানুষের নির্লিপ্ততা, নীরবতা আমাকে কষ্ট দেয়। আমার প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়েছে। আমার কণ্ঠ রোধ করা যায়নি। ভবিষ্যতেও আমার কণ্ঠ থাকবে উচ্ছকিত। তিনি বলেন, যারা দুর্নীতিবাজ, তাদের আমি ঘৃণা করি। একই সঙ্গে ঘৃণা করি যারা পেট্রলবোমা দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে, যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা নারী সমাজকে সম্মান না করে, তাদের নির্যাতন করে।

তারানা হালিম জানান, ব্যস্ততার পরে যতটুকু সময় পাওয়া যায় তার সবটুকুই দুই ছেলে ও বই পড়ার জন্য। বড় ছেলে আইন বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত। তার সঙ্গে ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। ছোট ছেলে ঢাকায় পড়ছে ও লেভেলে। তাকেও নিয়ম করে সময় দিতে হয়। তবে, দুজনই রাজনীতির বাইরে। তিনি জানান, সংসদ অধিবেশন ও পরিবারের কাজকর্মের বাইরে তার অবসর কাটে বই পড়ে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বই পড়তেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বেশি।

এছাড়া বিশ্বের মহামনীষীদের আত্মজীবনী ও তাদের নিয়ে লেখা বই পড়ে তাদের জীবনকে আত্মোপলব্ধি করার চেষ্টা করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর দেয়া সব ভাষণ মুখস্থ তার। নিয়মিত লিখছেন নিজের জীবন নিয়ে আত্মজৈবনিকমূলক লেখা। জীবনের যখন যা অনুভূতি তার সবটুকুই তিনি তুলে ধরেন লেখনীর মাধ্যমে। প্রতি শনিবার কাজিনদের নিয়ে পালন করেন ‘সিস্টারস ডে’। চ্যানেল আইতে ‘জীবন যেখানে যেমন’ নামে একটি অনুষ্ঠান করেন। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও সামাজিক কর্মকা- নিয়েই কেটে যায় প্রতিটি দিন।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিটি মৃত্যু কাঁদায় তারানা হালিমকে। এর মধ্যে জীবনের কষ্টময় ঘটনা সড়ক দুর্ঘটনায় তার বোনের ছেলে সাঈফ আহমেদ অর্ণবের অকাল করুণ মৃত্যু। যে মৃত্যু প্রতিনিয়ত তাকে কাঁদায়। তিনি চান না সড়ক দুর্ঘটনায় আর কোন প্রাণ অকালে ঝরে যাক। সুখী, সমৃদ্ধ, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তারানা হালিম। যে বাংলাদেশের স্বপ্নের সারথি হবেন তিনিও। তার ভাষায়, ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার কারিগর হতে চাই, দেশের প্রতিটি নারীর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল করতে চাই, চাই প্রতিটি নারী স্বাবলম্বী হোক। আর চাই সন্ত্রাস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনপ্রতিরোধ গড়ে উঠুক।






মন্তব্য চালু নেই