মেইন ম্যেনু

ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ছাড়া কমবে না লোকসান-ভোগান্তি

একসময় নদী আর রেলপথ ছিল বাংলাদেশের প্রধান পরিবহন ও যোগাযোগ-ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সড়কপথও হয়ে উঠেছে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। তারপরও তুলনামূলক নিরাপদ, যানজটমুক্ত আর আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য ট্রেনই এখনো যাত্রীদের প্রথম পছন্দ। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা, যাত্রীসেবার নিম্নমান, যখন-তখন ট্রেনের সময়সূচির বিপর্যয় এই সরকারি সংস্থাটির ‘অভ্যাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ভোগান্তি পোহাচ্ছে যাত্রীরা, আর লোকসানের ঘানি টানছে সরকার।

রেল কর্তৃপক্ষ যদিও দাবি করছে, তারা যাত্রীসেবার উন্নয়নের জন্য নানা উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ও প্রকল্প নিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো নিশানা খুব একটা দেখা যায় না। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া বাড়ানো হলেও তার কোনো ফল মেলেনি। বরং অবস্থা সেই আগের মতোই। বিশেষ কিছু ট্রেন ছাড়া অন্যগুলোতে পানি নেই, বাতি নেই। ট্রেন লাইনচ্যুত হচ্ছে, ইঞ্জিন বিকল হচ্ছে। এলোমেলো হচ্ছে সময়সূচির। রেলের নানা দিকের এমন খবর তুলে এনেছেন আমাদের প্রতিবেদক তানিম আহমেদ। সেগুলো কযেক তুলে ধরা হবে পাঠকদের জন্য।

ঘটনাটি ২৯ জানুয়ারির। গাজীপুরের মীরেরগাঁও এলাকায় বিকল হয় দিনাজপুর থেকে ঢাকাগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন। বন্ধ হয়ে যায় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর ট্রেন চলাচল। মেরামতের পর সোয়া ১০টায় ছেড়ে গিয়ে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে আবার বিকল হয় ট্রেনটি। দুই পাশের স্টেশনে আটকা পড়ে বেশ কিছু ট্রেন। ভোগান্তিতে পড়ে যাত্রীরা। ইঞ্জিন চালু করতে করতে বেলা একটা পেরিয়ে যায়।

এই ঘটনায় ঢাকার সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়ে। এর ধকল থাকে পরের অন্তত দুই দিন।

এই ঘটনা নানা সংকট-কবলিত বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নমুনা মাত্র। এ ধরনের ঘটনা ঘটছে প্রায়ই। এ জন্য রেল কর্তৃপক্ষ অজুহাত দিচ্ছে পুরনো ইঞ্জিনের। লাইনচ্যুতির সময় দোহাই দিচ্ছে জরাজীর্ণ স্লিপার আর অপর্যাপ্ত পাথরের। তাতে রেলওয়ের সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারার চিত্রই ফুটে ওঠে। ফলে যাত্রীসেবাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে দিন দিন। প্রতিদিন প্রতিটি ট্রেন উপচে পড়া যাত্রী নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছুটে চলে গন্তব্যে আর ইঞ্জিনের ধোঁয়ায় একরাশ হতাশা ছড়িয়ে যায়।

যাতায়াতের যে মাধ্যমটি হতে পারতেএ দেশের মানুষের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক, সেটি আজ এক বিড়ম্বনার নাম।

ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া বাংলাদেশ রেলওয়ে কোনো সরকারের আমলেই যথেষ্ট মনোযোগ পায়নি বলে অভিযোগ আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যে এই ক্ষেত্রে কেবল যথেষ্ট বিনিয়োগ করেনি তা নয়, উল্টো বিদেশি সংস্থার চাপে সড়কপথকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অবহেলা করেছে রেলকে। ফলে নতুন পথ চালু হওয়ার বদলে কমেছে রেলের নেটওয়ার্ক। অনেক জায়গায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে স্টেশন। লাভজনক সংস্থা থেকে লোকসানি সংস্থায় পরিণত হয়েছে রেল। অথচ রেলের আয়ের পথ কম নয়। এর যে বিপুল সম্পত্তি রয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আয় হতে পারে বিরাট অঙ্কের টাকা। এই সম্পত্তি যে ব্যবহার হচ্ছে না তা নয়, কিন্তু এর অর্থ পাচ্ছে না রেলওয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য নেই যথাযথ পরিকল্পনা; আছে ব্যবস্থাপনার অভাব। তারা এ ক্ষেত্রে উদাহরণ দেন পাশের দেশ ভারতের। এক মুম্বাই শহরেই প্রতিদিন ট্রেনে আসা-যাওয়া করে আশি লাখের বেশি মানুষ। কলকাতাসহ বড় বড় শহরে আছে প্রতিদিনের যাতায়াতের ব্যবস্থা। ঢাকায় কেন এমনটি হতে পারে না?

রেলকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করলে বিপুল আয়ের পাশাপাশি কতভাবে উপকার পাওয়া যাবে, তার বর্ণনা দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাজধানীতে মানুষের চাপ কমে আসবে অনেকটাই। নগরীর আশপাশের জেলা থেকে মানুষ কম খরচে ও কম সময়ে নগরীতে এসে দিনের কাজ সেরে আবার দিনেই ফিরে যেতে পারে বাড়িতে।

এমন ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য রেল যে এই মুহূর্তে প্রস্তুত নয়, সেটিও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আগে বিদ্যমান সংকট ও অসংগতিগুলো দূর করতে মনোযোগ দিক কর্তৃপক্ষ। ট্রেনের সময়সূচি ঠিক না থাকা, যখন-তখন লাইনচ্যুতির ঘটনা, ধীরগতির ট্রেন যাতায়াতের গতিশীলতাকে যে ভোগান্তিতে রূপান্তরিত করে, সেগুলো আগে ঠিক করুক। ছারপোকা-সংকুল আসন, ছেঁড়া-ফাটা আসন, অচল পাখা, পানিহীন টয়লেট এমন হাজারো সমস্যা আর অব্যবস্থাপনা দূর করুক। তাতে যাত্রীর সন্তুষ্টির পাশাপাশি বাড়বে রেলের আয়ও।

লোকসানের ভারে জর্জরিত সংস্থাটির আয় ও যাত্রীসেবা বাড়াতে বছর দুয়েক আগে একবার ভাড়া দ্বিগুণ করার পরও ট্রেন উপচে পড়ে যাত্রীতে। কিন্তু সুফল পাচ্ছে না সরকার কিংবা যাত্রীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ছাড়া রেলের লোকসানও কমবে না, কমবে না যাত্রীদের ভোগান্তিও।ঢাকাটাইমস






মন্তব্য চালু নেই