মেইন ম্যেনু

ব্যাংক জালিয়াতদের ধরতে দল থেকেই বাধা এসেছে : অর্থমন্ত্রী

৬ শতাংশের বৃত্ত ভেঙে জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৭-এর ঘরে পৌঁছানোর প্রত্যয় নিয়ে আজ থেকে যাত্রা শুরু হলো নতুন অর্থবছরের। গতকাল মঙ্গলবার সংসদে পাস হয় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট। সমৃদ্ধির সোপানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গত ৪ জুন সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ বাজেট উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত সেই বাজেটের ওপর সংসদে ২০০ জনেরও বেশি সংসদ সদস্য প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেন। বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে নতুন অর্থবছর। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের এটি দ্বিতীয় বাজেট। আর অর্থমন্ত্রী হিসেবে মুহিতের সপ্তম। বাজেট পাসের সময় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ উপস্থিত ছিলেন। তবে সংসদে যখন বাজেট পাস হয়, তখন মানিক মিয়া এভিনিউতে কর প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

৪ জুন সংসদে উপস্থাপিত বাজেটের আকার ও মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থের হেরফের না করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়। এবারের বাজেটের আকার দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর তিন হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা এর সঙ্গে যোগ করলে বাজেটের আকার হবে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। আজ ১ জুলাই থেকে শুরু করে আগামী বছর ৩০ জুন পর্যন্ত সরকার এ বাজেট বাস্তবায়ন করবে। দুই লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দুই লাখ ১৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। এ হিসাবে বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় ৮৬ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আসবে এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। বাকিটা আসবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বিক্রি, বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে গত সোমবার সংসদে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উৎসে কর, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও প্রকৌশল কলেজের ওপর প্রস্তাবিত কর কমিয়ে অর্থবিল ২০১৫ পাস হয়। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী ওই সব খাতের কর কমানোর ঘোষণা দেন। ব্যবসায়ীদের চাপে রপ্তানিতে উৎসে কর কমিয়ে ০.৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ফলে একজন পোশাক মালিক ১০০ টাকার পোশাক রপ্তানি করলে তাঁকে উৎসে কর দিতে হবে ৬০ পয়সা। ৪ জুন বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী তৈরি পোশাক খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর বসানোর প্রস্তাব করেন। পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর ৩ শতাংশ কমিয়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এই কর দিতে রাজি নন শিক্ষার্থীরা।
গতকাল স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০টায় বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীরা তাঁদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে মঞ্জুরি দাবি তোলেন। এর বিপরীতে প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হাজী সেলিমসহ অন্যরা ৫২৫টি ছাঁটাই প্রস্তাব তুলে ধরে মন্ত্রীদের চাহিদার আলোকে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি জানান। ছাঁটাই প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের যুক্তি, যে ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি ঘটছে, সে বিভাগে টাকা বরাদ্দ দেওয়া যায় না। এ ছাড়া দেশে এখন পর্যন্ত সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনকে নখদন্তহীন বাঘে পরিণত করে রাখা হয়েছে। ডাক্তারদের দেশপ্রেম নেই; সবাই ঢাকায় থাকতে চান। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ না দিয়ে প্রতীকী মূল্যে এক টাকা বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করেন তাঁরা।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে বরাদ্দের বিরুদ্ধে আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবে জাতীয় পার্টির ছয় জন ও স্বতন্ত্র দুজন সংসদ সদস্য বিভিন্ন ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনার কড়া সমালোচনা করেন। জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তাদের ধরতে না পারার পেছনে দলের মধ্য থেকে বাধা আসছে। তিনি বলেন, ওই সব জালিয়াতকে ধরতে তাঁর নিজ দল থেকেই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন খুব জরুরি। যখন আস্থার ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই সমস্যা হয়। সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের আগে কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। কিন্তু আমরা ছাড় দিইনি। মামলা করেছি, জড়িতদের জেলে নিয়েছি, বিচারের মুখোমুখি করেছি।’

অর্থমন্ত্রী বলেন, সোনালী ব্যাংকের ঘটনায় একজন ম্যানেজারকে জেলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, উনি জেলেই মারা গেছেন। আরেকজন এমডি বর্তমানে জেলে। জালিয়াতির আসামিদের ছাড় দেওয়া হবে না। বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, এরই মধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঘটনায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। ওই পর্ষদ বিষয়টি অনুসন্ধান করছে।
এরপর বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের ছাঁটাই প্রস্তাব নিষ্পত্তি শেষে অর্থমন্ত্রী দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে নির্দিষ্টকরণ বিল ২০১৫ পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করেন। বিলের দফাগুলো সংসদে গৃহীত হওয়ার পর দেড়টায় নির্দিষ্টকরণ বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। অর্থমন্ত্রীর মতে, এবারের বাজেট উচ্চাভিলাষী এবং তা বাস্তবায়নযোগ্য।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাস : ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সংযুক্ত তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার জন্য চার লাখ ১৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার ‘নির্দিষ্টকরণ বিল ২০১৫’ সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ দুই লাখ ৭১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় এক কোটি ৪৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাইকোর্টের বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতন অন্তর্ভুক্ত। নির্দিষ্টকরণ বিল মূল বাজেটের বাইরে।






মন্তব্য চালু নেই