মেইন ম্যেনু

ব্যয়বহুল শহরে পিষ্ট মানুষ

হোঁচট খাবেন না পাঠক, ঢাকা নগরের জীবনযাত্রার ব্যয় কানাডার মন্ট্রিল শহরের সমান। বলাই বাহুল্য, দুই শহরের মানুষের নাগরিক সুবিধার মধ্যে যোজন-যোজন ব্যবধান। এখানেই শেষ নয়, কানাডার টরন্টো নগরের খরচও ঢাকার চেয়ে কম। এমনকি মেক্সিকো সিটি, ক্লিভল্যান্ড ও ইস্তাম্বুলের মতো শহরের জীবনযাত্রার ব্যয়ও ঢাকার চেয়ে কম। নিশ্চয়ই পাঠক ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে গর্ববোধ করতে পারেন!

সম্প্রতি বিশ্বের ১৩৩টি শহরের ওপর ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট-এর ইনটেলিজেন্স ইউনিটের পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ চিত্র দেখা গেছে। তাদের তথ্যমতে, পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর হচ্ছে সিঙ্গাপুর। এ তালিকায় ঢাকার অবস্থান ৭১। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেঙ্গালুরু ও মুম্বাই শহর দুনিয়ার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সস্তা শহর। পাকিস্তানের করাচি শহর পৃথিবীর সপ্তম সস্তা শহর।

সত্যিই এক অদ্ভুত শহর আমাদের ঢাকা। এ শহরের রাস্তায় নামলে আপনি কখন গণপরিবহন পাবেন, এর নিশ্চয়তা নেই। পেলেও যে নিরাপদে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন, সে গুড়ে বালি। গরিব মানুষের জন্য তো এ শহর অসহনীয়। রাস্তা ও রেললাইনের পাশে বস্তির ঝুপড়িতে তাদের থাকতে হয়, যার ভাড়া আবার বাংলাদেশের যেকোনো মফস্বল শহরের ভদ্রগোছের বাড়ির সমান। অথচ সেখানে না আছে পানির ব্যবস্থা, না আছে উন্নত শৌচাগার। ঘর নিচু হওয়ায় তা প্রচণ্ড গরম হয়ে ওঠে। তাই কারওয়ান বাজার রেললাইনের পাশের বস্তিবাসীদের দিনের বেশির ভাগ সময়ই রেললাইনে বসে কাটাতে হয়। ট্রেন এলে দিতে হয় ছুট। এমনকি রেললাইনের ওপর গোসল করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।

এ শহরের যানজটের কারণে প্রতিদিন কত মানুষের কত শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, তার হিসাবই বা কে রাখে! আর সে কারণে আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমই বা কীভাবে ব্যাহত হয়, সে ব্যাপারে আমাদের মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। সেই যানজটে বসে থাকতে থাকতে মানুষ নানা রোগে আক্রন্ত হয়, আবার তার জন্য তাকে চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হয়।

এই শহরে একটি জিনিসই তুলনামূলক সস্তা। সেটি হচ্ছে কাপড়। রাস্তার পাশের ফুটপাত থেকেও আপনি কম দামে ভালো জামাকাপড় কিনতে পারবেন, আবার আলো ঝলমল শপিং মল থেকেও বেশি দামে কাপড় কিনতে পারেন। সবচেয়ে দামি জিনিস হচ্ছে খাবার। যেকোনো মানসম্পন্ন রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম কেমন, তা নগরবাসী মাত্রই জানেন। আবার কোনো পাঁচ তারকা হোটেলে একটি বিফ স্টেক ১০ হাজার টাকায়ও নাকি বিক্রি হয়।

এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হচ্ছে কোনো কিছুর ওপরই সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকা। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সবকিছুই বাজারভিত্তিক, তা ঠিক। কিন্তু সরকার যদি বাজারকে একদম ছেড়ে দেয়, তাহলে সেখানে নৈরাজ্যই সৃষ্টি হয়। এই শহরের বাড়িভাড়া, দোকানভাড়া, রিকশাভাড়া থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছুই নির্ধারিত হচ্ছে সেবাদাতাদের ইচ্ছামাফিক। এখানে ক্রেতার কোনো ভূমিকা নেই। বাড়িওয়ালা যে ভাড়া নির্ধারণ করবেন, ভাড়াটেকে সেটাই দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দর-কষাকষির সুযোগ নেই বললেই চলে। এ শহরে ভাড়াটের সংখ্যা এত বেশি যে বাড়িওয়ালাদের কোনো কিছুর পরোয়া করতে হয় না। রিকশাচালকদের ক্ষেত্রে কমবেশি একই কথা খাটে। অটোরিকশা ও গণপরিবহনের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দিলেও সংশ্লিষ্টরা তার তোয়াক্কা করে না। নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া নেয় তারা।

এই শহরের সব শ্রেণির মানুষের ট্র্যাজেডি হচ্ছে, মাসের শুরুতেই আয়ের একটা বড় অংশ বাড়িভাড়া বাবদ দিয়ে দিতে হয়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর থাকার পরও বাড়িওয়ালা চাইলে ভাড়াটেকে উঠিয়ে দিতে পারেন, অথচ কলকাতা শহরেও এটা সম্ভব নয়। সেখানে এ বিষয়ক আইন বেশ কঠোর।

এই ঢাকা নগরে জমির দাম এত বেড়েছে যে মধ্যবিত্তের পক্ষে জমি কিনে বাড়ি করা অসম্ভব। আবার গৃহঋণের সুদ এত বেশি যে সেটা নিতে গেলেও মাঝারি গোছের মধ্যবিত্তদের ১৫-২০ বছর চাকরি করে তার প্রস্তুতি নিতে হয়। অথচ অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে ৩০ বছরের মেয়াদে ৩ থেকে ৩.৫০ শতাংশ সুদে গৃহঋণ পাওয়া যায়। সেখানে এলাকাভেদে বাড়িভাড়াও নির্ধারণ করা আছে। বাড়িওয়ালা চাইলে ইচ্ছামতো ভাড়াও নিতে পারেন না, নিলে সিটি কাউন্সিলের কাছে নালিশ করা যায়। ঢাকা সিটি করপোরেশনেরও তেমন একটি তালিকা আছে, কিন্তু সেটা কেউ মানে না।

কথা হচ্ছে, শহরের বাসযোগ্যতা বাড়াতে হলে খরচ কমাতে হবে, যাতে সব শ্রেণির মানুষ অন্তত ভালোভাবে থাকতে পারে। সব শ্রেণির জন্যই মানসম্পন্ন আয়োজন থাকতে হবে। মৌলিক চাহিদা ভালোভাবে মেটানোর ব্যবস্থা করতে না পারলে আমরা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করতে পারি না।

লেখক: প্রতীক বর্ধন



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই