মেইন ম্যেনু

ব্রিটিশরা কথায় কথায় স্যরি বলে কেন?

সম্ভবত যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ এটি। ব্রিটিশরা খারাপ আবহাওয়ার জন্যও স্যরি বলে, আবার অন্যের ভুলের জন্যও স্যরি বলে। তরুণ ব্রিটিশদের মধ্যে স্যরি বলার প্রবণতা আরও বেশি। তাদের প্রতি দুইবার স্যরি বলার মধ্যে সময়ের পার্থক্য এক থেকে দুই ঘন্টা!

প্রায় এক হাজার ব্রিটিশের উপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একজন ব্রিটিশ নাগরিক দৈনিক আটবার স্যরি বলেন। প্রতি আটজনের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিক দিনে অন্তত ২০ বার স্যরি বলেন।

ব্রিটিশদের জীবনচর্চার উপর লেখা হেনরি হিচিংসের বই ‘দ্য ইংলিশ অ্যান্ড দেয়ার ম্যানারস’তে লেখক লিখেছেন, ‘দোষ না করেও কারণে অকারণে ব্রিটিশদের স্যরি বলায় কোনো জুড়ি নেই’।

কিন্তু সত্যিই কী ব্রিটিশরা অন্যান্য জাতির চেয়ে বেশি দুঃখ প্রকাশ করে বা লজ্জিত হয়? যদি তাই হয়, তাহলে সেটি কেন… আর এটি কতটা খারাপ অভ্যাস?

‘ক্ষমা ও দুঃখ প্রকাশ’ বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব পিটার্সবার্গের মনোবিজ্ঞানী কারিনা শ্যুম্যান। তিনি জানান, মার্কিনিদের চেয়ে কানাডা ও ব্রিটেনের নাগরিকরা বেশি দুঃখ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এটির গবেষণালব্দ প্রমাণ হাজির করাটা কঠিন।

সম্প্রতি ইউগভ ব্রিটিশ এবং আমেরিকানদের স্যরি বলার প্রবণতার উপর একটি জরিপ করেছে। জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকানদের তুলনায় ব্রিটিশদের স্যরি বলার প্রবণতা বেশি। তবে ব্রিটিশ নারীরা পুরষদের তুলনায় কম স্যরি বলেন।

তবে এ জরিপে দুই জাতির মধ্যে কিছু মিলও পাওয়া গেছে। অন্যের কথার মাঝখানে কিছু বলার সময় স্যরি বলার হার দুই দেশেই সমান। দেখা যাচ্ছে, কোনো মিটিং বা অনুষ্ঠানে দেরিতে পৌঁছানোর জন্য ৮৪ শতাংশ ব্রিটিশ দুঃখ প্রকাশ করেন। একই কাজের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ৭৪ শতাংশ আমেরিকান।

’ওয়াচিং দ্য ইংলিশ’ বইয়ের লেখক কেট ফক্স ব্রিটিশদের স্যরি বলার প্রবণতা যাচাই করার জন্য একটি পরীক্ষা চালালেন। তিনি নিজেই রাস্তায় হাঁটার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে একশজন ব্রিটিশ নাগরিকের সাথে ধাক্কা খেলেন। ফক্স ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের সাথে ধাক্কা খেলেও ৮০ জন ব্রিটিশ এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে।

নিজের বইয়ে ফক্স লিখেছেন, অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিক মন থেকে ‘স্যরি’ বলে না। কারণে অকারণে স্যরি বলাটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। লেখকের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, বরং জাপানিরা যখন স্যরি বলে, তখন সেটি মন থেকেই বলে।

স্যরি শব্দটি এসেছে ইংরেজি শব্দ ‘সারিগ’ থেকে, যার অর্থ হচ্ছে ‘ ক্ষুব্ধ বা মনোকষ্ট’। কিন্তু অধিকাংশ ব্রিটিশ নাগরিকই এসব বোঝাতে স্যরি শব্দটি ব্যাবহার করেন না।

সাউদার্ন অরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্বের বিশেষজ্ঞ ও ‘স্যরি অ্যাবাউট দ্যাট: দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব পাবলিক অ্যাপোলজি’ বইয়ের লেখক এডউইন বাটিস্টেলা বলেন, ‘মানুষ বিভিন্নভাবে স্যরি শব্দটা ব্যবহার করে। ব্রিটিশরা এ শব্দটি অতিরিক্ত ব্যবহার করে, তার মানে এই না যে তারা অধিক অনুশোচনাপ্রবণ।’

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় সহানুভূতি প্রকাশের জন্যও স্যরি বলা হয়ে থাকে। যেমন অনাকাঙ্খিত বৃষ্টির জন্য ব্রিটিশরা বলে যে, ‘বৃষ্টির জন্য আমি দুঃখিত’। ব্রিটিশরা এমন অনেক ক্ষেত্রে স্যরি শব্দটি ব্যবহার করে, আমেরিকানদের কাছে যা অনভিপ্রেত। যেমন অপরিচিত কারো সাথে কিছু বলতে চাইলে স্যরি বলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্রিটিশরা কিংবা বাসে-ট্রেনে কারো পাশে বসতে হলেও তাকে স্যরি বলে থাকে বৃটিশরা। ব্রিটিশরা কথায় কথায় স্যরি বলে, তার মানে তারা কথায় কথায় দুঃখ প্রকাশ করে বা ক্ষমা প্রার্থনা করে, বিষয়টা তেমন নয়’।

ফক্স বলেন, ‘শব্দটিকে ব্রিটিশরা এমনভাবে ব্যবহার করেন, বাইরের কারো জন্য এর আসল অর্থ বোঝাটা মুশকিলই হয়। তবে আমি মনে করি স্যরি বলাটা সবসময় খারাপ না’।

স্যরি বলার আরেকটি ভালো দিক হচ্ছে সহজেই কারো বিশ্বাস অর্জন করা যায়। কোনো ভুল করা ছাড়াই কেউ য্খন স্যরি বলে, তখন সহজেই সে অন্যের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে পারে, পরিস্থিতিও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তবে অনেকেই অতিরিক্ত স্যরি বলাটাকে মানসিক দুর্বলতা মনে করেন।

তবে বাটিস্টেলা অতির্কিত স্যরি বলা থেকে বেরিয়ে আসতে ব্রিটিশদের একটি পরামর্শ দিচ্ছেন। তার পরামর্শ হচ্ছে, ‘পরিবার থেকে যেভাবে এবং যে পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করা শেখানো হয়েছে, শুধু সেসব পরিস্থিতিতেই দুঃখ প্রকাশ করতে হবে’।






মন্তব্য চালু নেই