মেইন ম্যেনু

বড় বড় ফ্লাইওভার হবে বিশাল বিশাল বোঝা!

রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে বড় ও ছোট মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে মোট সাতটি ফ্লাইওভার। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে অনেকগুলো আন্ডারপাসও তৈরি হয়েছে শহরে। তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন চালু হওয়ার পর পরই এই বিশাল এবং ব্যয়বহুল স্থাপনাগুলো তৈরির মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে। এবং বড় বড় ফ্লাইওভার পরিণত হবে বিশাল বিশাল বোঝায়!

বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন তাদের ফ্লাইওভারগুলো ভেঙে ফেলছে, সেই সময়ে বাংলাদেশ অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার তৈরি করছে। রাজধানীর রাস্তাগুলোকে সরু করে দিয়ে করদাতাদের শতকোটি টাকায় এই ফ্লাইওভার বানানো একটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত বলেও মন্তব্য করেছেন তাঁরা।

 

বুয়েটের তিনজন বিশেষজ্ঞ বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানান, বিশ্বে কোথাও ফ্লাইওভার কখনো যানজট কমাতে পারেনি। বরং ক্রমাগত গড়ে ওঠা ভবন ও ক্রমেই বাড়তে থাকা ব্যক্তিগত এবং ছোট যানবাহনের যানজটের চাপে এটি যানজট পরিস্থিতি ক্রমশ আরো ভয়াবহ করে তোলে।

বিশেষজ্ঞরা আরো জানান, নগরে থাকা রাস্তাগুলোর সঠিক ব্যবহার, নতুন করে রেলপথ এবং জলপথ সৃষ্টিই কেবল যানজট কমাতে পারে। পরিকল্পনা ছাড়া তৈরি করা ফ্লাইওভার ও ওভারপাসের মতো স্থাপনা কেবল যানজট পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে তোলে।

Flyover-02

বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সামসুল হক ইউএনবির সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন, ‘ফ্লাইওভার কখনোই যানজট সমস্যার সমাধান নয়। একইভাবে ব্যক্তিগত যানবাহনের সংখ্যা বাড়িয়ে এবং ফ্লাইওভার বানিয়ে পৃথিবীতে কেউ যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারেনি।’

ড. সামসুল হক আরো বলেন, ‘এই ফ্লাইওভারগুলো পরিকল্পিতভাবে, বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বানানো হয়নি। এই বিশাল স্থাপনাগুলো কেবল টাকার অপচয়ই নয়, বরং নগরের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামসুল হক জানান, ফ্লাইওভার বানিয়ে যানজট সমস্যার সমাধান হবে না। বরং আগে থেকেই তৈরি করা রাস্তার জায়গায় ফ্লাইওভারের বড় পিলার না বসিয়ে পাবলিক বাসের জন্য আলাদা লেন তৈরি করলেই সমস্যা অনেকখানি সমাধান হয়ে যেত।

Flyover-03

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা (ইউআরপি) ড. সারওয়ার জাহান বলেন, ‘এটা ভাবা ভুল যে ফ্লাইওভার ট্রাফিক জ্যামের সমাধান এনে দেবে। এটা না করে আমাদের রাস্তাগুলোর আরো ব্যাপক ব্যবহার, জলপথ এবং রেলপথ স্থাপনে মনোযোগ দেওয়া উচিত ছিল।’

ড. সারওয়ার জাহান বলেন, ‘চাহিদা ব্যবস্থাপনা সরবরাহের চেয়ে সব সময় ভালো। ফ্লাইওভার বানানো যানজট নিরসনে একটি সরবরাহ করা সমাধান। এবং এটি নিজে একটি চাহিদা তৈরি করবে। ফ্লাইওভারের টোল আদায় করতে সরকার আরো বেশি ব্যক্তিগত পরিবহনকে উৎসাহিত করবে। এবং এতে যানজট বাড়বে বৈ কমবে না।’

এতগুলো ফ্লাইওভার না বানিয়ে সরকারের একটি যুগোপযোগী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নীতির শক্ত প্রয়োগ করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কোনো দেশে এ ধরনের বড় স্থাপনা তৈরির আগে অনেক বছর ধরে এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে গবেষণা করা হয় উল্লেখ করে ড. সারওয়ার জাহান বলেন, ‘আমরা ১৫ বছর ধরে বলে আসছি ফ্লাইওভার যানজট সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু এটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে।’

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এই শিক্ষক আরো বলেন, ‘একতলা ফ্লাইওভার বানিয়ে আমরা নিচের রাস্তার উপযোগিতা নষ্ট করছি। এই ফ্লাইওভার হয়তো কয়েক বছরের জন্য যানজট কমাবে, কিন্তু দীর্ঘ পরিসরে এটি ক্ষতির কারণ হয়েই দাঁড়াবে। এই বড় বড় ফ্লাইওভার হবে বিশাল বিশাল বোঝা! এই ফ্লাইওভারগুলো নগরের জানজট কমাতে অতিপ্রয়োজনীয় যানবাহনের যাতায়াতে আরো বাধা সৃষ্টি করবে।’

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আখতার বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ফ্লাইওভারের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জনমত গড়ে উঠছে। নগরসভ্যতায় ফ্লাইওভার কেবল চক্ষুশূলই নয় বরং এটি যানজটের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবেও চিহ্নিত। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক এবং জাপানের টোকিওর মতো নগরে ফ্লাইওভার ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া অনেক নগরে ফ্লাইওভার সরানোর কাজ চলছে।

শাকিল আখতার আরো বলেন, ‘এই বিশাল স্থাপনাগুলোর ঠিকাদার, প্রকৌশলী এবং আমলারা এই বড় প্রকল্পের প্রধান সুবিধাভোগী, দেশের সাধারণ জনগণ নয়।’এনটিভি অনলাইন






মন্তব্য চালু নেই