মেইন ম্যেনু

ভাইয়ের কাটামুন্ড ফেরত পেয়েছিলেন তিনি

মহম্মদ হাসান আবদুল্লা আল-জিবউরি। বছর পঁয়ত্রিশের তরতাজা যুবক। কাজ করতেন পুলিশে। কিন্তু, এক দিন হঠাত্ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর জঙ্গিরা। অন্য অনেকের সঙ্গে তাঁকে বন্দি করে রাখা হয় জেলে। এক মাসেরও বেশি তিনি সূর্যের মুখ দেখেননি। জীবন্ত অবস্থায় কখনও সেই জেলের বাইরে বেরোতে পারবেন তিনি, তাও স্বপ্নে ভাবেননি। জীবনের আশাও প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক এমন একটা সময়ে হঠাত্ কানে এল বাইরের আকাশে হেলিকপ্টারের আওয়াজ। তখনও ভাবেননি সেই আওয়াজই কিছু ক্ষণের মধ্যেই পাল্টে দেবে তাঁর বন্দি-জীবন।

গত বৃহস্পতিবার সকালের ঘটনা। হেলিকপ্টারের আওয়াজটা নেমে এল নীচে। তার পর একটানা গুলির আওয়াজ। সঙ্গে কুর্দিশ এবং ইংরেজি ভাষায় নানা চিত্কার। এর পর আচমকাই ভেঙে গেল জেলের দরজা। ভাঙা সেই দরজা দিয়ে অন্ধকার ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল এক দল সেনা। তার পর চিত্কার, প্রথমে কুর্দিশ ভাষায়, ‘‘কে ওখানে?’’ ফের একই প্রশ্ন। এ বার আরবিতে। জবাব এল, ‘‘আমরা।’’ আরবিতেই পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘আমরা কারা?’’ কুর্দিশ ভাষায় এ বার জবাব আরও কাতর স্বরে, ‘‘আমরা মানে বন্দিরা।’’

ইরাকে ইসলামিক স্টেটের জেল থেকে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ও কুর্দিশ বাহিনী পেশমার্গারের যৌথ অভিযানে ৬৯ বন্দিকে উদ্ধার করা হয়। আইএস প্রত্যেক বন্দির শিরশ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই খবর পেয়েই ওই জেলে অভিযান চালানো হয়। মুক্তি পাওয়া বন্দিদের ভেতর অন্তত ২০ জন আল-জিবউরির মতো ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর কাছে নিজেদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বার বার চোখের জল মুছছিলেন আল-জিবউরিরা। জেলের মধ্যে প্রতি দিন তাঁদের ভয়ানক অত্যাচার করা হত। ইলেকট্রিক শক, প্ল্যাস্টিক ব্যাগ দিয়ে মুখবন্ধ করে দেওয়া ছাড়া তুমুল মারধর তো আছেই। যত ক্ষণ না তাঁরা সংজ্ঞা হারিয়েছেন, তত ক্ষণই চলত এই ভয়ানক অত্যাচার। এর পর প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি তো আছেই। জেলের যে ঘরে তাঁরা বন্দি ছিলেন, সেখানে একটি মাত্র টিভি ছিল। সর্ব ক্ষণ তাতে আইএস-এর নানা কর্মকাণ্ডের ভিডিও দেখানো হত।
কিন্তু, কেন বন্দি করা হয়েছিল তাঁদের?

আল-জিবউরিরা জানিয়েছেন, তাঁদের এক এক জনের ক্ষেত্রে এক এক রকম কারণ। কেউ পুলিশে কাজ করেন বলে, কেউ ইংরেজি জানেন বলে, কেউ মার্কিন সেনা শিবিরে ব্যবসায়িক যোগাযোগ রাখার কারণে, কারও আবার স্ত্রী কুর্দিশ বলে, কেউ আবার আইএস-এ যোগ দিতে অস্বীকার করার কারণে আটক হয়েছিলেন।

সাদ কালিফ আলি ফরাজ। ৩২ বছরের এই যুবকটিও পুলিশ কাজ করতেন। বন্দি অবস্থায় তাঁকে এক আইএস জেলরক্ষী জানিয়ে দেয়, পরের দিনই তাঁর শিরশ্ছেদ করা হবে। সেই দিন রাতেই তিনি তাঁর ভাইকে চিঠি লিখে জানিয়ে দেন, ‘‘আমার পরিবারের সকলের দেখাশোনা কোরো। আমাকে খোঁজার কোনও চেষ্টা কোরো না। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’’ তার পরের দিন সকালে যদিও মুক্তি মিলেছিল মার্কিন সেনার সৌজন্যে।

আল-জিবউরির দাদা ইংরেজি শিখেছিলেন। আর সেই কারণেই তাঁকে সন্দেহের তালিকায় রাখে আইএস। তাঁকে এর পর আটক করে তারা। প্রাণে মারার হুমকিও দেওয়া হয়। কিন্তু, কোনও ভাবে তিনি পালিয়ে যান আইএস-জেল থেকে। এর পর আল-জিবউরি-সহ তার তিন ভাই এবং ৮০ বছরের বাবাকে গ্রেফতার করে তারা। কিন্তু, এক জনকে ছাড়া বাকিদের এক সপ্তাহ পরে ছেড়ে দেয়। শুধু আল-জিবউরির এক ভাইকে প্রাণে মেরে ফেলা হয়। আল-জিবউরির কথায়, ‘‘ওরা ঠান্ডা মাথায় আমার ভাই মউফকে খুন করেছে!’’ সে বার মুক্ত হওয়ার পর বাড়িতে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের আল-জিবউরিকে আটক করে জেলে নিয়ে যায় আইএস জঙ্গিরা। তাঁকে দিয়ে জোর করে স্বীকার করানোর চেষ্টা হয়, তিনি মার্কিন সেনার চর। ‘হ্যাঁ’ বললে সাজা মৃত্যুদণ্ড। আর ‘না’ বললে অমানুষিক অত্যাচার। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত ‘না’তেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আল-জিবউরি।

আল-জিবউরির মতো মহম্মদ, আহমেদদের অভিজ্ঞতাও একই। ফরাজের এক ভাইকেও সন্দেহের জেরে আটক করে জঙ্গিরা। এর পর তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়। ফরাজরা যদিও তাঁর কাটামুণ্ড ফেরত পেয়েছিলেন। বাকি দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর এর পরই ফরাজকে আটক করা হয়। কারণ? তাঁর দুই স্ত্রী-ই কুর্দুশ। আইএস নির্দেশ দিয়েছিলন তাঁদের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে হবে ফরাজকে।তিনি তাতে অসম্মত হওয়ায় আটক করা হয়। দেওয়া হয় মৃত্যু পরোয়ানাও।

জেলের দরজা ভেঙে যখন সেনা জওয়ানরা ভেতরে ঢুকেছিলেন, প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন আল-জিবউরিরা। পরে যখন বোঝা যায় এঁরা তাঁদের মুক্তির জন্য এসেছেন, তখন সকলেই ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। এত দিন পর তাঁদের আর্তি শোনার জন্য।—জানিয়েছেন ফরাজ। তবে প্রাণে বেঁচে গেলেও মুক্তির স্বাদ কিছুটা তেতো ঠেকছে আল-জিবউরির কাছে। কারণ আপাতত তাঁর স্ত্রী-সন্তানেরা আইএস অধ্যুষিত এলাকাতেই রয়ে গিয়েছেন। #আনন্দবাজার পত্রিকা






মন্তব্য চালু নেই