মেইন ম্যেনু

ভাঙার অপেক্ষায় মমতার দল

ভাঙছে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আগামী মাসেই আত্মপ্রকাশ হতে চলেছে নতুন দল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের ২য় প্রভাবশালী নেতা তথা রাজ্যসভার সাংসদ মুকুল রায়ের নেতৃত্বেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন দলের সাংসদ,বিধায়ক এবং পৌরসভা, গ্রামপঞ্চায়েত ও বেশ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে নতুন দল। আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন দল ভেঙে নতুন দল হলে তা হবে কার্যত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষের শুরু। একথা মনে করেন ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

নতুন দল গড়তে তৃণমূলের রাজ্যসভার সংসদ মুকুল রায় দলের একটা নামও ভেবে ফেলেছেন। হয়তো আগামী একুশে জুলাইয়ের আগেই তিনি তাঁর দল ঘোষণা করতে পারেন। বিশেষ সূত্র এই সংবাদ দিয়ে জানিয়েছে, নৈতিক দিক থেকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট রাখতে তিনি দল ঘোষণার আগেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক সদস্যপদ এবং রাজ্যসভার সদস্যপদ ত্যাগ করবেন। মুকুল রায়ের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে প্রকাশ, দিল্লির নির্বাচন কমিশনে ইতোমধ্যে নতুন দলের স্বীকৃতির জন্য আবেদনও করা হয়েছে। আবেদনপত্রে স্বাক্ষর রয়েছে পঞ্চাশের বেশি সদস্যের। এদের মধ্যে দলের কয়েকজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও আছে। তবে তাঁরা সাংসদ, না বিধায়ক না কি পুরসভা-পঞ্চায়েতের সদস্য তা স্পষ্ট করতে রাজি হয়নি মুকুল-ঘনিষ্ঠ এই সূত্র। বলেছেন, ‘সবুরে মেওয়া ফলে’।

তবে, মুকুল রায় নাকি স্পষ্টই তাঁর সমর্থকদের বলেছেন, তাঁর নতুন মোটেই দল শহর-ভিত্তিক দল হবে না। শহর এবং শহরতলীর শিল্পাঞ্চলে তিনি হাত বাড়াচ্ছেন না। তাঁর দল হবে মূলত গ্রাম ভিত্তিক। পশ্চিমবঙ্গের ৩৪১টি ব্লকের অন্তত ২০০টি ব্লকে ইতিমধ্যেই তিনি নতুন দল গড়ার মতো প্রাথমিক শক্তি খুঁজে নিয়েছেন। অন্তত ১০ জন সক্রিয় সমর্থক না থাকলে সেই ব্লকে তিনি সংগঠন তৈরিতে আপাতত নারাজ। একই সঙ্গে মুকুল রায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কোনওভাবেই তৃণমূলের দল ভাঙিয়ে সাংসদ-বিধায়কদের ভিত্তিতে দল গড়ার পক্ষে নন। পায়ের তলার মাটি শক্ত থাকলে ভবিষ্যতে তাঁদের কথা ভাবা যেতে পারে। অবশ্য, এখনকার কিছু কিছু বিধায়ক যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে দলের টিকিট না পেলে নতুন দলের হয়ে দাঁড়াবেন, এটা অনুমান করাই যায়। আবার, মুকুল রায়ের সমর্থকদের যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসন্ন বিধানসভা ভোটে টিকিট দেবেন না, সেটাও একরকম নিশ্চিত। তবে, স্বপনঙ্কান্তি ঘোষ, সব্যসাচী দত্ত, শীলভদ্র দত্ত, শিউলি সাহার মত ৩৫ থেকে ৪০ জন বিধায়ক মুকুল রায়কেই নেতা মানেন আজও।

একসময় দলে ‘নাম্বার টু’ হিসাবে স্বীকৃত মুকুল রায়ের পক্ষে তৃণমূল কংগ্রেসে এখনকার মতো অমর্যাদাকর পরিস্থিতে থাকা যে সম্ভব নয়, সেটা সকলেই অনুমান করেন। অনেকেই মনে করাচ্ছেন ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা, যখন কংগ্রেসের মধ্যে মর্যাদার প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ছেড়ে নতুন দল গড়ার কথা ভাবছিলেন। সেই সময় মুকুল রায়ই ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৫১-র জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২৯এ ধারা অনুযায়ী কংগ্রেস ছাড়ার হলফনামা জমা দিয়ে মমতার হয়ে গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ বলে একটি নতুন দলের নাম নথিভুক্ত করান নির্বাচন কমিশনে। আবেদনপত্রে মূল স্বাক্ষরকারী ও প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তারই নাম ছিল। মুকুল রায়ের আবেদনের সাত দিন পরে অর্থাৎ ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৯৭, কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তৃণমূলে যোগ দেন মমতা।সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই মুকুল রায়ের নামে চিঠি লিখে তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হতে আবেদন জানান। এর কয়েকদিন পরেই ১৯৯৮-এর পয়লা জানুয়ারি প্রথম জনসভা করে আত্মপ্রকাশ করে তৃণমূল কংগ্রেস। পরে দলের সাধারণ সম্পাদকের নাম বদলেছে, দলের চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি হয়েছে, তৈরি হয়েছে অন্য অনেক পদ, কিন্তু মুকুল রায় থেকে যান সাধারণ সম্পাদক পদেই।

এখন, তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে মুকুল রায়কে পুরনো পদে ফিরিয়ে দেওয়া কার্যত অসম্ভব। মুকুল রায়ের পক্ষেও যেমন সেই পদে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষেও তাঁকে ফেরানো কঠিন। যদিও তিনিই সব ক্ষমতার উৎস, তবু মুকুল রায়কে আগের অবস্থনে ফিরিয়ে নিলে দলে নতুন করে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে যাওয়া নেতাদের চটাতে হবে। সেটাও কঠিন। এই অবস্থায়, মুকুল রায়কে দলের সব পদ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অপসারণ করার পর তাঁকে পেতে ঝাঁপিয়েছিল বিজেপি। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা এখনও চান মুকুল রায় তাঁদের দলে আসুক। বেশ কয়েকবার বিজেপির শীর্ষ নেতারা তাঁর সঙ্গে কথাও বলেছেন। কিন্তু তিনি কোন কথাই দেননি। মোদি-মমতা দহরম-মহরম বেড়ে যাওয়ায় মুকুল রায়ের বিজেপিতে যাওয়া কঠিন হয়েছে। পোড়খাওয়া অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ মুকুল রায় জানেন, তেমন সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন।

এই অবস্থায়, মুকুল রায় একমাত্র কংগ্রেসে যোগ দেওয়র কথা ভাবতে পারতেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বের একাংশ মুকুল রায়ের কাছে সেই প্রস্তাবও দিয়েছিল। তাদেরও কোনো কথা দেননি মুকুল রায়। আবার, তিনি নিজেই বলেছেন, তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিচ্ছেন না। বরং সক্রিয় রাজনীতিতেই থাকবেন। সেটা সম্ভব একমাত্র তিনি নিজেই যদি একটা দল গড়েন। সেই পথেই অনেক দূর এগিয়ে চলে গিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন জেলায় নতুন দলের অফিসের জায়গা দেখা হয়ে গেছে। ব্লক স্তরে দফতরের খোঁজ চলছে।






মন্তব্য চালু নেই