মেইন ম্যেনু

ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতলো বাংলাদেশ

‘ওই নতুনের কেতন উড়ে, কালবৈশাখী ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’! কাজী নজরুল ইসলামের এই পংক্তিই যেন বিমূর্ত সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে! বাংলাদেশের কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভারত! রচিত হয়েছে নতুন ইতিহাস। বাংলাদেশের গর্বের ইতিহাস।

অদম্য বাংলাদেশ সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে ট্রাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাও আবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন! প্রথমবার ফাইনালে উঠে প্রথমবারই চ্যাম্পিয়ন!

২০১১ এবং ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টের আগের দুই আসরে শূন্যহাতে ফিরতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। হিমালয় কন্যা নেপাল বড্ড রিক্ততায় বিদায় জানিয়েছিল বাংলার কিশোরদের। কিন্তু এবার নিজ দেশে, টুর্নামেন্টের তৃতীয় আসরে একের পর এক প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিয়ে, গুঁড়িয়ে দিয়ে অপরাজিত থেকেই চ্যাম্পিয়ন ট্রফিটা নিজেদের করে নিয়েছে সৈয়দ গোলাম জিলানীর শিষ্য শাওন, সাদ, নিপুরা।

এ তো গর্বের ইতিহাস! এ তো আনন্দের ইতিহাস! এ তো হাজারো সমস্যা-সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশে এক ফালি শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দেওয়ার ইতিহাস!

মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় কানায় কানায় দর্শকপূর্ণ সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে শুরু হয় সাফ অনুর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের ফাইনালের মহারণ। ম্যাচের শুরুর প্রায় ১০ মিনিট বাংলাদেশকে চেপে ধরে ভারত। তবে বাংলাদেশের রক্ষণে বার বার পরাস্ত হয় তারা। এরপর ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে নেয় সাদ-শাওনরা। ফিরতে শুরু করে ম্যাচে। শাণাতে থাকে একের পর এক আক্রমণ।

প্রথমার্ধের ১১ মিনিটে বাংলাদেশের ১১ নম্বর জার্সিধারী মোহাম্মদ শাওনের কর্ণার থেকে পাওয়া বলে লাফিয়ে উঠে হেড নেন ৩২ নম্বর জার্সিধারী সাদ উদ্দিন। কিন্তু ভারতীয় ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে তা প্রতিহত হয়। ২০ মিনিটে বাংলাদেশ দল একটি পরিকল্পিত আক্রমণে যায়। বল পেয়ে ভারতের ডি বক্সের বাইরে থেকে শট নেন বাংলাদেশের ৬ নম্বর জার্সিধারী ফাহিম মোর্শেদ। কিন্তু সোজা ভারতীয় গোলরক্ষক প্রভূষকান সিংয়ের হাতে বল তুলে দেন তিনি।

২১ মিনিটে মাঝমাঠে বল পান বাংলাদেশের ৮ নম্বর জার্সিধারী মোহাম্মদ হৃদয়। তার কাছ থেকে বল যায় ৫ নম্বর জার্সিধারী বাংলাদেশ দলপতি শাওন হোসাইনের কাছে। শাওন থেকে বল পান আরেক শাওন (১১ নং জার্সিধারী মোহাম্মদ শাওন)। তার কাছ থেকে বল পেয়ে বাংলাদেশের ৪৪ নং জার্সিধারী মোস্তাজিব খান দর্শনীয় এক হেড নেন। কিন্তু বল পোস্টের সামান্য ওপর দিয়ে চলে যায় বাইরে।

প্রথমার্ধের ২২ মিনিটে ভারতের বক্সের বাইরে থেকে মোহাম্মদ শাওনের জোরালো শট পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। ৩২ মিনিট প্রায় মাঝমাঠ থেকে জোরালে শট নেন ২৮ নম্বর জার্সিধারী ইমন খান। কিন্তু পোস্ট ঘেঁষে বাইরে চলে যায় তার শটটি। ৩৩ মিনিটে বাংলাদেশের ১১ নম্বর জার্সিধারী মোহাম্মদ শাওনের ক্রস থেকে মোস্তাজিব খান বক্সের কাছে থেকে শট নেন, তবে তা ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্রিপ করেন ভারতের গোলরক্ষক ও দলপতি প্রভুষ্কান সিং।

৩৫ মিনিটে বাংলাদেশের রক্ষণভাগের ভুলে ডি বক্সে বল পেয়ে যান ভারতের ৯ নং জার্সিধারী ফরোয়ার্ড রাহিম আলী। তবে বল ক্লিয়ার করে দলকে বিপদমুক্ত করেন অধিনায়ক শাওন হোসাইন। ৩৭ মিনিটে বাংলাদেশ অধিনায়ক শাওন হোসাইনের বাড়ানো বল ধরে সাদ উদ্দিন দ্রুত ঢুকে পড়েন ভারতের ডি বক্সে। মাইনাসও করেন। কিন্তু সঠিক জায়গায় বাংলাদেশের কেউ ছিল না।

প্রথমার্ধের ৩৯ মিনিটে ভারতের ১০ নং জার্সিধারী অভিজিৎ সরকারের ক্রস একেবারে ফাঁকায় দাঁড়িয়েও লালদিনপুইয়া শট নেন বাইরে। গোলশূন্যভাবে শেষ হয় ম্যাচের প্রথমার্ধ।

ম্যাচের ৪৬ মিনিটে চমৎকার বোঝাপড়ায় আক্রমণে যায় বাংলাদেশ। মোহাম্মদ শাওন দুই ভারতীয় ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে বক্সে ক্রস করেন। বল পেয়ে যান ফাহিম মোর্শেদ। দ্রুততার সাথে গোল করে বাংলাদেশকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দিতে ভুল করেননি তিনি। উল্লাসে মেতে ওঠে স্টেডিয়াম।

৫০ মিনিটে মাঝ মাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ভারতের বক্সে ঢুকে পড়েন বাংলাদেশের সাদ উদ্দিন। তবে ভারতের গোলরক্ষকের ক্ষিপ্রতায় গোল উৎসবে মেতে উঠার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। ৫২ মিনিটে ডি বক্সের বেশ বাইরে থেকে ভারতের রাহিম আলীর তীব্র গতির শট দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় বাঁচান বাংলাদেশের গোলরক্ষক ফয়সল আহমদ।

ম্যাচের ৬৩ মিনিটে স্টেডিয়াম স্তব্ধ করে দেন ভারতের অবিনাশ মরাজকার। প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে আচমকা এক শটে গোল করে ভারতকে ১-১ সময়তায় ফেরান তিনি। টুর্নামেন্টের সেরা গোল হিসেবে খ্যাত হতে পারে এটা।

ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ শেষ হওয়ার মুহূর্তে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ম্যাচ বন্ধ থাকে প্রায় ১০ মিনিট। পরে খেলা শুরু হতে না-হতেই রেফারির বাঁশি। অতিরিক্ত সময়ে না গিয়ে সরাসরি ট্রাইব্রেকারে চলে যায় ম্যাচ। টানটান উত্তেজনা। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা।

বাংলাদেশ প্রথমে শট নেয়। ফাহিম মোর্শেদ ভারতীয় গোলকিপারকে পরাস্ত করতে ভুল করেননি। ফিরতি শটে গোল করে সমতা আনেন ভারতের সৌরভ মেহের। আবার শট নেন বাংলাদেশের জাহাঙ্গীর আলম সজীব। গোল করে এগিয়ে দেন বাংলাদেশকে। ফিরতি শটে ভারতের মোহাম্মদ রাকিপ গোল করেন, ২-২।

এরপর সেই ক্ষণ! সেই মুহূর্ত! বাংলাদেশের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান গোল করে এগিয়ে রাখেন বাংলাদেশকে, ৩-২। তবে ফিরতি শটে ভারতের অভিজিৎ সরকার মিস করে বসেন! এগিয়ে থাকে বাংলাদেশ।

পরের শটে গোল করেন বাংলাদেশের রাইজিং স্টার সাদ উদ্দিন, ৪-২। আর ফিরতি শটে ভারতের মোহাম্মদ সাকলাইন খানের শট ধরে ফেলেন বাংলাদেশের গোলরক্ষক ফয়সল আহমদ। জয় বাংলাদেশের! স্টেডিয়ামে গর্জন!






মন্তব্য চালু নেই