মেইন ম্যেনু

ভাসমান মানুষের বৈশাখ কেমন?

বিত্তবানদের বৈশাখের সকাল শুরু হয় ইলিশ-পান্তা খেয়ে। এরপর এক দিনের জন্য বাঙালিয়ানার সাজে সেজে দর্শনীয় ও পছন্দের স্থানে ঘোরা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করা। বন্ধুদের সঙ্গে চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া, সিনেমা দেখতে যাওয়া। কিন্তু ভাসমান মানুষদের বৈশাখ তেমন নয়।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে কথা হয় সেইসব মানুষের সঙ্গে। জানা যায়, বৈশাখ পালনের জন্য নেই কোনো বাড়তি প্রস্তুতি।

অন্য আর পাঁচটা দিন যেমন পয়লা বৈশাখও তাদের কাছে তেমন। বরং পয়লা বৈশাখে তাদের কারো কারো মনে রয়েছে কষ্ট। শুধু দু বেলা দু মুঠো খাবারের জন্য স্বজনদের ফেলে তাদের একা থাকতে হয়। বিশেষ দিনগুলো কাটে তাদের স্বজনদের ছাড়া।

কারওয়ান বাজার। বুধবার রাত ১০ টা ৩৫ মিনিট। যাত্রী ছাউনির পাশে বসে মোবাইলে বিবিসি বাংলার খবর শুনছেন মো. রসুল। তিনি ছোটবেলা থেকেই বিবিসি বাংলার খবর শোনেন। কথা হয় তার সঙ্গে। বৈশাখ কীভাবে কাটাবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার আবার বৈশাখ। বাড়িতে পঙ্গু স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা বাবা। তারা তাকিয়ে আছে আমার দিকে।

রসুল জানান, তিনি কাজ করে টাকা না পাঠালে তাদের খাওয়া বন্ধ। তাই বসে থাকলে চলবে না। কাজ করতে হবে।

ইলিশ-পান্তা প্রসঙ্গে বলেন, ইলিশ-পান্তা বা বৈশাখ পালন গরিবের জন্য নয়। এটা ধনী লোকদের জন্য। ইলিশের যে দাম, সারা রাত কুলির কাজ করে ইলিশের আঁশও কিনতে পারা যাবে না। তিনি এক রাতে সবোচ্চ ৫০০ টাকা আয় করেন বলে জানান।

এ সময় কারওয়ান বাজারের রাস্তায় দেখা যায় প্রতিদিনের সেই চেনা চিত্র। অন্যান্য দিনও যেমন তারা রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকতো তেমনি ঘুমিয়ে আছে। কেউ ঝাঁকার ভেতর, কেউ ঝাঁকা মাথায় দিয়ে, কারো পা ঝাঁকার উপর। যে ঝাঁকাতেই বোঝা বয়েছেন সেই বাঁশের ঝাঁকাই যেন কারো কারো শান্তির বিছানা। কারো মাথার নিচে গামছা। কেউ বা ঘুমিয়ে আছেন মাল টানা ভ্যানে। মাথার নিচে নেই কিছুই। ঘাড়টা বাকা হয়ে আছে।

কঠোর পরিশ্রম শেষে এই শান্তির বিছানায় গা রাখতেই চোখে ঘুম। তাদের পাশ দিয়ে হর্ন বাজিয়ে দূরন্ত গতিতে সাই সাই করে গাড়ি গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। তাতে তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে না।

প্রতিনিয়ত ঝাঁকার ভেতরেই ঘুমান সিলেটের আবুল হোসেন। তিনি বলেন, এভাবে ঘুমাতে কোনো অসুবিধা হয় না।

তিনি জানান, ২৫ বছর ধরেই কুলির কাজ করেন। এক মণ বোঝা বয়ে পান তিন টাকা। প্রতি রাতে আড়াইশ থেকে তিনশ টাকা আয় করেন তিনি।

ফার্মগেট এলাকায় কথা হয় এক ভাসমান যৌনকর্মীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের কী আর বৈশাখ আছে। সাজুগুজু করব ঠিকই, তবে তা নিজের জন্য নয়। নিজেকে কিছু সময়ের জন্য অন্যের কাছে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য। টাকার জন্যই রাস্তায় নেমেছি। এই কাজ কোনো নারীরই ভাল লাগে না। তবুও অনুপায় হয়ে করতে হয়।

এদিকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবিতে প্রেসক্লাবে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে বেকার নার্সরা। তারা বৈশাখে রাস্তায় থাকবে। আন্দোলনকারী আলমগীর হোসেন ও হালিমা আক্তার বলেন, দেখেন বছরের একটা দিন আমরা পালন করব। কিন্তু আজ এমন একটা দিনে আমরা দাবি আদায়ে রাস্তায় রয়েছি।

পিরোজপুর থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা নীলা আক্তার বলেন, কাজের জন্য ঢাকা এসেছি। স্বামী মারা গেছে। ছোট একটা বাচ্চা আছে।

তিনি বলেন, ঢাকায় এসে কাজ পাইনি। থাকার জায়গা নেই । রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। রাস্তাই বাড়ি ঘর। রাস্তার মানুষের বৈশাখ যেমন কাটে তেমন কাটবে।

শুধু রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে, দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ যারা আছেন, তাদের কাছে বৈশাখ অন্য প্রতিদিনের মতো। বৈশাখ পালনের ইচ্ছে থাকেলও দারিদ্র্যতা কারণে তা সম্ভব হয় না।






মন্তব্য চালু নেই