মেইন ম্যেনু

ভোলায় নদী ভাঙ্গন এলাকায় শিশু অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে বাড়ছে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি

ভোলায় মেঘনার ভাঙনে সবচেয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে শিশুরা। এসব শিশুরা শিশু অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। চলতি বছরে সদর উপজেলার রাজাপুর ও ইলিশা ইউনিয়নের নদী ভাঙনে ঘর-বাড়ি হারিয়ে কয়েক’শ শিশু জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভোলার সাত উপজেলায় অনুপস্থিতির সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে। নদী ভাঙনে সহায়-সম্বল হারিয়ে এসব শিশুর অভিভাবক এলাকা ছাড়ছে কাজের সন্ধানে। জেলা প্রশাসকের সাধারন শাখার সূত্র মতে, ভোলা জেলায় এ বছর জেএসসি পরীক্ষায় ১৫ হাজার ৮১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৬৯২ জন অনুপস্থিত এবং জেডিসি(মাদ্রাসা) পরীক্ষায় ৮ হাজার ২০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৭৩ জন অনুপস্থিত রয়েছে। ধারনা করা হচ্ছে এসব পরীক্ষার্থী ভাঙনের কারনে অনুপস্থিত রয়েছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক নেতা মনিরউদ্দিন, ‘ভোলা বাঁচাও সংগ্রাম কমিটি’র আহবায়ক সাঈদ আলী, ভোলা সদর উপজেলার পূর্ব-ইলিশা ইউনিয়নের বাসিন্দা এ্যাডভোকেট মনিরুল ইসলাম, বিশিষ্ট মৎস্য ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন আহমেদ, পল্লী চিকিৎসক আমির হোসেনসহ একাধিক জন বলেন, মেঘনার নদী ভাঙনে রাজাপুর ও পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং নিরাপদহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। এ পর্যন্ত ভাঙনের মুখে মেঘনায় পড়ে আট জন ভেসে নিখোঁজ হয়েছে। এই আট জনের চার জনই শিশু। ভাঙনের কারনে পরিবারগুলো ঘর-আসবা পত্র ও সহায়-সম্বল সরাতে ব্যস্ত থাকে, তখন অরক্ষিত শিশুরা মেঘনায় পড়ে ভেসে যাচ্ছে। আবার তাঁদের উদ্ধার করাও হচ্ছে প্রতিদিন।

শিশুরা অভিভাবকের বাড়ি-ঘর, জমি-জমার সঙ্গে লেখাপড়াও বঞ্চিত হচ্ছে। বাড়ি-ঘর হারিয়ে বাবা-মা ভোলা ছেড়ে কাজের সন্ধানে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাচ্ছে। সেখানে জীবিকার প্রয়োজনে শিশুরাও শ্রম দিচ্ছে, এবং ভোলায় শিশুরা নদীতে মাছ ধরার কাজে ও ইটভাটায় ইট বহনের কাজ করছে। ভাঙনের কবলে পড়ে জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষা দিতে পারছে না অনেক শিশু। নদী ভাঙনের কারনে ঘর সরিয়ে অন্যের বাড়িতে তুলে রেখেছেন পূর্ব-ইলিশা কালুপুর গ্রামের আলাউদ্দিন,সফি,মিজান,কালু,সিরাজ, মোতাহার জানান, তাদের পরিবারের অন্তত ১০ শিশু বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ। আমাদের ঘর নাই রাত কাটাই অন্যের বারান্দায়। ঠিকমতো রান্না করতে পারি না, পোলাপান পড়ামু কিভাবে।

পূর্ব-ইলিশা ইউনিয়নের ১৩ নং উত্তর মুরাদ-সফুল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবা ভাঙনের ভয়াবহতা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছে প্রায় ৪৪ জন শিক্ষার্থী। শেষ সময়ে মডেল টেষ্টে ৩২ জন অংশ নেয়। আশা করা যায় এ ৩২ জন পিএসসিতে অংশ নেবে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের অন্য শ্রেণীতে শতকরা ২০ ভাগ শিশুর অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

মৌলভীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণীতে উঠেছিলো ১৩৩ জন। মডেল টেষ্ট দিয়েছে ১২০ জন। বিদ্যালয়ের অন্য শ্রেণীতে অনুপস্থিতির হার শতকরা ৩০ ভাগ। অনুপস্থিতির হার দিনে দিনে বাড়ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এ ছাড়া দক্ষিণ-মধ্যম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর রূপাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ-মধ্যম রামদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর রামদাসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১১টি বিদ্যালয়ে প্রায় ১৯০ জন পিএসসি পরীক্ষার্থীর অনুপস্থিতির খোঁজ পাওয়া গেছে।

ইদী ভাঙনের মুখে পড়া মৌলভীরহাট ডিগ্রী (ফাজিল) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম বলেন, এফতেদায়ী (পঞ্চম) পরীক্ষায় ৫০ ভাগ এবং অষ্টমে ৩০ ভাগ পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ মাদ্রাসা পাশে গাজীপুর মাধ্যমিক, রাজাপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে, ওবায়দুল হক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও রাজাপুর আদর্শ নিন্ম-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকগন একই আশঙ্কা করছেন। এসব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকগন বলেন, আগামী বছর বিদ্যালয়ের অর্ধেক ছাত্র কমে যাবে। যাঁদের অনেকেই অন্যস্থানেও বিদ্যালয়ে ভর্তি হবে না।
সহকারী সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভাঙন কবলিত পূর্ব-ইলিশা ও রাজাপুর ইউনিয়নের ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির সংখ্যা বাড়ছে। তিনি অনুপস্থিত পিএসসি পরীক্ষার্থীদের খুঁজে নিজস্ব তত্ত্ববধানে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ানোর জন্য প্রধান শিক্ষকদের বলেছেন।
ভোলা সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ কামরুজ্জামান বলেন, যাঁরা ভোলায় আছে তাদের পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিতির আহবায়ক ও সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, ভোলার প্রতি উপজেলায় নদী ভাঙন কবলিত পিএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ ক্যাম্প নির্মাণ করে পরীক্ষা নেওয়া উচিৎ। এবং ভাঙন প্রতিরোধ করে ভাঙন কবলিতদের পূর্ণবাসন করা দরকার।

জাতীয় শিশু টাস্কফোর্স (এনসিটিএফ) ভোলা জেলা শাখার সমন্বয়কারী আদিল হোসেন তপু তালুকদার বলেন, ভাঙনের কারনে প্রতি বছর শত শত শিশু শিক্ষা বঞ্চিত হয়ে নদীতে মাছ ধরার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নিচ্ছে। আর মেয়েরা ঢাকাতে কাজের সন্ধানে গিয়ে পাচারকারীদের কবলে পড়ছে। নদী ভাঙনের কারনে ভোলার হাজার হাজার শিশু তাদের অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে।






মন্তব্য চালু নেই