মেইন ম্যেনু

মতি মাষ্টারের মেয়ে আলো

আবু রায়হান মিকাঈল : কুসুমপুর গ্রামের আদর্শের প্রতীক মতি মাষ্টার। সবার কাছে তিনি এই মতি মাষ্টার নামেই সুপরিচিত। তিনিই ছিলেন একমাত্র কুসুমপুর গ্রামের ঋণমুক্ত ব্যক্তি। মতি মাষ্টারের বড় মেয়ে আলো। আলোর আলোতে যেন আলোকিত পুরো কুসুমপুর গ্রাম। কুসুমপুর গ্রামে তার মত মেয়ে আর দ্বিতীয়টি নেই।

অনেক দিন আগের কথা। আলো তখন ক্লাস ফোর-এ পড়ে। একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় আলো দেখল, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পাশের পাড়ার একটা মেয়ে কাঁদছে। আলো তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, এই মেয়ে তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কি হয়েছে? মায়াবী চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে ঐ মেয়েটি বলল, কাল থেকে আমার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। কিন্তু আমি এখনো ফি জমা দিতে পরিনি। আমার বাবা খুব অসুস্থ আয় রোজগার করতে পারছে না। তাই এখনো ফি দিতে পারিনি। কথাগুলো শুনে ছোট্ট আলো অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। তার টিফিনে খাওয়ার টাকা গুলো সে ঐ মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, আর কেঁদো না। এই টাকা থেকে তুমি পরীক্ষার ফি দিও। এমনিভাবে আলো টিফিনে না খেয়ে টাকা বাঁচিয়ে নানাভাবে অন্যদের উপকার করত।

আলোদের সংসার ছিল অতি সাধারণ। বাবার উপার্জনে কোনো রকম চলে যেত সংসারের চাকা। কিন্তু তাদের সংসারে সুখের কোনো কমতি ছিল না। বাবা মা আর তিন ভাইবোন নিয়ে আলোদের সংসার।

আস্তে আস্তে এক সময় প্রাইমারী-হাইস্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের বারান্দায় পা রাখল আলো। আলোর ছোট ভাই দুটো ছিল খুবই চঞ্চল। তারা যেটার বায়না ধরত সেটা পূরণ করতেই হতো। তাই আলো নিজের সব চাওয়া ও ইচ্ছাকে কবর দিয়ে তাদের ইচ্ছাটাই পূরণ করেছে। এমন শত ত্যাগের পর আলোর চোখে মুখে ছিল না কোনো হাসি খুশির কমতি। অতি সাধারণ পরিবারের এই অসাধারণ মেয়েটির কষ্টের জায়গাটা কেউ দেখতে পেত না। কারণ আলো সব সময়ই তার সব কষ্ট নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখত। এক সময় আলোর কলেজ জীবন শেষ হলো। তারপর সে ভর্তি হলো অনার্সে।

সবার জীবনে কোনো এক সময় উঁকি দেয় বসন্তের কোকিল, তেমনই আলোর জীবনেও। মনের অজান্তেই আলোর মনে বাসা বাঁধে এক কোকিল কুমার। বসন্তের এই কোকিলা সুর আলোকে অনেক আপন করে নেয়।

আলো তখন অনার্সের ছাত্রী। হঠাৎ একদিন ফোনালাপে আকাশ নামে এক ছেলের সাথে আলোর পরিচয় ঘটে। প্রায়ই আকাশ আলোকে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিত। কিন্তু আলো বরাবরই কথা বলতে নারাজ ছিল। তারপরও আকাশের প্রতি কোনো এক জায়গায় যেন আলোর দুর্বলতা ছিল। কারণ একটা সময় আলো জানতে পারে আকাশের মা নেই। সৎ-মায়ের কাছে লালিত পালিত হয়েছে আকাশ। এরপর থেকে আকাশের প্রতি কেন জানি একটু দুর্বলতা কাজ করত আলোর মনে। এমনিভাবে মাস খানিক ফোনালাপ চলতে থাকে আলো আকাশের। মাঝে মধ্যে আকাশ আলোর মায়ের সাথেও কথা বলত।

এক সময় আকাশ আলোকে তার ভাল লাগা-ভালবাসার কথা বলে। আলোকে সে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। আলো তখন আকাশের এই কথাগুলো স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারিনি। তাই আলো চড়াও ভাবে আকাশের সাথে দূর্ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেদিন আকাশ আলোর সব কথা মনে না নিয়ে মেনে নিয়েছিল। একটা সময় বিষয়টা আলোর পরিবার জানতে পারে। তখন আকাশের সাথে তার পরিবারও অনেক খারাপ ব্যবহার করে। তবুও আলোর পিছু ছাড়েনি আকাশ।

আস্তে আস্তে আলো আকাশের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু তারপরও আকাশ প্রতিনিয়তই আলোকে ফোন করতে থাকে। এক সময় আলো ভাবে- আমার জন্য একটা ছেলে কেন এমন পাগল? আমার মধ্যে সে কি এমন পেয়েছে? তাছাড়া আকাশের দুর্বলতার জায়গাটি আলোকে প্রতিনিয়তই আঘাত করতে থাকে। এমনিভাবে এক সময় আকাশের প্রতি আলোর ভাল লাগা থেকে ভালবাসা সৃষ্টি হয়। এভাবে আলো আকাশের মধ্যে গড়ে ওঠে ভালবাসার এক অপূর্ব বন্ধন।

আলোদের পাশের এক জেলা পরেই আকাশের বাসা। কিন্তু আজও আলো আকাশ কেউ একে অন্যকে দেখেনি।
আকাশের পড়াশুনা শেষ। এখন সে ঢাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করছে।

হঠাৎ একদিন আকাশ আলোকে বলল, আলো তোমাকে দেখার জন্য আমার মনটা ছটফট করছে। তোমাকে অনেকদিন থেকেই বলছি কিন্তু তুমি কোনো গুরুত্বই দিচ্ছ না। তখন একটু ভেজাকণ্ঠে আলো বলল, সর্বক্ষণ আমারও মনটা ব্যাকুল হয়ে থাকে তোমাকে দেখার জন্য। কিন্তু একটা ভয় যে মনে সব সময়ই কাজ করে। তখন আকাশ বিস্মিত হয়ে বলল, কি এমন ভয় আলো? আমাকে বল? তারপর আলো বলল, জানো আকাশ জগতের নিয়ম আগে চোখে দেখা, তারপর ভাল লাগা ভালবাসা। কিন্তু আমাদেরটা সম্পূর্ণ উল্টো। আমরা কেউ কাউকে না দেখেই ভালবেসেছি। আমার খুব ভয় করে আমাকে দেখে যদি তোমার পছন্দ না হয়!!!

আলোর মুখের এ কথা শেষ না হতেই আকাশ বলে উঠল, আলো তুমি যেমনই হও না কেন, তবুও তুমি আমার কাছে স্বপ্নের রাজকুমারী হয়ে থাকবে। কিন্তু আমাকে তোমার পছন্দ হবে কিনা জানিনা। এরপর আলো বলল, শোনো আকাশ আমি তোমার চেহারাকে নয়, তোমার ঐ নিষ্পাপ মনকে ভালবেসেছি। এজন্য তুমি যেমনই হও না কেন আমি মেনে নিতে পারব। আর তুমি কাল সকালে আমার কলেজ গেটে এসো, সেখানে দেখা হবে।

দিন ফুরিয়ে রাত্রি এলো। রজনীর বুক চিরে বইছে হিমেল হাওয়া। তবুও দু’চোখে ঘুম আসে না আলোর। আলোর শয়নে স্বপনে যেন মিশে আছে শুধুই আকাশ। রাত পোহালেই দেখা হবে তার সেই স্বপ্নের মানুষটির সাথে।

জোনাকির মিটিমিটি আলো আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার গানে রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আলো আজ একটু তাড়াতাড়ি কলেজে গেল। কলেজ গেটে যেতেই আলো দেখল এক অপরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই আলোর ফোনে কল আসে। কল রিসিভ করার সাথে সাথে আলো বুঝতে পারে ঐ ছেলেটি তার আকাশ। এরপর তারা একে অপরের একটু কাছে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশ অপলোক ভাবে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। আর মনে মনে ভাবছে, আলো তুমি এত সুন্দর যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।

এদিকে আলো বাকরুদ্ধের মত প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। তারপর হঠাৎ আলো লজ্জাভরা লাজুক কণ্ঠে বলে উঠল, কি ব্যাপার চুপ কেন? কি ভাবছ? আকাশ চমকে উঠল, সে যেন এতক্ষণ অন্য জগতে ছিল। তারপর আকাশ কণ্ঠস্বর নরম করে বলল, কি বলল; তোমাকে দেখে সব ভাষা যে আমি হারিয়ে ফেলেছি। সত্যি আলো তুমি অপূর্ব সুন্দর। জানো আলো তোমায় দেখার আশায় কাল রাতে আমার মোটেও ঘুম আসেনি। তাই ভোরে তোমার কলেজ গেটে এসে

দাঁড়িয়ে আছি। আকাশের কথাগুলো শুনে আলো রীতিমত মুগ্ধ হচ্ছিল। আর মনে মনে বলতে লাগল, আকাশ তুমি আমাকে এত ভালবাস? সত্যি তোমার ভালবাসার তুলনা হয় না।

একটু পরই আকাশ বলে উঠল, আলো তুমি তো দেখছি ভারি লাজুক। এত লজ্জা পাচ্ছ কেন? এমনইভাবে কিছুক্ষণ কিছু রোমান্টিক সময় কাটাল আলো আকাশ।

আকাশের সাথে দেখা শেষে কলেজ করে বাসায় ফিরল আলো। আকাশ দেখতে খুব একটা সুন্দর ছিল না। তাই বাসায় ফিরে আনমনা ভাবে শুধুই যেন কি ভাবছে আলো। কিন্তু আকাশের কথাগুলো ছিল সুমিষ্ঠ, যেগুলো আলো ভুলতেই পারে না। আলোর কাছে আকাশের মনটা যেন পুরো নিষ্পাপ। এক সময় আলো ভাবল, আকাশ দেখতে যাই-হোক তার মনটা তো একেবারেই সাদা। তাহলে কেন আমি এতকিছু ভাবছি। একজন সাদা মনের মানুষ পেয়েছি এটাই আমার জন্য অনেক।

দিন যায়, মাস যায় আর মান-অভিমানের মধ্যদিয়ে আকাশ আলোর ভালবাসা আরো গভীর হতে থাকে। দিনের পর দিন আকাশকে নিযে মনের আঙিনায় ছোট্ট কুঠির বাঁধে আলো। আলো আকাশকে এতটাই বিশ্বাস করে যে, কখনই আকাশের কোনো অপরাধ আলোর চোখে ধরা পড়েনি। আকাশের সব অপরাধই ঢাকা পড়েছে আলোর আত্মবিশ্বাসের ছায়ায়।

আলো আকাশের ব্যাপারে কিছু কিছু কথা তার পরিবারকে জানায়। এক পর্যায়ে আকাশ আলোর মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক ঘনিষ্ট করার চেষ্টা করে। তবে ইতোমধ্যে আকাশ আলোদের বাসায় এসেছিল। তখন আলোকে বিয়ে করার ব্যাপারে আকাশ তার পরিবারের সাথে কথাও বলে। আলোকে বিয়ে করার জন্য প্রায় নাছড়বান্দা হয়ে পড়ে আকাশ। এক পর্যায়ে আলোর বাবা মা আকাশকে বলে, আলোর পড়াশুনা শেষ হোক তারপর দেখা যাবে। সেদিন এভাবেই ঝুলে থাকে আকাশ আলোর বিয়ের ব্যাপারটি।

দেখতে দেখতে তিনটি বছর পেরিয়ে গেল। ইতোমধ্যে আলো আকাশের আরো একবার দেখা স্বাক্ষাত হয়ে গেছে।

এদিকে আলোর মাঝে মধ্যে প্রচন্ড মাথা ব্যাথা করে। যার ফলে আলো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিগত কয়েক মাস যাবৎ তার এ সমস্যা হচ্ছে। ডাক্তারের ঔষধ খেলে কিছুদিন সুস্থ থাকলেও পরে আবার মাথা ব্যাথা শুরু হয়। আলোর অসুস্থতা আকাশকে বিরক্ত করে তোলে। আর আলোর এত ঔষধ খাওয়াটাও আকাশের পছন্দের ছিল না।

একদিন আলো হঠাৎ তার কলেজ ক্যাম্পাসে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এ সময় তার সহপাঠীরা আলোকে পাশের এক হাসপাতালে ভর্তি করে। ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরিক্ষার পর রিপোর্ট আলোর সহপাঠীদের হাতে দিয়ে বলল, আলোর অবস্থা খুব একটা ভাল না। তার মরণব্যাধি ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে। ডাক্তারের কথা শুনে অঝরে আলোর চোখ দিয়ে জল বের হতে লাগল। আর সহপাঠীরা সবাই অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। একটু পর আলো তার সহপাঠীদের বলল, তোমরা আজকের ঘটনা প্লিজ কাউকে বলবে না।

আলো একটু সুস্থ হয়ে দুপুরের পর বাড়ি গেল। ছোট্ট এই পৃথিবীতে আর মাত্র ক’দিনের জন্য আছে আলো। পারিবারিক অবস্থা আর ছোট ভাই দুটোর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে পুরো ঘটনাটি আলো তার পরিবারের কাছে গোপন করল। তবে বিষয়টি সে আকাশকে বলল। আলোর ব্রেন ক্যান্সারের কথা শুনে যেন আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ পর বলল, আলো তুমি এ কি বলছ? তোমার মাথা কি ঠিক আছে? হ্যাঁ আকাশ, ডাক্তারী রিপোর্ট যা বলছে আমি তো শুধু সেটাই বললাম মাত্র। কথাগুলো বলে নিরবে কাঁদতে থাকে আলো।
যতই দিন যায় ততই আলোর মাথা ব্যাথা বাড়তে থাকে। ঠিক মত আর খাওয়া দাওয়া করতে পারে না। প্রায় সব সময় সে শুয়ে থাকে।

হঠাৎ একদিন মা আলোকে জিজ্ঞাসা করল, আলো তোর কি হয়েছে মা? দিন দিন তোর এ কি হাল হচ্ছে? তখন আলো মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, মা আমার কিছু হয়নি। সামান্য একটু মাথা ব্যাথা করছে, ঔষধ খেয়েছি ঠিক হয়ে যাবে।

এদিকে আকাশ কয়েক দিনে কেমন যেন বদলে গেছে। সে আর আগের মত আলোকে খোঁজ খবর নেয় না। শুধু মাঝে মধ্যে তাদের দু’একটা কথা হয়।

আস্তে আস্তে ঘোর আমাবশ্যার অন্ধকার ধেয়ে আসছে আলোর জীবনে। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ির আঙিনায় মাথা ঘুরে পড়ে যায় আলো। এ সময় সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন তাড়াতাড়ি তাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আলোকে নিয়ে এখন পুরো পরিবারে বিরাজ করছে আতঙ্ক আর টেনশন।

পরের দিন দুপুরে ডাক্তার আলোর বাবা মাকে জানান যে, আলোর ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে। কথাটি শুনে চিৎকার দিয়ে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়ল আলোর মা। তখন আলোর বাবা মতি মাষ্টার অশ্রুসিক্ত চোখে বলল, আলোর মা তুমি এভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ছ কেন? আলো যদি জানতে পারে তার ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে তখন তার অবস্থা কি হবে একবার ভেবেছ? যাই-হোক আলো যেন এখন কিছু না বুঝতে পারে। এ কথা বলে মা আর বাবা আলোর কেবিনে গিয়ে দেখল, আলোর চোখ দিয়ে অঝরে অশ্রু ঝরছে। তখন মা আলোকে জিজ্ঞাসা করল, তুই কাঁদছিস কেন মা? তোর তো কিছু হয়নি। তারপর আলো কাঁদতে কাঁদতে তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মাগো কেন তুমি আমাকে মিথ্যা আশ্বাস দিতেছ? জানি সুন্দর এই পৃথিবীর আলো বাতাস আমি আর বেশি দিন দেখতে পারব না। কারণ আমার যে ব্রেন ক্যান্সার হয়েছে। মেয়ের মুখে এ কথা শুনে মা স্তব্ধ হয়ে অপলোক চোখে তাকিয়ে আছে আলোর দিকে। তারপর আলো আবারও বলল, মা এখান থেকে ৩ মাস আগে আমার ব্রেন ক্যান্সারটি ধরা পড়েছিল। কিন্তু আমি সেটা এতদিন তোমাদের কাছে গোপন করে রেখেছিলাম। কারণ আমার তো মরণ ব্যাধি ক্যান্সার হয়েছে। আমার জন্য যদি তোমরা শেষ সম্বল টুকুও ব্যয় কর তবুও তো আমি বাঁচব না। তাহলে আমার ছোট ভাই দুটোর ভবিষ্যৎ কি হবে? আপুর মুখে এমন কথা শুনে আদরের ছোট ভাই দুটো বলল, আপু তুমি কেঁদো না। তুমি ভাল হয়ে যাবে আপু। আমরা তোমার কাছে আর বায়না ধরব না, তোমাকে আর কষ্ট দিব না। প্লিজ আপু তুমি আর কেঁদো না। ছোট ভাইদের কথা গুলো যেন আলোর কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিল। আলো তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, কাঁদিস না ভাই। একদিন তো সবাই চলে যাবে। আমি না হয় একটু আগেই যাচ্ছি। আপুর মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই হাউ মাউ করে কেঁদে উঠল তারা।

তারপর বাবা মতি মাষ্টার বলল, আলো তোর কিছুই হবে না। আমার যত কষ্ট হোক তোর চিকিৎসা করাব। তুই আগের মত আবার ভাল হয়ে যাবি মা। আলোদের পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাদের কান্নায় যেন আকাশ বাতাস ভারি হয়ে গেছে।

দেখতে দেখতে হাসপাতলের বেডে তিনটি দিন কেটে গেল আলোর। ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ছে সে।
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, তার এই কষ্টের দিনে মনের মানুষটি সবার আগে দূরে সরে গেল। যতই দিন যাচ্ছে আলোর আকাশ যেন নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছে।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আলো প্রতিনিয়তই আকাশকে ফোন দিচ্ছে কিন্তু মাঝে মধ্যে সে ফোন রিসিভ করলেও কোনো কথা বলছে না। সত্যি পড়ন্ত বিকালে আলো আজ বড়ই একা হয়ে গেল।

একদিন সন্ধ্যায় আকাশের বন্ধু আবির দেখে আকাশ গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ক্লাবে ফূর্তি করছে। এ সময় আবির রাগান্বিত হয়ে বলল, এ কি আকাশ!!! তুই কি মানুষ? এদিকে তোর আলো হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে আর তুই মেয়ে নিয়ে ক্লাবে ফূর্তি করছিস? এই কি তোর আসল রূপ? তখন উচ্চস্বরে আকাশ বলল, আলো তো আর বাঁচবে না। আজ বা কাল সে তো মরেই যাবে। তাহলে কি লাভ তার সাথে যোগাযোগ রেখে। শেষ পর্যন্ত হয়তো চিকিৎসার জন্য সে আমার কাছে টাকা পয়সাও চাইতে পারে। সেদিন এমন বেশ কিছু কথা সে আবিরকে শুনিয়ে দেয়।

আজ ১৫ দিন হয়ে গেল আলো হাসপাতালে মৃত্যুর পথযাত্রী হয়ে আছে। মৃত্যু যেন তার খুব কাছেই চলে এসেছে। শেষ সময়ে আলোর শেষ সঙ্গী শুধুই চোখের জল।

আলোর জীবনে আজ সবচেয়ে বড় কষ্টের দিন। আকাশের বন্ধু আবির আলোকে সব বলেছে। এটাও বলেছে যে, আলো নাকি একটা নষ্টা মেয়ে। সে নাকি কয়েকবার আকাশের সাথে দৈহিক সম্পর্কও করেছে। এ পর্যন্ত সে আকাশের কাছ থেকে বহু টাকা পয়সা নিয়েছে। কথাগুলো আলো কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না। কাঁদতে কাঁদতে চোখের জলে আলোর বালিশটা পর্যন্ত ভিজে গেছে। আলো কখনই ভাবতে পারেনি তার ভালবাসার মানুষটি তাকে এভাবে অপবাদ দিবে। এক পর্যায়ে আলোর অপবাদের কথাগুলো তার পরিবারের কানে ওঠে। আর শেষ মুহুর্তে আলোর জীবনের কষ্ট গুলো যেন তাকে কাল সাপের মত দংশন করতে থাকে।

এদিকে বাবা মতি মাষ্টার অনেক কষ্ট করে আলোর চিকিৎসার কিছু টাকা জোগাড় করল। কাল আলোকে নিয়ে তার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনরা ঢাকায় যাবে। সেখানে মেডিকেলের বড় ডাক্তার দেখাবে।

পরের দিন যথারীতি আলোকে নিয়ে পরিবারের লোকজন ঢাকায় গেল। সেখানে একটা বড় হাসপাতালে আলোকে ভর্তি করা হলো। দুদিন পরেই বের হলো আলোর মেডিকেল রিপোর্ট। রীতিমত সবাই হতবাক। কারণ রিপোর্টে দেখা গেছে আলোর ব্রেন ক্যান্সার নয়, ব্রেন টিউমার হয়েছে। যেটার অপারেশন এখানে সম্ভব।

আজ রাতে আলোর অপারেশন। রাতভর পরিবারের সবাই আলোর জন্য দোয়া করতে লাগল। আর অবুঝ দুটি ভাই অঝরে চোখের জল ফেলে কাঁদছে। কারণ তাদের সবচেয়ে দরদের জায়গাটি হলো আলো আপু। আপু যে তাদের কোনো কিছু কখনই অপূর্ণ রাখেনি।

রাত পেরিয়ে সকাল হলো। আলোর অপারেশন সাকসেস ফুল। সকালের সূর্যটা যেন আজ মিষ্টি হেসে রোদ্র ছড়াচ্ছে। ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগল আলো।

অবশেষে দেড় মাস পর সুস্থ হয়ে গ্রামের বাসায় ফিরল আলো। আলোর বাড়ি ফেরার খবরটি ইতোমধ্যে আকাশ জানতে পারে।

একদিন সকালে হঠাৎ আকাশ আলোকে ফোন দিয়ে বলে, কেমন আছো আলো? আমি নানা সমস্যার কারণে তোমার সাথে সেই ভাবে যোগাযোগ রাখতে পারিনি। প্লিজ রাগ কর না, ক্ষমা করে দাও। আকাশের কথাগুলো শুনে রাগান্বিত হয়ে উচ্চস্বরে আলো বলে উঠল, তুমি আর কি চাও আকাশ? বলতে পার সেদিন আমার কি অপরাধ ছিল? তারপর আকাশ বলল, আলো তুমি চুপ কর। প্লিজ আমার উপর রাগ করে থেকো না। জানো আলো আজ আমি বড় একা। চারপাশে শুধুই ঘোর অন্ধকার।

এরপর আলো বলল, যখন আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলাম, তখন তুমি একটিবারের জন্যও আমার খোঁজ নাওনি। তখন কোথায় ছিল তোমার এত দরদ? আমার বুকে জ্বালিয়ে দিয়েছ কষ্টের মহাআগুন আর আমাকে ঠেলে দিয়েছ মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে। শুধুই কি তাই, আমাকে দিয়েছ নানা মিথ্যা অপবাদ। তোমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবাসার কি এটাই ছিল প্রতিদান? আজ তুমি যে আলোর সাথে কথা বলছ, তাকে তো তুমি অনেক আগেই কবর দিয়ে দিয়েছ। আমি জানি আজ তোমার পাশে কেউ নেই, তাই এই হতভাগা আলোর কথা তোমার আবার মনে পড়েছে। শোনো আকাশ ভালবাসা কোনো পুতুলে খেলা নয় যে তুমি চাইলেই যা ইচ্ছা করতে পার।

আলোর কথাগুলো শুনে খুব কষ্টস্বরে আকাশ বলল, আলো তুমি ঠিক বলেছ। আমি অনেক অনেক পাপ করেছি। হয়তো জীবনের বাকীটা দিনগুলো তোমাকে হারানোর বেদনা আমাকে কুরে কুরে খাবে।

তখন আলো বলল, তোমার আবার কষ্ট কিসের? তুমি তো আমাকে কখনো ভালইবাসনি। আর পাপের কথা বলছ? সেটা তো তুমি সব সময় কর। তোমার তো অনেকেই আছে তাদের সাথে সময় খুব ভাল ভাবেই কাটে যাবে। আলোর কথায় আকাশ রেগে গিয়ে ফোনটা কেটে দিল। এরপর কিছুদিন আলো আকাশের কোনো যোগাযোগ হয় না।

সপ্তাহ খানিক পর আকাশ আলোকে আবারও বার বার ফোন করতে থাকে। এক পর্যায়ে আলো বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করে বলল, আকাশ তুমি আর কখনই আমাকে ফোন দিবে না। আমি তোমাকে আর সহ্য করতে পারছি না। আকাশ কান্নাস্বরে বলল, প্লিজ ফোনটা কেটো না আলো। কিন্তু আলো সেদিন আকাশের কোনো কথা না শুনেই ফোনটা কেটে দিল। এভাবে বহুদিন চলে গেল।

এক সময় আলোর পড়াশুনা শেষ হয়ে গেল। একদিন আলো একটা সরকারি চাকরিও পেল। এ খবর শুনে আকাশ এবার আলোর আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে লাগল। কিন্তু কারও কাছে সে পাত্তা পেল না।

এদিকে আলোর বাড়ি থেকে তার জন্য একটা চাকরিজীবী পাত্র পছন্দ করল। এবার আলো গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। এখন সে কি করবে? কারণ সে আজও মন থেকে আকাশের নাম মুছতে পারেনি। কথায় বলে, নারীর মন তো একটাই, এই একটা মন একবার যাকে দেয় তাকে কি সহজে ভুলা যায়? ঠিক আলোর ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে।

একদিন আলো তার পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল। একদিন ধুমধাম আয়োজনে পরিবারের পছন্দের পাত্রের সাথে আলোর বিয়েও হয়ে গেল।

আলোর বিয়ের খবর শুনে আকাশ যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিরাহ বেদনায় আকাশের মন যেন তুষের আগুণের মত পুড়ছে। এক সময় সে তার চাকরিটা পর্যন্ত ছেড়ে দিল। আকাশ যেন এই দুনিয়ায় আজ সবচেয়ে বড় অসহায়। দিনরাত নয়ন ভরা অশ্রু এখন তার একমাত্র সঙ্গী। নিয়তির খেলায় পরাজিত হয়ে এভাবে কাটতে থাকে আকাশের দিনগুলি।






মন্তব্য চালু নেই