মেইন ম্যেনু

মরুতে হয়েছে কবর, কেউ রাখেনি খবর

২০১২ সালের আগস্ট মাসের এক দুপুরবেলায় লাকি ইজ এবং তার বন্ধু গডফ্রে মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিবে। লাকি ইজের বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর। দুই বন্ধুর উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাহারা পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যাওয়া। এই কিশোর তখনো জানতো না, সাহারার অকুল মরুতে ঠিক কি ধরনের দুর্ভোগ অপেক্ষা করছে তারা জন্য। পরে জেনেছিল ঠিকই, কিন্তু বন্ধু গডফ্রের পরিবারকে সেই নির্মম সত্য জানানোর মত সাহস সে আজো পর্যন্ত সঞ্চয় করে উঠতে পারেনি। এটা লাকির ইজের একান্তই আপন এবং গোপন কাহিনী।

যাত্রার দিন নাইজেরিয়ার এই দুই কিশোর পূর্ব নির্দেশ মত সাহারার একপ্রান্তে এসে হাজির হলো। চোরাচালানকারী দলটি এখান থেকেই তাদেরকে তুলে নেবে, শুরু হবে পৃথিবীর দীর্ঘতম মরুভূমির বুকে তাদের যাত্রা। পথে খাওয়ার জন্য তারা সাথে নিয়েছে বিস্কুট, পানি, দুধ এবং এনার্জি ড্রিংক। একসময় পিকআপ এসে হাজির হলো। পিকআপে তাদের মতই আরও ৩৬ জন যাত্রী ছিল। পাচারকারীরা নাজেরিয়ার উত্তর দিকের আগাদেজ শহর থেকে যাত্রা শুরু করেছে, পথে তুলে নিয়েছে অন্যান্য যাত্রীদের। পিকআপের পেছনে অনেক রকমের রসদ বোঝাই করা। যাত্রীরা সবাই এগুলোর উপরেই বসে আছে। লাকি আর তার বন্ধু উঠে বসলো পিকআপের পেছনে।

লাকি এমনভাবে বসেছিল যে তার দুই পা ঝুলছিল ট্রাকের বাইরে। অথচ সে ভাল করেই জানতো এটা কোনো আনন্দ ভ্রমন না, সে যদি এখন হুট করে গাড়ি থেকে পড়ে যায়, তাহলে ড্রাইভার গাড়ি থামাবে না। তাকে ফেলেই চলে যাবে। শুধু সে না, অন্য যে কেউ পড়ে গেলেও একই ঘটনা ঘটবে। রোদের তাপে লাকির গা পুড়ে যাচ্ছিল, ক্ষুধার্থ মুখের ভেতরটা লাগছিল খসখসে শুকনো। গাড়ি চাকায় লেগে যে বালি উড়ছিল, বাতাসে সেই বালি এসে পড়ছিল লাকির মুখে, ঢুকে যাচ্ছিল চোখে। একটানা তিন দিন এইভাবে চললো। মাঝখানে শুধু তেল নেয়ার জন্য এবং পানি খাওয়ার জন্য স্বল্প বিরতি দেয়া হতো।

কিন্তু চতুর্থ দিন ঘটলো আসল ঘটনা। গাড়ির ড্রাইভার পথ হারিয়ে ফেলল। মরুভূমিতে আর সাগরে পথ চলতে হয় কম্পাসের সাহায্যে। কিন্তু তাদের ড্রাইভারের কম্পাস নষ্ট হয়ে গেলো। কম্পাস ছাড়া তাদেরকে অন্ধের মত ঘুরতে হবে ধূধূ মরুতে, কিছুতেই বেরুতে পারবেনা এখান থেকে। আগেও অসংখ্য মানুষ দিক হারিয়ে হা-পিত্যেশ করে মরেছে মরুভূমিতে।

ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে যে সমস্ত অভিবাসী ইউরোপ যায় তাদের উপর নজর রাখার জন্য আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাই রয়েছে। যেমন, গত বছর প্রায় ৪ হাজার শরণার্থী ডুবে মারা গিয়েছিল সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে। কিন্তু সাহারা পাড়ি দিতে গিয়ে যারা মরেছে তাদের খবর কেউ রাখে না। মানবাধিকার কর্মীরা বলছে, এতে করে রাজনীতিবিদদের জন্য গোটা ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া আরও সহজ হয়ে গেছে।

উত্তর আফ্রিকায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার একটি দল রয়েছে। কিন্তু মরুভূমিতে ঠিক কতজন মানুষ মারা গেছে তার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি অভিবাসীদের পরিবারের মধ্যে একটা মিলন ঘটায় ঠিকই কিন্তু পরিবারের কতজন পথে মারা গেছে সেই হিসাব তারা রাখে না। শুধু মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবক এবং একাডেমিকরা এদের কিছুটা খোঁজ খবর রাখে। কিন্তু তারপরেও এদেরকে মূলত নির্ভর করতে হয় সংবাদ মাধ্যমের উপর। তাছাড়া এই কাজে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন সেটা তাদের নেই।

অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশান ইন্সটিটিউট প্রায় এক যুগেরও বেশি দিন যাবত সাহারা মরুভূমিতে কাজ করছে। সেখানকার সহকর্মী জুলিয়েন ব্রাচেট বলেন, ‘আমাদের কাছে বাস্তবিক অর্থে কোন তথ্য নেই। এটা একটা মারাত্মক সমস্যা। কারণ, এমনও হতে পারে যে, ভূমধ্য সাগরে যে পরিমাণ মানুষ মরেছে, ঠিক সেই পরিমাণ মানুষ হয়তো সাহারাতেও মরছে। কিন্তু তাদের খবর আমরা জানিনা। যেহেতু আমরা এটা প্রমাণ করতে পারছিনা, সেহেতু আমরা এটা বলতে পারছিনা এবং শেষ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসছে না।’

নাইজেরিয়ার আগাদেজ শহর অনেক আগে থেকেই মরুভূতে বের হওয়ার রাস্তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) হিসেব মতে, ২০১৫ সালে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার অভিবাসী এই শহরের ভেতর দিয়ে ইউরোপ কিংবা উত্তর আফ্রিকার দিকে গেছে। এই সংখ্যাটা ২০১৪ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। অতীতে, মানুষ প্রকাশ্যেই শহর ত্যাগ করতো এবং অনেক ক্ষেত্রে সামরিক বহর তাদের কিছুটা নিরাপত্তাও দিত।

কিন্তু ২০১৩ সালে একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল এখানে। এই শহর থেকে মরুভূমিতে যাত্রা করার পর ৯২ জন ভ্রমণকারী পানি তৃষ্ণায় মারা যান। সরকার বাধ্য হয়ে পরে রাস্তাটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু মানুষ পাচার থামেনি। শুধু ব্যাপারটা গোপন হয়েছে।

এইবার লাকি ইজের গল্পে ফিরে যাওয়া যাক। যাত্রার চতুর্থ দিন ড্রাইভার পথ হারানোর পর তাদের ট্রাক চলেছে তার পরে আরও ৫ দিন। তারা ভেবেছিল এভাবে হয়তো কোনও না কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে, যা দেখে আবার রাস্তায় ফিরে যেতে পারবে। কিন্তু ততদিনে তাদের সমস্ত খাবার পানি ফুরিয়ে গেলো। রাতের বেলায় যখন গাড়ি চলতো তখন ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ঘোরাক্রান্ত যাত্রীদের অনেকে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যেত ট্রাক থেকে। ড্রাইভার একবারের জন্য গাড়ি থামাত না।

লাকি ইজের বয়স এখন ১৮ বছর। তিনি বলেন, ‘পরের দিন সকালে আমরা যখন নিজেদেরকে গুনে দেখতাম, দেখা যেত অনেকেই নেই সেখানে।’ তবে লাকি ট্রাক থেকে পড়ে যায় নি। শেষ পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছিল সাহারা। ইউরোপে পৌঁছে প্রথম এক বছর কাটিয়েছিল ইতালির ক্যাটানিনার তরুণ শরণার্থী কেন্দ্রে।

কিন্তু গল্প এখনো শেষ হয় নি। খাবার পানি ফুরিয়ে যাওয়ার পরপরই তাদের গাড়ির তেল ফুরিয়ে গেলো। যাত্রীরা হয়ে পড়লো ভয়ার্ত এবং বিভ্রান্ত। বিপদের এইখানেই শেষ না। ওইদিন দুপরের পরে একটা বালি ঝড় এসে পড়লো তাদের উপর। তারা পুরোপুরি কানা হয়ে গেলো।

লাকি বলেন, ‘আমরা কিছু না করে শুধু দাঁড়িয়ে ছিলাম। কি করবো, কোথায় যাবো- কিছুই জানতাম না। ওই মুহূর্তে মরুভূমি থেকে বেরোনোর কোন পথ পাচ্ছিলাম না। অনেকে ওই জায়গাতেই মরে গেলেন। মৃতদের মধ্যে আমার বন্ধু গডফ্রেও ছিল। আর যারা বেঁচে ছিলেন তারা শুধু কাঁদছিলেন।’

পরিস্থিতি এমন যে, মৃতদের জন্য শোক করবো, না কি নিজের প্রাণ বাঁচাবো। সবার মনে তখন একটাই ভয়, এর পরে কে মরবে? এরকম অবস্থায় একজন মানুষের করার কি থাকে? যেদিকে তাকানো যায়- শুধু বালি আর বালি। কেউ মারা গেলে হাত দিয়ে সেই বালি খুঁড়ে কবর দিয়েছি তাকে। তারপরেই আবার বিরতিহীন উদ্ভ্রান্তের হেঁটেছি।

উত্তর নাইজেরিয়া এবং প্রতিবেশী দেশ মালির জন্য সাহারা মরুভূমি হচ্ছে মাদক-অস্ত্র-মানুষ পাচারকারী, অপহরণকারী এবং ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্য।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক দিন ধরেই নাইজেরিয়া এবং অন্য দেশগুলোকে পাচার কমানোর জন্য চাপের মুখে রেখেছে। ২০১৪ সালে ইইউ নাইজেরিয়ায় একটি অভিযান চালু করে। অভিযানে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি করা হয়েছে ইউরোপের দিকে অবৈধ অভিবাসী ঠেকানোর জন্য। ২০১৫ সালে নাইজেরিয়া একটি আইন প্রণয়ন করে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। আইনের লঙ্ঘন করলে জেল দেয়া হবে ৩০ বছর পর্যন্ত।

কিন্তু অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশান ইন্সটিটিউটের কর্মী ব্রাচেট বলেন, এতে করে ফল হয়েছে উল্টোটা। কারণ বেশিরভাগ কার্যক্রমই এখন হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ডে। ধরার উপায় নেই। তিনি বলেন, ‘আগে যখন এই আইন ছিল না তখন, মরুভূমিতে কাউকে ফেলে চলে আসা অসম্ভব না হলেও কঠিন ছিল। পাচারকারীরা এটা সহজে করতো না। যেহেতু এখন এটা গোপনীয়, সেহেতু কেউ জানেনা ঠিক কতজন ফেলে আসা হচ্ছে মরুভূমিতে। কারণ প্রকাশ করলে পাচারকারীদের বিপদ।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন কর্মকর্তা বলেন, মানব পাচারকারী এবং অন্য যারা দুর্বলতার সুযোগে অভিবাসীদের মরুভূমিতে ফেলে আসছে, তাদের ঠেকানোই এখন প্রধান সমস্যা। আমরা চাইলেও মরুভূমিতে পাহারা দিতে পারি না। বড়জোর যেটা করতে পারি সেটা হচ্ছে, স্থানীয় মানুষদের প্রশিক্ষণ এবং উপদেশ দিয়ে সাহায্য করতে।

উত্তর নাইজেরিয়াতে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) লোকজন রয়েছেন। বর্তমানে তারা এ ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তাদের প্রাথমিক হিসেব মতে, আগাদেজ শহর দিয়ে প্রতি সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ মানুষ পারাপার করে মুরুভুমির দিকে। এদের গন্তব্য ইউরোপ। কিন্তু আইওএমের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে মাত্র ৩৭ জন মানুষ মারা গেছে মরুভূমিতে।

লাকি ইজের গল্প বলে এই সংখ্যাটা মোটেও সত্যি নয়। নাম না জানা অসংখ্য মানুষের কবর হয়েছে সাহারার বুকে। তাদের খবর কেউ রাখেনি। ক্ষুধা-তৃষ্ণা এবং মরুভূমির প্রবল উত্তাপ মাথায় নিয়ে তারা শুধু যেতে চেয়েছিলেন মরুভূমির অন্য পারে। ভেবেছিলেন সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে পর্যাপ্ত খাবার আর পানি। অপেক্ষা করে আছে ভালো একটি জীবন। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা ভুলে গিয়েছিলেন সাহারা মরুভূমি পৃথিবীর দীর্ঘতম মরুভূমি। তাদের মনে হয়েছিল, এতো কিছুই না। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ আরও কত কি করে।






মন্তব্য চালু নেই