মেইন ম্যেনু

মহাসড়কে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইল মা ও শিশু হাসপাতাল সংলগ্ন ফুট ওভারব্রিজ। রোববার বিকাল ৩টা। ঢাকা মেট্রো ন ১৮-৪৩৯৪ নম্বর মিনি ট্রাকটি থামালেন ট্রাফিক কনস্টেবল মাজহার। চালক বাবুকে টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামান এসআই আবদুল জলিল ও মাজহার। ছোঁ মেরে পকেট থেকে নিয়ে নেন ড্রাইভিং লাইসেন্স। চালক দেরি না করে আবদুল জলিলের পায়ে পড়েন। আকুতি জানান লাইসেন্স ফেরত দেয়ার। কিন্তু দুই পুলিশ নাছোড়বান্দা। লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে আবদুল জলিল বসেন ওভারব্রিজের নিচে রাখা মোটরসাইকেলের ওপর। মাজহার চলে গেছেন অন্য গাড়ি আটকাতে। বাবু ও তার হেলপারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় চলে দফারফার চেষ্টা। অনেক হাতে-পায়ে ধরে ৫০০ টাকা দিয়ে ছাড়া পান বাবু। এভাবে ট্রাক, মিনি ট্রাক, রিকশা ভ্যান, সিএনজি অটোরিকশায় চাঁদাবাজি করতে দেখা গেছে এসআই আবদুল জলিল ও কনস্টেবল মাজহারকে।

শুধু এ স্থানই নয়, সারা দেশেই চলছে এ দৌরাত্ম্য। মহাসড়কে বিভিন্ন রুটে যাতায়াতকারী বাস-ট্রাকের মালিক ও শ্রমিকরা জানান, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনার পরও সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ হচ্ছে না। চাঁদাবাজি বন্ধে রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বসানো হয়েছে সিসিটিভি। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। কিন্তু সব এড়িয়ে অসাধু পুলিশ ও স্থানীয় মাস্তানরা চাঁদাবাজি করছেই। তারা শুধু টাকা আদায়ের কৌশল পরিবর্তন করেছে। আগে যেখানে সেখানে রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে চাঁদা নিত। এখন সেটা কিছু কমেছে। তবে বেড়েছে মাসোয়ারা আদায়। ঈদ সামনে রেখে তা বাড়বে আরও। মৌসুমি চাঁদাবাজদের প্রধান টার্গেট এখন পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও যাত্রীবাহী বাস। মালিক ও চালকরা আরও জানান, এবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের তুলনায় ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-আরিচা, ঢাকা-বেনাপোল ও ঢাকা-রাজশাহী-সোনামসজিদ রুটে চাঁদাবাজির হার বেশি।

ঢাকা মহানগর পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দোলন কান্তি বড়ুয়া জানান, সড়ক-মহাসড়কে পুলিশ ও রাজনৈতিক দল আশ্রিত মাস্তানদের বেপরোয়া চাঁদাবাজির কারণে পরিবহন ব্যবসা করাটাই দায় হয়ে পড়েছে। রাজধানীর প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ী, কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, সাইনবোর্ড, বাবুবাজার ব্রিজ, কেরানীগঞ্জের কদমতলী, মিরপুর বেড়িবাঁধ, পর্বতা সিনেমা হল এলাকা, আশুলিয়ার ধউর ব্রিজ, পোস্তগোলা ব্রিজ, সদরঘাট, গাবতলী, আমিন বাজার, আবদুল্লাপুর ব্রিজ এলাকায় চেকপোস্ট ও তল্লাশির নামে চলে বেপরোয়া চাঁদাবাজি।

দোলন কান্তি আরও বলেন, দেশের ৬৪ জেলা ও বিভাগীয় শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরে পণ্য পাঠান তারা। অধিকাংশ সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজির কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতি এবং ঢাকা মহানগর পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতির চাঁদাবাজির বন্ধের দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেন। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার সেটা তুলে নেন।

বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি হাজী নূরুল বাহার জানান, রাস্তায় হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজির পরিমাণ অনেকটা কমেছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাস্তানদের চাঁদাবাজির পরিমাণ বেড়েছে। বড় মহাসড়কের তুলনায় আঞ্চলিক সড়ক, মহাসড়কগুলোতে এ চাঁদাবাজির পরিমাণ বেশি। ঢাকা থেকে একটি গাড়ি চট্টগ্রাম গেলে প্রায় আড়াইশ’ টাকা চাঁদা দিতে হয়।

তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডে দেশের বিভিন্ন রুট থেকে আসা ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, এখন সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি হয় পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া পদ্মার উভয় পাড়ে এবং মাওয়া-কাওড়াকান্দিতে পদ্মার উভয় পারে। পাটুরিয়ায় ফেরি পারাপারের গাড়িপ্রতি ৯৫০ টাকা নির্ধারিত টোলের স্থলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সেখানে আদায় করা হয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। মাওয়া ঘাটেও একই অবস্থা। মাওয়া ও কাওড়াকান্দিতে ফেরির নির্ধারিত ফির চেয়ে তিনগুণ বেশি টাকা দিতে হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসার্ট থেকে আম নিয়ে কারওয়ান বাজারে আসা ট্রাকচালক আমিনুল বিশ্বাস জানান, আশুলিয়ার ধউর, বাইপাইল, মাওনা, মির্জাপুর, এলেঙ্গা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহীসহ ১০ পয়েন্টে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়েছে। সব মিলিয়ে চাঁদাবাবদ তাকে ৮০০ টাকা গুনতে হয়েছে। এছাড়া সিরাজগঞ্জে বঙ্গবন্ধু সেতুতে ওঠার আগে ট্রাকের ওজন দেয়ার জন্য ৩০০ টাকা দিতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্রাকচালক সমিতির সভাপতি হুমায়ুন কবির জানান, প্রতি ট্রিপে চাঁদাবাবদ ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ৬০০ থেকে ৬৫০, ঢাকা-রাজশাহী-সোনামসজিদ রুটে ৬০০ থেকে ৭০০, ঢাকা-বেনাপোল রুটে ৫০০ থেকে ৬০০, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আড়াইশ’ থেকে ৩০০ টাকা এবং ঢাকা সিলেট রুটে প্রায় ৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। স্থানীয় মাস্তানরা বিভিন্ন সমিতি, যানজট ক্লিয়ার করাসহ বিভিন্ন অজুহাতে এসব চাঁদা আদায় করে। রাস্তায় গাড়ি চালাতে হলে হামলা-মারধরের ভয়ে ট্রাকচালকরা এসব টাকা দিতে বাধ্য হন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে ঢাকা-সিলেট রুটের মিতালী পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব ১৪-৭৬৬৬ বাসের চালকের সহকারী জানান, প্রতি ট্রিপে ১৬০০ টাকা জিপি (চাঁদা) দিতে হয়। এর মধ্যে সিলেটের শায়েস্তাগঞ্জে ৪০, হবিগঞ্জে ৪০, ভৈরবে ৭০ টাকা, গাউসিয়ায় ২০ টাকা করে দিতে হয়। বাদবাকি টাকা দিতে হয় সায়েদাবাদ টার্মিনাল ও সিলেট টার্মিনালে।

কাঁচপুরের শিমরাইল মোড়ে পাথর বোঝাই ঢাকা মেট্রো ট ১৮-৫৬৪৭ নম্বর ট্রাকের চালক মহসিন জানান, কাঁচপুর থেকে ঢাকা শহরের ভেতর পাথর নিয়ে গেলে ৪ থেকে ৫ বার আটকানো হয়। প্রতিবার ২০০ টাকা করে দিতে হয়। কোনো সময় টাকা নেয়ার পরও পুলিশ মামলা করে। ঢাকা-চাঁদপুর রুটের পদ্মা এক্সপ্রেস গাড়ির চালক রফিকুল ইসলাম জানান, যাত্রাবাড়ী, সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল, কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডসহ ৮ পয়েন্টে প্রতি ট্রিপে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ঈদের আগে এ চাঁদার পরিমাণ আরও অনেক বাড়বে।
সায়েদাবাদে ঢাকা-লক্ষ্মীপুর রুটের যাত্রীসেবা পরিবহনের বাস চালকের সহকারী নয়ন মিয়া জানান, বড় বাসগুলোর তুলনায় লোকাল বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকই চাঁদাবাজদের প্রধান টার্গেট। কারণে-অকারণে ছোট বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদা নেয়া হয়।

ঢাকা-কুমিল্লা রুটের কর্ডোভা পরিবহনের বাসচালক রফিকুল ইসলাম জানান, মেঘনা ব্রিজ, কাঁচপুর, চিটাগাং রোড (শিমরাইল) শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে। তাই পুলিশ রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাকা নেয় না। গাড়িতে উঠে কাগজ নিয়ে নেয়। পরে হেলপারকে পাঠিয়ে টাকা দিয়ে কাগজ নিয়ে আসতে হয়।

সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাইওয়ে রেঞ্জের ডিআইজি মল্লিক ফখরুল ইসলাম বলেন, হাইওয়ে পুলিশ ও থানা পুলিশসহ প্রতিটি ইউনিটকে বলে দেয়া হয়েছে আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। কারও বিরুদ্ধে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্তসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও জানান, হাইওয়ে পুলিশের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ পাওয়ায় এরই মধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এছাড়াও চাঁদাবাজি মনিটরিংয়ে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসিটিভির মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারিও চলছে। খোদ আইজিপি এসব বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন।






মন্তব্য চালু নেই