মেইন ম্যেনু

মহাসড়ক নির্মাণ সবচেয়ে ব্যয়বহুল হচ্ছে বাংলাদেশে

ইউরোপে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ২৮ কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ব্যয় ১০ কোটি টাকা। আর চীনে তা গড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশের তিনটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় ধরা হচ্ছে কিলোমিটারপ্রতি গড়ে ৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেন নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫ কোটি টাকা। ফলে মহাসড়ক নির্মাণ সবচেয়ে ব্যয়বহুল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশে।

যদিও প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর প্রত্যেকটিই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে জেনেভায় ইউএন-ইসিই (ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপ) আয়োজিত এক সেমিনারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মহাসড়ক নির্মাণের তুলনামূলক ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন গ্রিসের ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব এথেন্সের অধ্যাপক দিমিত্রিয়স স্যামবুলাস। ‘এস্টিমেটিং অ্যান্ড বেঞ্চমার্কিং ট্রান্সপোর্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার কস্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি বলেন, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে খরচ হয় গড়ে ৩৫ লাখ ডলার বা ২৮ কোটি টাকা। আর দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ২৫ লাখ ডলার বা ২০ কোটি টাকা।

চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ ব্যয়-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ২২ লাখ ডলার বা ১৭ কোটি টাকা। আর দুই লেনের মহাসড়ককে চার লেন করতে এ ব্যয়ের পরিমাণ সাড়ে ১৪ লাখ ডলার বা বাংলাদেশী মুদ্রায় ১১ কোটি টাকা। ৪০টি দেশের নির্মাণ ব্যয়ের ভিত্তিতে ইকোনমেট্রিক মডেল প্রয়োগ করে গড় ব্যয় নির্ণয় করা হয়। ‘দ্য কস্ট অব রোড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইন লো অ্যান্ড মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রণয়ন করেন অক্সফোর্ড, কলাম্বিয়া ও গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ৮-৯ কোটি রুপি; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা। জমি অধিগ্রহণ ব্যয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। আর জমি অধিগ্রহণ করা না হলে ব্যয় অর্ধেকে নেমে যাবে। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি ৫ কোটি রুপি বা ৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। দেশটির ১২তম (২০১২-১৭) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে।

www.bonikbarta.com

চীনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশটিতে চার লেনের নতুন মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় গড়ে ১৬-১৭ লাখ ডলার; বাংলাদেশের মুদ্রায় যা সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কোটি টাকা। তবে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেন করতে কিলোমিটারপ্রতি পড়বে ১০ কোটি টাকার কম। দেশটির ১২তম (২০১০-১৫) পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ তথ্য উল্লেখ আছে।

এদিকে দেশের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের তিন প্রকল্পের মধ্যে রংপুর-হাটিকুমরুল অংশ আগামী বছর শুরুর কথা রয়েছে। এ মহাসড়কের ১৫৭ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। আর ঢাকা-সিলেট ২২৬ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৬৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ৫৬ কোটি ৪ লাখ টাকা। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি শুরু করার কথা। দুটি প্রকল্পই বাস্তবায়ন হবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে।

আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন প্রকল্পের কাজ। গত রোববার প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করতে সড়ক পরিবহন বিভাগে বৈঠক হয়। দুটি প্যাকেজে ঢাকার বাবুবাজার লিংক রোড থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও মাদারীপুরের পাচ্চর থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত চার লেন করা হবে। ৫৩ কিলোমিটার চার লেন করতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে প্রায় ৯৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে।

যদিও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণে ব্যয় অন্যগুলোর তুলনায় কম হচ্ছে। এ মহাসড়কের ১৯২ দশমিক ৩ কিলোমিটার চার লেনে উন্নীত করায় ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। আর ৮৭ দশমিক ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৮১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। বাস্তবায়ন বিলম্বে উভয় প্রকল্পে একাধিকবার ব্যয় বাড়ানোও হয়েছে।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এমএএন ছিদ্দিক বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হবে। রেল ক্রসিং ও ইন্টারসেকশনে (মোড়) ওভারপাস, ইউ-লুপ ও ফ্লাইওভার থাকবে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের সড়কে কোনো বাধা ছাড়াই যানবাহন চলাচল করবে। বেশকিছু সেতু ও কালভার্টও রয়েছে প্রকল্পগুলোর আওতায়। এছাড়া জমি অধিগ্রহণেও ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য খরচ কিছুটা বেশি হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানের কারণে সড়কের নির্মাণ ব্যয় বেশি হবে— এ যুক্তির সঙ্গে একমত নন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ২০০৫ সালে নির্মাণ করা বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কটি বাংলাদেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক মানের সড়ক। ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেনও রয়েছে এতে। এটি নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। গত ১০ বছরে এ ব্যয় বাড়লেও ১০ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে ফ্লাইওভার বা ওভারপাস ও সেতুর কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়তে পারে।

জানা গেছে, নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোয় খুব বেশি জমিরও প্রয়োজন হবে না। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেন নির্মাণ করতে প্রকল্পটির আওতায় মাত্র ২৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন পড়বে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে মাত্র ৯৭ কোটি টাকা। আর ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পে ৩৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ব্যয় হয় ১০৯ কোটি টাকা। এছাড়া রড, সিমেন্টসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রীর দাম পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমানে সর্বনিম্ন। আর বাংলাদেশের নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরিও ভারত বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চেয়ে অনেক কম।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি কিলোমিটার মহাসড়ক নির্মাণে গড়ে ব্যয় হয় ৫-৬ কোটি টাকা। ফলে দুই লেনের মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ১০-১২ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার কথা। তবে প্রকল্পের মধ্যে সেতু, ফ্লাইওভার বা ওভারপাস থাকলে ব্যয় কিছুটা বেশি হবে। সেক্ষেত্রেও চার লেনে উন্নীত করতে কিলোমিটারপ্রতি ২০-২২ কোটি টাকার মধ্যেই থাকবে ব্যয়।

উল্লিখিত তিন প্রকল্পের তুলনায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক (জয়দেবপুর-এলেঙ্গা-টাঙ্গাইল) চার লেন নির্মাণেও ব্যয় অনেক কম। এক্ষেত্রে ৭০ কিলোমিটারে ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গত মাসে ঠিকাদার নিয়োগ চুক্তি সই হয়।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশটি নির্মাণ করা হয় ২০০৫ সালে। হাওরের ভেতর দিয়ে হওয়ায় সেখানে নয় মিটার পুরু মাটির স্তর তৈরি করতে হয়। এতে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হয়েছিল ৫ কোটি টাকা। সেটাই ছিল বাংলাদেশে মহাসড়ক নির্মাণে সর্বোচ্চ ব্যয়ের উদাহরণ।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে মহাসড়ক নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৫-৬ কোটি টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। নতুন চার লেন প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন মোড়ে ফ্লাইওভার, ওভারপাস বা ইউ-লুপ নির্মাণ করা হবে। এতে ব্যয় কিছুটা বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় ৯৫ কোটি টাকা অনেক বেশি মনে হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা দেখলে কারণটা বোঝা যাবে।






মন্তব্য চালু নেই