মেইন ম্যেনু

মাত্র আটজনকেই স্বজন বলে মানেন তসলিমা

স্বজনতো অনেকই থাকে, কিন্তু প্রতিটি মানুষ তার নিজের উপলব্ধি থেকে স্বজন বলে মানেন, তেমন স্বজন আর কজন? ঠিক তেমনই মাত্র আটজনকেই স্বজন বলে মানেন তসলিমা নাসরিন। সুখ-দুঃখের অষ্টপ্রহরে যারা তার স্বজন। এই নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার পুজোর অঞ্জলিতে লিখেছেন তসলিমা নাসরিন।

তিনি লেখেন- পশ্চিমবঙ্গের এবং বাংলাদেশের যে ক’জন মানুষ আমাকে তাঁদের অফুরন্ত শ্রদ্ধা, ভালবাসা, স্নেহ এবং সমর্থন দিয়েছেন, আমার সুসময়ে শুধু নয়, আমার দুঃসময়েও পাশে ছিলেন, আছেন. তাঁরা অন্নদাশংকর রায়, শিবনারায়ণ রায়, অম্লান দত্ত, নিখিল সরকার, শামসুর রাহমান, শামীম সিকদার, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়।

তিনি লেখেন- ওঁরাই আমার আত্মীয়, আমার স্বজন, আমার বন্ধু, আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ। আজ ওঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। ওঁদের মতো মানুষ আরও জন্মাক। পৃথিবীটা সুন্দর হোক আরও।

অন্নদাশংকর রায় সম্পর্কে লেখেন-

খুব ভালবাসতেন। যখন বাংলাদেশে আক্রমণের শিকার হচ্ছি, তখন থেকেই অনেক বলেছেন, অনেক লিখেছেন। একবার তো ঘোষণা করলেন, আমি যেন সঙ্গে পিস্তল রাখি নিজের নিরাপত্তার জন্য। ইউরোপের নির্বাসন-জীবন থেকে যখনই কলকাতায় যেতাম, চাইতেন সবার আগে যেন তাঁর বাড়িতে যাই। দুপুরের খাবার নিয়ে বসে থাকতেন, একসঙ্গে খাবেন। কত কথা যে বলতেন, কত কথা যে শুনতে চাইতেন! শুনতে চাইতেন বেশি।

একবার আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। সেটা পুরো রেকর্ড করে নিয়ে এক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছাপিয়েছিলেন। সাক্ষাৎকারটা নিয়ে ভীষণ উত্তেজিত ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি তখন বাড়ির বাইরে কোথাও যান না। কোলে করে এনে চেয়ারে বসাতে হয়, কোলে করে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিতে হয়। অথচ আশ্চর্য, ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের অডিটোরিয়ামে ‘আমার মেয়েবেলা’-র প্রকাশনা উৎসবে দিব্যি সভাপতিত্ব করতে চলে এলেন। ওখানেই তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত ভাষণটি দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশ তসলিমার মা, পশ্চিমবঙ্গ তসলিমার মাসি। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি হয় না, কিন্তু তসলিমার বেলায় মনে হচ্ছে মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি…।’

আমি তাঁর এই স্নেহ-ভালবাসার মর্যাদা ঠিক ঠিক দিতে পারিনি। বিদেশ থেকে কলকাতায় এলে কত কত উপহার নিয়ে আসতাম। প্রতিবার ভুলে যেতাম অন্নদাশংকর রায়ের কথা। কলকাতায় এসেছি শুনলেই তিনি কিন্তু খবর পাঠাতেন, একবার যেন দেখা করতে যাই। অপেক্ষা করতেন আমার জন্য। আমি এ দিকে ব্যস্ত হয়ে পড়তাম তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়। একবার খুব অল্প সময়ের জন্য ওঁর বাড়ি গেলাম, কথা দিলাম দু’দিন পর আবার যাব।

দু’দিন পর। যথারীতি ভুলে গেলাম যেতে। তার পরদিন গিয়ে দেখি তিনি অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন বিছানায়। আমি যে এসেছি দেখতে পেলেন না। অথচ আসব বলে আগের দিন সারাক্ষণ ভাল কাপড়চোপড় পরে ড্রইং রুমের চেয়ারে বসে ছিলেন। নার্স অনেকবার বিছানায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন, রাজি হননি। বলেছেন, ‘আজ তসলিমা আসবে।’ নার্স বলেছিলেন, ‘রাত হয়ে গেছে, আর হয়তো আসবে না।’ তার পরও নড়েননি চেয়ার থেকে। বলেছেন, ‘না না ও আসবেই। কথা যখন দিয়েছে আসবেই।’ ওই অচেতন অবস্থা থেকে আর ফেরেননি অন্নদাশংকর রায়। খবর পাই, মারা গিয়েছেন। নিজেকে সেই থেকে আর ক্ষমা করতে পারিনি।

শিবনারায়ণ রায় সম্পর্কে লেখেন-

ওঁর সঙ্গে আমার পরিচয় বিরানব্বই সালে। সেই বিরানব্বই-এর পর থেকে আমার জীবনে কত ফতোয়া, কত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, কত নির্বাসন, কত নির্যাতন এল, তিনি কখনও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। যেখানেই ছিলাম, দেশে বা বিদেশে, তাঁর চিঠি পেতাম। প্রেরণার চিঠি! সব সময় বলতেন, যেন লিখি, যেন হেরে না যাই। বলতেন, পৃথিবীর অনেক লেখককে নির্বাসনে কাটাতে হয়েছে। কারাগারে বসেও তাঁরা উদ্যম হারাননি। লেখার জন্য খাতা কলম থাকত না, মনে মনে লিখতেন। শিবনারায়ণ রায় মনে করতেন, সমাজে আমার একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে। আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছি। যে কাজ করার সাহস এবং সততা সবার থাকে না।

তিরানব্বই সালে আমার ঢাকার বাড়িতে ছিলেন ক’দিন। প্যারিসেও আমাকে দেখতে গিয়েছিলেন। দু’হাজার সালে। তাঁর দুটি ফুসফুসের একটি নষ্ট ছিল বহু দিন। কিন্তু নিজের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে অভিযোগ করতে কখনও শুনিনি। উনি নাস্তিক ছিলেন জীবনভর। মরণোত্তর দেহদান করে গেছেন। অনেক কপট নাস্তিককে দেখেছি গোপনে গোপনে ধর্মের আচার অনুষ্ঠান সারতে। শিবনারায়ণ রায়ের মধ্যে কোনও কপটতা ছিল না।

আমার কলকাতার বাড়িতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করেছেন একটিও অর্থহীন কথা না বলে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান, মানববাদ, মানবতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করতেন। চাইতেন, মানুষ চিন্তা করুক। বিশ্বাস করতেন মুক্তচিন্তায়। চিন্তার চর্চা যে বাংলাদেশে হচ্ছে না, তা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতেন। লক্ষ করেছি, বাংলাদেশ বলতে তিনি দুই বাংলাকে বোঝাতেন। তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর প্রতিভা, তাঁর প্রত্যয়, তাঁর পান্ডিত্য আমাকে চিরকালই মুগ্ধ করেছে।

কলকাতা থেকে আমাকে বিতাড়নের পর শিবনারায়ণ রায়কে দেখেছি বড় বিপন্ন বোধ করতে। পত্রিকায় প্রতিবাদ-পত্র লিখেছেন। সভায় ভাষণ দিয়েছেন। জানতেন এতে কোনও কাজ হয় না, তবু। বড় করুণ কণ্ঠে, বড় অসহায় স্বরে বারবার বলেছেন, ‘ওদের আমি চিঠি লিখতে পারি, কিন্তু আমার কথা তো ওরা শুনবে না!’

র‌্যাডিকাল হিউম্যানিস্ট শিবনারায়ণ রায়ের যুক্তিবাদ এবং মানবতন্ত্রের সঙ্গে আমার মতের এক ফোঁটাও বিরোধ ছিল না। কিন্তু একটা সময়ে মতবিরোধ দেখা দিল যখন তিনি পতিতাপ্রথার পক্ষে আন্দোলনে শরিক হলেন। আমি যেহেতু বরাবরই চেয়েছি পুরুষতান্ত্রিকতার সবচেয়ে বীভৎস প্রথাটি নির্মূল হোক, পতিতাপ্রথার পক্ষে তাঁর কোনও যুক্তিই আমি মেনে নিইনি।এই মতবিরোধ সত্ত্বেও আমাদের সম্পর্ক একটি দিনের জন্যও এতটুকু নষ্ট হয়নি। আমার আশঙ্কা, শিবনারায়ণ রায় না হয়ে অন্য কেউ হলে সম্পর্কে হয়তো সামান্য হলেও চিড় ধরত।

যত দিন বেঁচে ছিলেন, নিজের নীতি আর আদর্শ নিয়ে মাথা উঁচু করেই ছিলেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যারা রা-শব্দ করে না, গা বাঁচিয়ে চলে, তারা আজ প্রখ্যাত। আর শিবনারায়ণ রায় রয়েছেন পেছনে অন্ধকারে। কলকাতার বাড়িটাও তাঁকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। শান্তিনিকেতন থেকে ট্রেনে চড়ে কলকাতায় এসে ছোটখাটো আলোচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন।

ওঁর সঙ্গে শেষ কথা মৃত্যুর তিন দিন আগে। বললেন, হাওড়া স্টেশনের ভিড়ে তাঁর কিছুটা অসুবিধে হয় হাঁটতে। বললাম, কেউ যাতে সঙ্গে থাকে এমন ব্যবস্থা কি করা যায় না? না, শিবনারায়ণ রায় কারও সাহায্য নিয়ে বা কারও কাঁধে ভর দিয়ে চলতে রাজি নন। অনেক দিন আগে কেউ একজন তাঁকে একটা লাঠি উপহার দিয়েছিল হাঁটার জন্য, ওটিও কোনও দিন ব্যবহার করেননি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের পায়েই হেঁটেছেন।

অম্লান দত্ত সম্পর্কে লেখেন-

আমি তখন ঢাকায় থাকি। আমার কোনও একটি বই পড়ার পর আমার ঢাকার ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন অম্লান দত্ত। চিঠিতেই অনেক দিন যোগাযোগ ছিল।তারপর একদিন ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে প্রথম তাঁর বক্তৃতা শুনে ভীষণ মুগ্ধ হই। অনুষ্ঠানের কোনও বক্তাই অম্লান দত্তের মতো অত অল্প কথায়, অত স্পষ্ট ভাষায় খাঁটি কথাটা অত চমৎকার বলতে পারেননি। সেদিন ছুটে গিয়েছি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। জীবন ও জগতের অনেক কিছু নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মৃদুভাষী ছিলেন। সবার মত-ভিন্নমত শুনতেন। তারপর শেষ মন্তব্যটি করতেন, যেটির পর কারও কোনও কথা বলার দরকার হত না।

যখন নির্বাসন জীবন কাটাচ্ছি, বার্লিনে আমার বাড়িতে কিছু দিন ছিলেন। তখন আরও কাছ থেকে জানার সৌভাগ্য হয়। তাঁর নীতি এবং আদর্শের সামনে, নির্লোভ নির্মোহ জীবনের সামনে, তাঁর সততা এবং সারল্যের সামনে শ্রদ্ধায় বারবার মাথা নত করেছি। ওঁর যে গুণ আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তা হল নিজে ঈশ্বরবিশ্বাসী হয়েও আমার মতো নাস্তিকের কথা বলার স্বাধীনতার পক্ষে তিনি শুধু মতই দেননি, আমাকে সমর্থন করে তিনি লিখেছেন, বলেছেন, সরব হয়েছেন সবখানে। সহিষ্ণুতার পক্ষে তিনি তাঁর মত প্রকাশ করে গেছেন সারা জীবন। পশ্চিমের নির্বাসন জীবন থেকে যখনই আমি কলকাতা আসার সুযোগ পেয়েছি, প্রতিবারই উনি আমার সঙ্গে দেখা করেছেন।

বিজ্ঞান, ধর্ম, সাহিত্য, শিল্প, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি— যে কোনও বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যেত। যে কোনও জটিল প্রশ্নের সহজ এবং সত্য উত্তর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যেত। আমাকে বলতেন, নির্বাসন জীবনে দেশ হারানোর বেদনায় যেন নুয়ে না থাকি; শুধু হা হুতাশ করে, চোখের জল ফেলে সময় নষ্ট না করে যেন আরও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি, আরও জ্ঞান যেন আহরণ করি। আমার সাফল্য তাঁকে আনন্দ দিত, আমার বেদনায় মুষড়ে পড়তেন।

কলকাতায় তাঁর বাড়িতে গিয়েছি অনেক বার। বয়স হয়েছে, একা থাকেন, তাই তাঁকে সাংসারিক কিছু সাহায্য করতে চেয়েছি। তিনি কারও কোনও সাহায্য নেননি। কারও দেওয়া কোনও উপহারও নেননি। জীবনের যে সব জিনিসকে এ যুগে আমরা অতীব প্রয়োজনীয় বলে মনে করি, সে সব ছাড়াই অম্লান দত্ত বেঁচে থাকতেন। তাঁর কোনও অভাববোধ ছিল না।

মানববাদের ওপর একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দু’জন দিল্লিতে গিয়েছিলাম। গাঁধী আশ্রমের অতিথিশালায় ছিলাম। হাড় কাঁপানো শীতে আমি কাবু হয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি আমার দেখভাল করছিলেন। মাঝে মাঝে শিশুর মতো রাগ করতেন। কিন্তু রাগ পড়ে গেলে আবার শিশুর মতোই অমলিন হাসতেন। কলকাতায় আমার সাত নম্বর রাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে প্রায়ই আসতেন। যে দিনই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, এসেছেন। একদিন শুধু নিজেই ছুটে এসেছিলেন আমার আমন্ত্রণ ছাড়াই। হায়দারাবাদে আমার ওপর আক্রমণ হওয়ার পর দিন। উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ তখন তাঁর মুখে স্থির হয়ে বসে।

কলকাতা থেকে আমাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর যখনই আমার ওপর কোনও প্রতিবাদ সভার অনুষ্ঠান হয়েছে, অম্লান দত্ত গিয়েছেন। বাক্ স্বাধীনতার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন, কখনও ক্লান্ত মনে হয়নি এসবে। বরং যত অসুস্থতাই থাকুক, আদর্শের জন্য তিনি সব ভুলে উঠে দাঁড়িয়েছেন। ওই একই সময়ে এই কলকাতা শহরেই, অনেক লেখক, কবি, শিল্পী, আমার বিপদ দেখে আলগোছে কেটে পড়েছেন!

নিখিল সরকার সম্পর্কে লেখেন-

এক সময় নিখিল সরকার হয়ে উঠেছিলেন একই সঙ্গে আমার মা বাবা ভাইবোন, আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুবান্ধব। হোঁচট খেলে তুলে ধরছেন। হাঁটতে সাহায্য করছেন। নির্বাসন অসহ্য লাগলে বলেছেন, আমি একা নই, আরও অনেক লেখক নির্বাসন জীবন যাপন করেছেন। আমি যেন হতাশ না হয়ে দু’চোখ খুলে জগৎটা দেখি, যেন লেখাপড়ায় মন দিই। চিঠি লিখছেন যেখানেই ডেরা বাঁধি সেখানেই। আমিও নানান দেশ থেকে ফোন করেছি নিখিল সরকারকে।

আমাকে বই পাঠাতে বলতেন। ভারতে পাওয়া যায় না, এমন সব দুষ্প্রাপ্য বই। বইগুলো বিদেশের বিভিন্ন বইয়ের দোকান থেকে কিনে পাঠাতাম নিখিল’দাকে। ভাবতাম, এসব বই ক’জন লোক পড়ে আজকাল! এত জ্ঞানের বই! সত্যি বলতে কী, জগতের এত বিষয়ে এত জ্ঞান খুব বেশি মানুষের আমি দেখিনি। কত কিছু যে শিখেছি তাঁর কাছে!

নিখিল সরকার যে বছর চলে গেলেন, সে বছরই আমি কলকাতায় বাস করতে শুরু করেছি। শহরটায় অনেকগুলো বছর কাটিয়েছি। শূন্য শহরটায়। খাঁ খাঁ করা শহরটায়। এই শহর থেকেও আমাকে তিন বছর পর তাড়িয়ে দেওয়া হল, ঠিক বাংলাদেশের মতো। নিখিল সরকার বেঁচে থাকলে প্রতিবাদ করতেন এই অন্যায়ের। নিখিল সরকার চলে যাওয়ার পর শিবনারায়ণ রায় চলে গেলেন। অম্লান দত্তও গেলেন। আমার জগৎ এখন বড় ফাঁকা। কলকাতা নিশ্চয়ই খুব ফাঁকা এখন। মানুষ আছে, মনীষী নেই।

কলকাতায় হয়তো আমাকে এ জীবনে কখনও ঢুকতে দেওয়া হবে না। তবে পৃথিবীর যেখানেই থাকি, নিখিল সরকার আমার মনে থেকে যাবেন, যত দিন বাঁচি তত দিন। আমি তো ঋণী তাঁর কাছে। আমার মা’র কাছে যেমন ঋণী, বাবার কাছেও ঋণী। ঠিক তেমন নিখিল সরকারের কাছেও। কিছু কিছু ঋণ আছে, যার কখনও শোধ হয় না, এও তাই।

শামসুর রাহমান সম্পর্কে লেখেন-

দেশে থাকাকালীন শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার খুব সখ্য ছিল। এই একটি মানুষই ছিলেন বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে যাঁকে আমার মনে হত সরল সহজ ভালমানুষ। হৃদয় দিয়ে লিখতেন। রেগে গেলে চিৎকার করতেন। দুঃখ পেলে কাঁদতেন। প্রচন্ড আবেগ ছিল। ২০০০ সালে যখন প্যারিসে দেখা হল, বিদায় নেওয়ার সময় জড়িয়ে ধরলেন। চলে আসতে আসতে পেছন ফিরে দেখেছিলাম, চোখ মুছছেন। দেশে ফিরে আমাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। ধিক্কার দিয়েছিলেন দেশের সরকার আর ধর্মীয় মৌলবাদীদের। তিনি হয়তো জানতেন ও দেখাই আমার সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা!

শামসুর রাহমান নেই। আর কেউ তাঁর মতো অত বড় বৃক্ষ হতে পারেনি। চারদিকে শুধু তৃণ!

প্রশান্ত রায় সম্পর্কে লেখেন-

প্রশান্ত রায় ইস্কুল কলেজের ক্রিম ছাত্র। সব ছেড়েছুড়ে একসময় নকশাল করতে মাঠে নেমেছিলেন। গ্রামের এক জোতদারকে প্রাণে মেরে ফেলার আদেশ পান, সে আদেশ তিনি মানতে পারেননি। জানিয়ে দিয়েছিলেন খুনের রাজনীতি তিনি করবেন না। কত নকশাল নেতা পচে গেছেন। প্রশান্ত রায় কিন্তু আগের মতোই আছেন। আজও গভীর বিশ্বাস তাঁর সমাজতন্ত্রে। আদর্শ থেকে এক চুল নড়েননি । মেরুদন্ড তেমনই দৃঢ়।

বাড়িতে এখনও কোনও রঙিন টেলিভিশন নেই। রেফ্রিজারেটর নেই। এসি, মাইক্রোওয়েভ নেই। ওয়াশিং মেশিন নেই। গাড়ি তো নেই-ই। তিনি বলেন, ভারতবর্ষের অধিকাংশ লোকের যা নেই, তা আমার থাকবে না।

আমার লেখা খুব পছন্দ করেন। আমার জীবন সংগ্রাম দেখে তিনি অভিভূত। তাই আমার সাত খন্ড আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন। আমরা পরস্পরকে মাঝে মাঝে কমরেড বলেও সম্বোধন করি।

শামীম শিকদার সম্পর্কে লেখেন-

শামীম শিকদারের দাদা সিরাজ শিকদার, সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। সর্বহারা পার্টি অনেকটা নকশাল পার্টির মতো নিষিদ্ধ ছিল। শেখ মুজিবের আমলে সিরাজ শিকদারকে মেরে ফেলা হয়। শামীম শিকদার অসাধারণ মহিলা। ছোটবেলায় সাইকেল চালাতেন। কোনও এক ছেলে তাঁর ওড়না টান মেরে নিয়ে গিয়েছিল। এর পর থেকে আর ওড়না পরেননি, সালোয়ার কামিজও না। প্যান্ট শার্ট পরতেন। কে কী বলল না বলল, তার কোনও দিন ধার ধারেননি।

সিগারেট খেতেন। তাও আড়ালে নয়। সবার সামনে। আমি যদি ডাকাবুকো মেয়ে হই, আমার চেয়ে শত গুণ বেশি ডাকাবুকো শামীম শিকদার। উনি কিন্তু আমার আগের জেনারেশনের মেয়ে, যখন সমাজ আরও রক্ষণশীল ছিল।

ঢাকার আর্ট কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ভাস্কর্য ডিপার্টমেন্টের মাস্টার হয়েছেন। কিছু পুরুষ-মাস্টার তাঁকে আর্ট কলেজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য আন্দোলন করেছিলেন একসময়। শামীম শিকদার মোটেও দমে যাননি। মাথা উঁচু করে ফাইট করেছেন। ফাইটার ছিলেন। প্রয়োজনে পকেটে পিস্তল নিয়ে চলতেন। ওই পুরুষ-মাস্টারদের কিন্তু নাম-যশ হয়নি। হয়েছে শামীম শিকদারের। ঢাকা শহরে তাঁর বিশাল বিশাল ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ইত্যাদি।

কৈশোরে শামীম শিকদারের জীবন পড়ে চমকিত হতাম। সেই শামীম শিকদার আমার বিরুদ্ধে মৌলবাদীদের ফতোয়া ঘোষণা হওয়ার পর ঢাকার রাস্তায় আমার পক্ষে ব্যানার নিয়ে হেঁটেছেন। তার চেয়ে বড় কথা, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। যখন আমার বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল, সেই সময়। সরকার আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল আর লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী আমাকে হত্যা করার জন্য সারা দেশে মিছিল মিটিং করেছিল। সেই দুঃসময়ে যখন বন্ধুরাই সরে গিয়েছিল, এগিয়ে এসেছিলেন তিনি। শুধু শুধু বসে বসে দুশ্চিন্তা করার বদলে আমাকে কাগজ কলম দিয়েছেন লেখার জন্য। ইজেল, ক্যানভাস আর রং তুলি দিয়েছিলেন ছবি আঁকার জন্য। অনেক রাত পর্যন্ত আমার সঙ্গে কথা বলতেন।

দু’মাস অনেকের বাড়িতে আমাকে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। সবাই একটা সময় বেঁধে দিয়েছিলেন, ক’দিন থাকতে পারব তার। শামীম শিকদার কিন্তু তেমন কোনও সময় বেঁধে দেননি। কাউকে কোনও দিন ভয় পাননি তিনি। পকেটে অস্ত্র নিয়ে কোর্টেও চলে যেতে চেয়েছিলেন যেদিন জামিনের জন্য আমার যাওয়ার কথা ছিল। এই এক জন মানুষ আমার জীবনে আমি দেখেছি, ‘পাছে লোকে কিছু বলে’-র ভয় যাঁর কোনও দিন ছিল না। মাথা উঁচু করে চিরকাল চলেছেন। আমাকেও চলতে শিখিয়েছেন।

চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে লেখেন-

নির্দেশক চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম ছবিটি আমার জীবনের কোনও এক সময়ের ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। চূর্ণী মূলত অভিনেত্রী। অসাধারণ অভিনয় করেন। এমন প্রতিভাময়ী ব্যক্তিত্ব আমার ওপর একটা ছবি বানিয়ে ফেললেন! যখন অন্য অনেকে ‘বানাচ্ছি বানাচ্ছি’ করেও কিছুই বানাতে পারলেন না! ‘ব্যাগ ফিল্মস’ নামের একটা কোম্পানি আমার ‘ফরাসি প্রেমিক’ উপন্যাসটির চলচ্চিত্র স্বত্ব কিনেছে প্রায় দশ বছর আগে। আর যোগাযোগ করেনি।

ভারতের বিখ্যাত মুভি কোম্পানি ইউটিভিও আমার আত্মজীবনীভিত্তিক ছবি করতে চেয়েছে। কেউ একজন চিত্রনাট্য লেখার কাজও শুরু করেছিল। পরে ওদেরও আর কোনও খবর নেই। মহেশ ভট্ট দু’হাজার সালে ঘোষণা করেছিলেন আমার জীবন নিয়ে ছবি বানাবেন। তিনিও তাঁর ওই ইচ্ছে থেকে কবেই আলগোছে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এখনও আমার কাছে পড়ে আছে নিমন্ত্রণ আর ফেরার চলচ্চিত্র সত্ত্ব বিক্রির টাকা। সৌরভ দে, প্রেমাংশু রায়রা চিত্রনাট্য লিখে কাস্টিংও ঠিক করে ফেলেছিলেন। সৌরভ তো বোম্বে থেকে নিয়ে এসেছিলেন নায়ক, নায়িকাকে। মহড়াও শুরু করেছিলেন। রুনা লায়লাকে দিয়ে গান পর্যন্ত রেকর্ড করিয়ে নিয়েছিলেন প্রেমাংশু। শেষ পর্যন্ত প্রযোজক ছবি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর কারণ ‘তসলিমা’।

আমার নামটাকে নিয়ে ভীষণ ভয় সবার। শুনেছি কিছু বদ লোক আমার নামগন্ধ আছে এমন কিছু নিয়ে ছবি করা, সাফ বলে দিয়েছে, আর যেখানেই সম্ভব হোক, বাংলায় হবে না। যুদ্ধটা, সবাই ধরেই নিয়েছে যে, আমার আর মুসলিম মৌলবাদীদের মধ্যে। সবাই খুব হিসেব করেই মুসলিম মৌলবাদীর পক্ষ নিচ্ছে।

কলকাতা থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হল। হেনস্থা করা হল বছরের পর বছর। সংবাদপত্রে আমার নিয়মিত কলাম ছাপানো বন্ধ করে দিল। ঋতুপর্ণ ঘোষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর সম্পাদিত ম্যাগাজিনে আমার লেখা নিয়মিত ছাপা হবে ঘোষণা করার পরও লেখা বন্ধ করে দিতে। এই সব দেখার পর কার সাহস হয় আমার গল্পের বিন্দুমাত্র কিছু নিয়ে ছবি করার! কারও হয়নি।

এমন যখন অবস্থা, তখন বাংলার প্রতিভাবান চলচ্চিত্র পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় চাইলেন কলকাতা থেকে আমাকে বের করে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে একটা কমেডি বানাতে। মুখ্য চরিত্রে থাকবে আমার বেড়াল। কৌশিক একদিন তাঁর লেখা স্ক্রিপ্টও আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। কৌশিককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কৌতুকের আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি বললে ভাল হত না? কৌশিকের বক্তব্য ছিল, কৌতুকের মাধ্যমে বললে বেঁধে ভাল। ওঁর কথায় চার্লি চ্যাপলিনের ছবিগুলো মনে ভাসল। প্রযোজক জুটে গেল।

কৌশিক একদিন কলকাতা থেকে দিল্লি চলে এলেন আমার কাছ থেকে ছবি করার লিখিত অনুমতি নিতে। ছিলেন দু’দিন। বেশ আড্ডা হল। কলকাতার পত্রপত্রিকায় কৌশিকের মুক্তি পেতে চলা ছবিটি নিয়ে বড় বড় খবর ছাপা হল। বেড়াল মিনুর ছবিখানাও ছাপা হতে লাগল খবরের সঙ্গে। কৌশিক জানালেন, বেড়ালের অডিশন চলছে। বেড়ালের মায়েরা ভিড় করছে বেড়াল নিয়ে। শ্যুটিং সামনের মাসেই শুরু হবে।

এর পর একদিন হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম কৌশিক তাঁর নতুন ছবি ‘শব্দ’র শ্যুটিং করছেন! কৌশিক আমায় বলেছিলেন তাঁর প্রযোজক ‘শব্দ’ আর আমার গল্পটি শুনে আমার গল্পটিই বেছে নিয়েছিলেন। বুঝিনি যে সেই বেছে নেওয়াটা ‘শেষ বেছে নেওয়া’ নয়। শেষ পর্যন্ত আমার গল্পটি ছুড়ে ফেলে ‘শব্দ’কেই নির্বাচন করলেন প্রযোজক। গন্ডগোলটা তাহলে আমাকে নিয়েই! আমি আর জানতে চাইনি কী ঘটেছে। মাসের পর মাস চলে গেল। কৌশিক এক ছবি করে আরেক ছবিতে হাত দিচ্ছেন, আমার গল্পটি ওদিকে কবরে, অন্ধকারে, একা। কৌশিকের সঙ্গে মাঝে মাঝে তাঁর অন্য ছবিটবি নিয়ে কথা হয়। আমার গল্পর কথা তুলি না। তুলে ওকে অপ্রস্তুত করি না। এমন সময় হঠাৎ একদিন অভিনেত্রী চূণী গঙ্গোপাধ্যায়, কৌশিকেরই স্ত্রী, আমাকে জানালেন গল্পটি নিয়ে কৌশিক নয়, উনি ছবি করবেন। চূর্ণী নতুন করে স্ক্রিপ্ট লিখছেন। প্রযোজক পেয়ে গিয়েছেন। চূর্ণী আমার সঙ্গে দেখা করতে এলেন দিল্লিতে। কয়েক দিন কাটালেন আমার আর আমার বেড়ালের সঙ্গে। কলকাতায় ফিরে গিয়ে শ্যুটিং শুরু করলেন। সব কিছুই যেন অপ্রত্যাশিত!

ছবিতে আমার জীবন সংগ্রাম, আমার ওপর রাজনৈতিক অত্যাচার, আমার লেখালেখি, আমার আদর্শ বিশ্বাস, খুব স্পষ্ট করে দেখানো হয়নি। যা দেখানো হয়েছে তা হল আমার সঙ্গে আমার বেড়ালের বিচ্ছেদ। যেন মায়ের সঙ্গে কন্যার বিচ্ছেদ। বেড়াল আমাকে চাইছে, আমি বেড়ালকে চাইছি। চূর্ণী এভাবেই প্রতিবাদ করেছেন আমাকে দেশ থেকে, রাজ্য থেকে বিতাড়িত করে যে অন্যায় করা হয়েছে, তার। এ ভাবেই উনি প্রকাশ করেছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে ওঁর ধারণা। অন্য ভাবে হলে, উচ্চকণ্ঠ হলে হয়তো ছবিটি ছাড়পত্রই পেত না। শেষমেশ ছবিটি জাতীয় স্তরে সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের পুরস্কারও পেয়েছে!

মুখ বুজে থাকা আপসকামী মানুষের ভিড়ে চূর্ণী অনেকটা দেবীর মতো। দেবীতে তো আমার বিশ্বাস নেই। তবে কি সুপার হিরোর মতো? সুপার হিরোতেও তো বিশ্বাস নেই। তাহলে কী? সত্যিকার মানুষের মতো! মনে হয় মহিয়সীর মতো।






মন্তব্য চালু নেই