মেইন ম্যেনু

মাস্টারমাইন্ড তামিম-জিয়া ছদ্মবেশে এখনো দেশেই!

মাস্টারমাইন্ড তামিম-জিয়া ছদ্মবেশে এখনো দেশেই!নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একাংশের নেতা তামিম আহমেদ চৌধুরী ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের নেতা (এবিটি) চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক ওরফে জিয়া এখনো দেশে আছেন! গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিসহ সম্প্রতি দেশজুড়ে সিরিজ জঙ্গি হামলার নেপথ্যের এই দুই খলনায়ক বা মাস্টারমাইন্ড ছদ্মবেশে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে ধারণা গোয়েন্দাদের। পাল্টা কৌশল নিয়ে তাদের গ্রেফতারে বিভিন্ন গোয়েন্দা সদস্যরা কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক পুলিশ ও র‌্যাব কর্মকর্তা।

ওই কর্মকর্তারা জানান, ধর্ম সম্পর্কে কম জ্ঞান থাকা ও হতাশাগ্রস্ত তরুণদের ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে তাদের বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখান জঙ্গি নেতা তামিম ও বহিষ্কৃত মেজর জিয়া। এভাবে মগজ ধোলাই বা মোটিভেশন করে মেধাবী তরুণদের ভয়ঙ্কর খুনিতে পরিণত করছেন তারা। বিভিন্ন সময় জঙ্গি আস্তানা থেকে ফিরে আসা ও গ্রেফতার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য জানা গেছে।
এদিকে গুলশানে জঙ্গি হামলার ঘটনা নিয়ে তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কথা না বলে বা সুনির্দিষ্ট ‘রেফারেন্স’ ছাড়া কোনো ধরনের ‘কথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডিআইজি মনিরুল ইসলাম। তদন্ত সংস্থার প্রধান এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম ও কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদ হাসিব খানকে ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে, গুলশান থানার মামলায় নয়। তাদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় তাদের জড়িত থাকা না থাকা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন তদন্তে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সব জঙ্গি হামলার মূল পরিকল্পনাকারী বা মাস্টারমাইন্ড নব্য জেএমবি নেতা তামিম চৌধুরী ও এবিটি নেতা বহিষ্কৃত মেজর জিয়া এখনো দেশত্যাগ করতে পারেননি। বিশেষ কোনো ছদ্মবেশে তারা দেশের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। এই দুই শীর্ষ জঙ্গি নেতাকে খুঁজে বের করে গ্রেফতার করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। এই দুই হোতা যাতে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে, সেজন্য বিমানবন্দর ও সীমান্তের ইমিগ্রেশনে তাদের সম্ভাব্য বিভিন্ন ছদ্মবেশের ছবি আগেই পাঠানো হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি নেতা তামিম ও জিয়া দেশের ভেতরেই রয়েছেন- এমন ধারণা ও তথ্যের ভিত্তিতেই তাদের ধরিয়ে দিতে ২০ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন আইজিপি। দেশের বাইরে পালিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে এ পুরস্কার ঘোষণা করা হতো না। এই দুই শীর্ষ জঙ্গি নেতা এখনো দেশেই আত্মগোপনে রয়েছেন বলে সর্বশেষ গত শনিবারও জাতীয় প্রেসক্লাবে এক বক্তব্যে ইঙ্গিত করেছেন আইজিপি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ছক যে নব্য জেএমবি নেতা তামিম চৌধুরী এঁকেছেন তা নিশ্চিত হয়েছেন গোয়েন্দারা। হামলার আগে ঢাকায় ও কিশোরগঞ্জে একাধিকবার ওই জঙ্গিদের সঙ্গে বৈঠক করে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন দলনেতা তামিম। একইভাবে কল্যাণপুর জঙ্গি আস্তানায়ও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল শীর্ষ জঙ্গি তামিমের। কিন্তু পুলিশের অভিযানের কারণে ওই জঙ্গিদের হামলার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। অপরদিকে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার মূল হোতা জেএমবি নেতা তামিম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে রিমান্ডে থাকা তাহমিদ হাসিব খানের পূর্ব পরিচয় ছিল। তাদের মধ্যে কানাডায় সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে দাবি করেছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে লেখক ও ব্লগারদের সিরিজ গুপ্তহত্যা করে অপর জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) জঙ্গিরা। আর নেপথ্যে থেকে এসব প্রতিটি হত্যার কলকাঠি নেড়েছেন সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর জিয়া। এ সংক্রান্ত অনেকগুলো মামলার তদন্তে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এবিটির আধ্যাত্মিক নেতা মাওলানা জসিম উদ্দীন রাহমানীর সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন সময় মেজর জিয়ার একাধিকবার দেখা করার তথ্যও পেয়েছেন গোয়েন্দারা।

বেহেশতের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের জঙ্গি বানান তামিম-জিয়া: জঙ্গিবাদ দমনে কাজ করেন এমন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দ্রুত বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বেশ কিছু কোমলমতি তরুণকে ভয়ঙ্কর খুনিতে পরিণত করেছেন জঙ্গি নেতা তামিম চৌধুরী ও চাকরিচ্যুত সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়া। ধর্ম সম্পর্কে যাদের জ্ঞান কম ও পারিবারিক এবং সামাজিকসহ নানা কারণে যারা হতাশ এমন তরুণদেরই সবচেয়ে বেশি টার্গেট করেন তারা। জঙ্গিবাদের মূল হোতারা চরিত্রের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী মিশনে নামে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, মগজ ধোলাইয়ের এ পর্যায়ে তাদের মননে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, রক্তের তৃষ্ণা ছাড়া তাদের মানসিকতায় আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তখনই তাকে দিয়ে ভিন্ন মতাদর্শের লোকদের হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলা হয়।

বিভিন্ন সময়ে জঙ্গি আস্তানা থেকে ফিরে আসা ও গ্রেফতার জঙ্গিদের দেয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ওই কর্মকর্তারা বলেন, তামিম ও জিয়াসহ মাঠ পর্যায়ের জঙ্গি নেতারা প্রথমদিকে নামাজ, রোজা ও ভালো কাজের কথা বলে তরুণদের আকৃষ্ট করলেও পরে তারা এগুলোর চেয়ে জিহাদকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তরুণদের বলা হয়, জিহাদ করে সহজে বেহেশতে যেতে হলে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে ‘হিজরত’ করতে হবে। হিজরতে থেকে যে কাজ করার নির্দেশ নেতারা দেবেন সেটাই হচ্ছে জিহাদ। আর সেটা করলেই নাকি বেহেশত। এমন অন্ধ বিশ্বাস থেকেই কিছু বিপথগামী তরুণ খুনিতে পরিণত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এডিসি ছানোয়ার হোসেন বলেন, তামিম চৌধুরী ও মেজর জিয়া ড্রিম মার্চেন্টদের (তরুণদের অন্ধস্বপ্ন দেখানো ব্যবসায়ী) অন্যতম। ধর্মের বিধান প্রতিপালন না করে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে তরুণদের বেহেশতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখায় তারা। দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করা এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গিবাদে যারা রিক্রুট করে তারা তরুণদের বিভিন্ন দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে। এ ছাড়া ধর্ম-কর্ম সম্পর্কে কম জানে এমন তরুণদের টার্গেট করে তারা। পরে ধর্মের অপব্যাখ্যা বা খণ্ডিত ব্যাখ্যা দিয়ে মগজ ধোলাইয়ের কারণে ওইসব তরুণের মধ্যে আর নিজস্ব বোধ-বুদ্ধি কাজ করে না।

সুনির্দিষ্ট রেফারেন্স ছাড়া প্রতিবেদন নয় ডিআইজি মনিরুল: গুলশানে জঙ্গি হামলার ঘটনা নিয়ে তদন্ত সংস্থার সঙ্গে কথা না বলে কিংবা সুনির্র্দিষ্ট রেফারেন্স ‘কথিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ডিআইজি মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ ধরনের প্রতিবেদনে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই আমি অনুরোধ করব, তদন্তকারী কর্মকর্তা অথবা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে আলোচনা না করে এ ধরনের কথিত অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ থেকে বিরত থাকবেন। তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এটা আমরা আশা করব।

গুলশান হামলার ঘটনায় গ্রেফতার হাসনাত করিমকে নিয়ে একটি পত্রিকায় প্রতিবেদনের বিষয়ে গতকাল রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তদন্ত সংস্থার প্রধান মনিরুল এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিবেদনের কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বাধীন তদন্ত কাজে চাপ অনুভব করতে পারেন। ফলে তদন্ত বিঘিœত হতে পারে।

এক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল ইসলাম বলেন, হাসনাত করিম ও তাহমিদকে পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। হলি আর্টিজানের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারিনি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। তবে এ মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে বলে জানান তিনি। রিমান্ডে থাকা হাসনাত করিম ও অস্ত্র হাতে তাহমিদের যে ছবি গণমাধ্যমে এসেছে, সে বিষয়ে দায়িত্বশীল এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, এই সন্দেহভাজন আসামি রিমান্ডে আছে, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আপনাদের স্পষ্টভাবে এই বিষয়গুলো জানাব। এ হামলার সঙ্গে তারা জড়িত কি না, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, কী পরিস্থিতিতে তাদের হাতে অস্ত্র উঠলৃ এগুলো জানার জন্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা। তদন্ত সংস্থার কাছে যদি তাদের এ মামলায় জড়িত বলে মনে হয়, সেক্ষেত্রে তাদের এ মামলায়ও গ্রেফতার দেখানো হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। প্রকাশিত ছবি নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, এ ধরনের ছবি যদি আর কারো কাছে থাকে, তাহলে সেগুলো তদন্তের স্বার্থে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ না করে পুলিশের কাছে সরবরাহ করুন। আমরা অনেক ছবি পেয়েছি যেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

গুলশান হামলার জব্দ দলিল ও তথ্য আদালতে: আমাদের আদালত প্রতিবেদক জানিয়েছেন, গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের সঙ্গে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত আর করিমের সম্পৃক্ততার তথ্য আদালতে উপস্থাপন করেছে পুলিশ। পুলিশ আদালতে জানিয়েছে, হামলাকারীরা ওই রেস্টুরেন্ট থেকে যেসব ছবি পাঠিয়েছিল সেগুলো পাঠানো হয় হাসনাত করিমের মোবাইল ফোন থেকে। এই ছবি পাঠাতে একটি বিশেষ অ্যাপ ডাউনলোড করেন হাসনাত করিম। পুলিশ জানায়, হামলাকারীরা আর্টিজানে ঢুকে রাত ৮টা ৪৪ মিনিটে। আর হাসনাত ৮টা ৫৭ মিনিটে ওই মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করেন।

১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের মধ্যে নিবরাস ইসলাম হাসনাত করিমের সরাসরি ছাত্র ছিলেন। আর হামলাকারীরা ২০ জনকে হত্যা করলেও হাসনাত করিমের পরিবারের কোনো সদস্যকে কিছু বলেনি। বরং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেছে।

কল্যাণপুরের জাহাজ বিল্ডিংয়ের ৫ জন রিমান্ডে: পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা ও তথ্য গোপনের মামলায় কল্যাণপুরের জাহাজ বিল্ডিংখ্যাত তাজ মঞ্জিলের মালিকের স্ত্রী, ছেলেসহ পাঁচজনের দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল রোববার ঢাকার মহানগর হাকিম খুরশিদ আলম এ আদেশ দেন।

এই পাঁচজন হলেন- বাড়ির মালিকের স্ত্রী মমতাজ পারভীন, ছেলে মাজহারুল ইসলাম, তার সহযোগী মাহফুজুল আনসার, মমিন উদ্দিন ও জাকির হোসেন। ২৬ জুলাই রাতে কল্যাণপুরের জাহাজ বিল্ডিংয়ে পুলিশের অভিযানের সময় পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা ও তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। ওই জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে ৯ জঙ্গি নিহত হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। সূত্র-মানবকণ্ঠ






মন্তব্য চালু নেই