মেইন ম্যেনু

লাখ লাখ টাকার মৌসুমি ব্যবসা

মাস্তানরা চলে ভিক্ষুকের চাঁদায়

‘ঈদে মানুষ কেনাকাটা করে, জাকাত-ফেতরা দেয়, নতুন নতুন জামাকাপড় কেনে। তাছাড়া এ মাসে মানুষের মন ভালো থাকে বলে একটু দানের হাতও বাড়ে।’ কথাগুলো বলছিলেন ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা মেহতাব। তিনি বলেন, ঈদে সবাই যেমন যে যার মতো করে ব্যবসা করে, আমরাও এই মাসটাতে একটু বাড়তি আয় করতে চাই। এজন্য ঢাকার বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা হয় কমপক্ষে ২০ হাজার বাড়তি ভিক্ষুক। মাসচুক্তি ৩০ হাজার টাকা দিয়ে এরা আমাদের কাছ থেকে ভিক্ষার অনুমতি পায়। আমরা তাদের ঢাকা শহরে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। এ চুক্তি শেষ হয় শবে কদরের রাতের পর। এরপর এদের বেশিরভাগই ঈদের আগের দিন গভীর রাত থেকে ঢাকা ছাড়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সব খরচ ও চাঁদা বাদে মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারে এসব মৌসুমি ভিক্ষুক। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় এই আয় প্রায় দ্বিগুণ। এদের নিয়ন্ত্রক দলের সদস্যদের দাবি, এই পুরো কাজ সামলাতে মাস্তানদের বড় অংকের টাকা দিতে হয়। এই টাকা এলাকা ভেদে একেকরকম। তবে নিউমার্কেট এলাকায় সব মিলিয়ে মাস্তানদের এরা দুই লাখ টাকা দিয়ে থাকেন। আর এই বিশাল পরিমাণ টাকা যোগাতে গিয়ে কখনো কখনো তাদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও সেলফোন ছিনতাইকারীদের সঙ্গে হাত মেলাতে হয়। কীভাবে যুক্ত হচ্ছেন এমন প্রশ্নে কাসেম মিয়া নামের পা নষ্ট এক ভিক্ষুক বলেন, আমাদের মধ্যে যারা শরীরে জোয়ান তারা জ্যামের রাস্তায় ভিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে দেখেন কোনও গাড়ির যাত্রী অসচেতনভাবে ব্যাগ রেখেছে কিনা বা জানালার দিকে ফোন নিয়ে কথা বলছে কিনা । ইশারা পেয়ে ছিনতাইকারীরা টান দেয় এসব সামগ্রী।এর বিনিময়ে তারা পায় মোটা অংকের বকশিশ।

সূত্র বলছে, উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম,গাইবান্ধা,ময়মনসিংহ,কিশোরগঞ্জ,নেত্রকোনা,ফরিদপুর, মাদারিপুর, মানিকগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে আনা হয় বেশিরভাগ মৌসুমি ভিক্ষুক। বর্ষায় এসব এলাকার মানুষের কাজ কম থাকায় এখন এ ব্যবসা রমরমা। যারা তাদের ভাড়া করে আনেন তারাই তাদের থাকার ব্যবস্থা করেন। সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য মেহতাবের দেওয়া তথ্যানুযায়ী- রাজধানীর মিরপুর দিয়াবাড়ি বেড়িবাঁধ,পাইকপাড়া,বাউনিয়া বাঁধ,আব্দুল্লাহপুর,মহাখালী গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন খুপরি ও ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে এদের জন্য । এই একমাস এখানে থাকার জন্য মৌসুমি ভিক্ষুকদের কোনও টাকা দিতে হয় না।

ঢাকায় ফিতরাসহ যাকাতের টাকার আশায় রমিজকে নিয়ে আসা হয়েছে ময়মনসিংহ থেকে। পয়লা রোজা থেকে শবে-কদর পর্যন্ত চুক্তি। ভিক্ষা করবেন সায়েন্স ল্যাবরেটরির প্রিয়াংকা শপিংমলের সামনে । এক মাসে এই এলাকার ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রকদের দিতে হবে ৩০ হাজার টাকা। বাকিটা তার। এরপর নিজের হাতে কত থাকবে জানতে চাইলে রমিজ বলেন, ধরেন আমার ইনকাম থাকবে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। এসময় মানুষ অনেক টাকা পয়সা দেয়। ইফতারি করতেও টাকা দেয় । আমি ভিক্ষা করি না, শুধু রমজান মাসে ঢাকায় আসি।

রাজধানীর গুলশান, বারিধারা, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরা এসব অভিজাতপাড়ায় যাকাত-ফিতরার টাকা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। এসব এলাকায় তারা ভিক্ষা যেমন বেশি পান তেমন এখানকার মাস্তানদেরও দ্বিগুণ টাকা দিতে হয় ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রকদের। এজন্য টাকা আদায়ে ছিন্নমূলদেরও প্রধান টার্গেট থাকে এসব এলাকা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমপক্ষে চার লাখ । আর এদের বড় একটি অংশ অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়। গত ২০১১ সালে ঢাকাকে মোট ১০টি জোনে ভাগ করে ৪০০টি স্পটে ভিক্ষুক জরিপের কাজ শুরু হলেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই জরিপ বা পুনর্বাসনের কাজ কার্যকর করেনি। যথাযথ সুযোগসুবিধা না থাকা এবং বন্দি জীবনযাপনের অভিযোগ এনে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে অনেকে সেসময় পালিয়েও যায়।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ভিক্ষাবৃত্তি পেশা না এমন লোককেও এসময় নিয়ে এসে ভিক্ষা করানো হয়। তাই ভিক্ষাবৃত্তির নেপথ্যে থাকা সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আর যেহেতু মাস্তানরা এই ভিক্ষুকদের টাকায় চলে। সেক্ষেত্রে গোড়া থেকে পুনর্বাসন না করে শুধু রাস্তার ভিক্ষুকদের আটকানো সম্ভব হবে না বলেও তিনি মত দেন।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রথমসারির কর্মকর্তাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা সরকারি পদে থেকে দায়দায়িত্ব নিতে চাই না। কিন্তু এই পুরো কাজটি সঠিকভাবে না হওয়ার দায় তো আমাদেরও। তিনি বলেন, ভিক্ষুকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজেরে টিকিয়ে রাখে এ কথার সঙ্গে তিনি একমত পোষণ করেন। বাংলা ট্রিবিউন






মন্তব্য চালু নেই