মেইন ম্যেনু

মুখে ক্যান্সার : বুক থেকে মাংস নিয়ে প্রতিস্থাপন

মুখে ও গলায় ঘা নিয়ে ঢাকায় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি হন সিলেটের মো. বকুল মিয়া (৬০)। পরীক্ষা নিরিক্ষা করে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে, তার মুখে ক্যান্সার হয়েছে এবং তা গলায় ছড়িয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নেন অস্ত্রোপচার করার।

চিকিৎসকরা ৯ ঘণ্টা ধরে তার মুখে ও গলায় অস্ত্রোপচার করেন। ফেলে দেওয়া হয় ক্যান্সার আক্রান্ত মুখের মাংস ও চোয়ালের হাড়। বুক থেকে মাংস এনে মুখে প্রতিস্থাপন করা হয়। চোয়ালের হাড় আপাতত প্রতিস্থাপন করা হয় নি। পরে তার পা থেকে হাড় কেটে নিয়ে চোয়ালে প্রতিস্থাপন করা হবে।

চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের ক্যান্সার তামাক জাতীয় পণ্য, পান-সুপারি সেবনের কারণে হয়। ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি মুখে ব্যথা অনুভব না করার কারণে প্রথমে বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন না। তাই সহজে ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে একবারে শেষ পর্যায়ে এসে। তখন আর কিছুই করার থাকে না।

সম্প্রতি এ ধরণের অস্ত্রোপচার করা রোগীর খোঁজ নিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের ২২টি সিটেই রোগী আছেন। কারো মুখে ব্যান্ডেজ করা। কারো মুখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে; দেখা যাচ্ছে মুখে নতুন মাংস প্রতিস্থাপন করার চিহ্ন।

ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে আসা রোগী সিলেটের মো. বকুল মিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কেমন আছেন। মাথা নেড়ে জানান, তিনি ভাল আছেন। মুখে ব্যান্ডেজ থাকায় তিনি কথা বলতে পারেন নি।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি বিভাগের প্রভাষক ডা. নিতীশ কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে আসা ৯০ শতাংশ লোকই তামাকজাতীয় পণ্য সেবনকারী। মুখে ব্যাথা অনুভব না করার কারণে তারা প্রথমে বুঝতে পারেন না। ধীরে ধীরে এটা গলায় ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের কাছে আসেন একেবারে শেষ পর্যায়ে। তখন অস্ত্রোপচার করার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থাকে। তাই মুখে ঘা নিয়ে কখনোই বসে থাকতে নেই। ঘা গলার নিচে ছড়িয়ে পড়লে আমরা আর অস্ত্রোপচারের দিকে যাই না।’

তিনি বলেন, ‘গলায় অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে। বেসরকারি কিছু ক্লিনিকে এ ধরনের অস্ত্রোপচার হয়ে থাকে। তবে সেখানে খুবই ব্যয়বহুল। ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে তারা। ফলে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত নিম্নবিত্ত মানুষদের আর চিকিৎসা করানো হয় না। বড় সমস্যা হচ্ছে, কোথায় এই রোগের চিকিৎসা হয় তা অনেকেই জানেন না।’

প্রভাষক নৌশাদ কায়সার পাঠান বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল ও ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।’

জানা যায়, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নাক কান গলা হাসপাতাল, তেঁজগাওয়ে জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওরাল ক্যান্সারের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে প্রতি সপ্তাহে একদিন অস্ত্রোপচার করা হয়। ওরাল ক্যান্সারের অস্ত্রোপচারে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে সপ্তাহে একজনের বেশি রোগী অস্ত্রোপচারের সুবিধা পেতে পারেন না। অন্য অপারেশনের জন্যও রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়। বেড রয়েছে ২২ টি। চিকিৎসক একজন। অন্যরা সবাই সংযুক্তিতে আছেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান ও বাংলাদেশ ডেন্টাল সোসাইটির মহাসচিব ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল বলেন, ‘এ ধরনের রোগীর খুবই চাপ রয়েছে। তাই সপ্তাহে আরো অন্তত দুই দিন অপারেশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই অপারেশনের জন্য আলাদা একটি অপারেশন থিয়েটার দরকার। বেড ২২টা থেকে দ্বিগুণ করে ৪৪টা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মত আটটি ডেন্টাল ইউনিটের জন্য ৯২৮টি পদ সৃজনের জন্য ফাইল অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

ডা. নিতীশ কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘তামাক জাতীয় পণ্য সেবন না করলে এই ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রতি উপজেলায় অন্তত: একজন করে ওরাল এন্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন থাকা প্রয়োজন।’

তামাক জাতীয় পণ্য থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, এসিডি, ইপসা, সীমান্তিক, উবিনীগ, ইসি বাংলাদেশ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, নাটাব, প্রত্যাশা, এইড ফাউন্ডেশন ও প্রজ্ঞা কাজ করে যাচ্ছে। প্রজ্ঞার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যান্সারে আক্রান্তদের ৩৮ শতাংশই তামাক জতীয় পণ্য সেবনকারী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বর্তমানে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ যার একটি বড় অংশ দরিদ্র শ্রেণির। এসব রোগীর মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর, রক্তনালি, জরায়ু ও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি। ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বাংলাদেশে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় এবং এ রোগে ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। প্রতিনিয়তই এই সংখ্যা বাড়ছে।

ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সারের (আইএআরসি) সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুর হার শতকরা ৭ দশমিক ৫। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ এই হার ১৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই