মেইন ম্যেনু

মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিপাকে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো না হওয়ায় ব্যাংকে জমেছে অলস টাকার পাহাড়। গেল বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যেও আমানতের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে মুনাফা করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। আর এ মুনাফা করাতে গিয়ে বিপাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংশ্রিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিনিয়োগ না বাড়ায় এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে ঋণের চাহিদা বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকে অলস টাকা শুধু বাড়ছেই।

এদিকে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায়ই টাকা তোলে। যার বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে সুদ দিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংককে। ফলে এই খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

বর্তমানে দুটি পদ্ধতিতে সরাসরি বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বিল ও রিভার্স রেপো (বাজার থেকে টাকা তুলে নেওয়ার উপকরণ)। বাংলাদেশ ব্যাংক বিলের মধ্যে ৭ দিন, ১৪ দিন ও ৩০ দিন মেয়াদি বিল রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্কের (আইপিএন) সিনিয়র গবেষক আনেয়ারুল হক বলেন, ‘জনগণের অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রেখে মুনাফা করা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাজ না। ভালো ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে ব্যবসার পরিবেশ সৃষ্টি করাই ব্যাংকের কাজ।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হলে ব্যাংকের মুনাফা হবে। পাশাপাশি অর্থনীতির গতিও সচল হবে, কর্মসংস্থানও বাড়বে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিল ও রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেওয়া প্রতি ১০০ টাকার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে গড়ে ২ টাকা ৯৭ পয়সা থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। ২০১১-১২ অর্থবছরে মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয় এক কোটি ৬২ লাখ টাকা, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১১৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৮৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৮০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। ফলে গত ৫ বছরে এ খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০০ গুণ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান কাজ মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার থেকে টাকা তুলে নেবে এটাই স্বাভাবিক। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ ব্যয় বাড়লেও কিছু করার নেই। কারণ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত কাজ।’

জানা গেছে, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ রফতানি আয় ও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করছে তা কাজে লাগাতে পারছে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা বাজার মূল্যে কিনে নিচ্ছে। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে ছাড়া হচ্ছে স্থানীয় মুদ্রা। এভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক গত অর্থবছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছেড়েছে। এর বাইরে বিনিয়োগ মন্দার কারণে ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ আমানত গ্রহণ করছে তা কাজে লাগাতে পারছে না। এভাবে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকের বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো একশ টাকা আমানতের বিপরীতে বিনিয়োগ করতে পারছে ৬৯ টাকা। অথচ দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণ আনছেন।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘সুদ কম হওয়ায় উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণ নিচ্ছেন। ফলে ব্যাংক আমানত অব্যবহৃত থাকছে। ফলে ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে ঋণের সুদহার কমাচ্ছে। পাশাপাশি তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে কমানো হচ্ছে আমানতের হার। আর ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করতে পারায় বাড়ছে খেলাপি ঋণ।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য আছে এক লাখ ২৬ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ট্রেজারিতে রয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও ঋণের চাহিদা না থাকায় তা বিতরণ করা যায়নি।






মন্তব্য চালু নেই