মেইন ম্যেনু

মুসলিম প্রবেশের অনুমতি নেই যে গ্রামে

থুয়াঙতান গ্রামে প্রবেশ করতেই একটা নতুন সাইনবোর্ড দেখতে পাওয়া গেল। উজ্জ্বল হলুদ রংয়ের সাইনবোর্ডে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে, ‘রাত্রিবাসের জন্য কোনো মুসলিমের অনুমতি নেই। কোনো মুসলিম বাসা ভাড়া নিতে পারবে না। মুসলিমদের সঙ্গে কোনো বিয়ে হবে না।’ গত মার্চ মাসেই ইরাবতী ডেল্টার এই গ্রামটির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই সাইনবোর্ডটি ঝুলিয়ে দেয় গ্রামের প্রধান সড়কের সামনে। এই সাইনবোর্ড থেকে এটা অন্তত প্রমাণ হয় যে, ওই গ্রামের বৌদ্ধরা নিজেরা অন্য সবার থেকে আলাদা থাকতে চায়। কিন্তু মিয়ানমারের গণতন্ত্র কি বলে এক্ষেত্রে?

তখন থেকেই একটি দম্পতি মিয়ানমারের বিভিন্ন গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন বাস্তব পরিস্থিতির সন্ধানে। তাদের মতে, বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামগুলো অনেকটাই জলাবেষ্টিত দ্বীপগুলোর মতো। গ্রামগুলোর এই আউটপোস্টগুলো বৃহদার্থে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি একদিকে যেমন হুমকিস্বরুপ, তেমনি জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা ছড়াতেও পারে। প্রায় এক দশক সেনাবাহিনীর শাসনের পর মিয়ানমার এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। সরকারের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রনে থাকলেও একজন স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে অং সান সুচির উপরই হলো এই নতুন যুগের দায়িত্ব।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিয়ানমারে যেন জাতীয়তাবাদীদের ঢেউ চলছে। গত মাসেই ইয়াঙ্গুণে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের সামনে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিল। সেই সমাবেশ থেকে আন্দোলনকারী জাতীয়তাবাদীরা দাবি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যেন প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কোথাও রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করে। কারণ হিসেবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বলা হয় যে, রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী, যাদেরকে মিয়ানমারে আশ্রয় দিতে চায় না তারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গা শব্দটি টিকে থাকলে, এই সত্যও টিকে থাকবে যে, মিয়ানমারের শাসকরা গ্রামকে গ্রাম রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়গ্রহন করতে বাধ্য করেছে।

সুচির দল হিসেবে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কিছু বক্তব্য প্রদান করেছে। কিন্তু সেই বক্তব্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারেনি। উল্টো সুচি নিজে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বারংবার রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য নির্দেশ দিয়ে আসছেন। দেশটির নতুন ধর্মমন্ত্রী ও সাবেক জেনারেল থুরা অং কু সম্প্রতি দেশটির মুসলিম এবং হিন্দু জনগোষ্ঠিকে ‘সহযোগী নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ব্যাপার হলো, জাতীয়তাবাদীদের এই দাবি চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই এবং দেশের সংখ্যালঘু গোষ্ঠিদের নিকট ভবিষ্যতে কি হবে তাও অনিশ্চিত।

থুয়াঙতান গ্রামে বাসিন্দার সংখ্যা মাত্র ৭০০, যাদের অধিকাংশই পেশায় কৃষক। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক দিয়েও এই কৃষকদের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। কর্দমাক্ত রাস্তা আর বাড়িঘরের অবস্থা দেখেই সহজে বোঝা যায়। কিন্তু এর ভেতরেও স্রেফ ধর্মকে কেন্দ্র করে গ্রামটির অধিবাসীদের নিয়ে সম্প্রতি তৈরি হয়েছে প্যাট্রিয়টিক ইয়ুথ নেটওয়ার্ক নামের একটি জাতীয়তাবাদী দল। এই দলের সদস্যদের কাজ হলো গ্রামের উন্নয়ন করা এবং বিদেশিদের হাত থেকে গ্রামকে রক্ষা করা। গ্রামের তরুণ এক সাধু নতুন ওই সাইবোর্ডের মানে বলছিলেন ধীরে ধীরে। ‘এনএলডি ধর্মীয় ইস্যুতে যে কোনো কিছুই করে না তা এই গ্রামের অধিবাসীরা দেখেছে।’

পার্টির প্রতি অসন্তোষ এবং ধর্মীয় কারণে শেষমেষ গ্রামবাসীরা ‘ধর্ম রক্ষার’ জন্য নিজেরাই ব্যবস্থা করেছেন। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একজন ব্যক্তি এসেছিলেন থুয়াঙতান গ্রামে। তিনি ধীরে ধীরে সেই গ্রামের সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি নিজেকে হিন্দু বলে পরিচয় দেন এবং একটা পর্যায়ে জমি কিনতে শুরু করেন। আর এই জমি কেনার ফলে স্থানীয়রা ধারনা করলো যে, যেহেতু লোকটি জমি কিনছেন, তাই তিনি হয়তো আসলে মুসলিম হবেন।

গ্রামবাসীদের পক্ষ থেকে একজন বলেন, ‘ওটা ছিল আমাদের কাছে ভূতের মতো। আমরা কখনও ভূত দেখিনি কিন্তু আমরা ভীত হয়ে পরি।’ যে বৃদ্ধের সঙ্গে আমাদের কথা হলো তিনি হলেন গ্রামের স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন যিনি ওই নতুন সাইনবোর্ডের পক্ষে নন। তবে তার মতেও, বৌদ্ধরা এবং মুসলিমরা যদি একত্রে থাকতে শুরু করে তবে সাংস্কৃতিক অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছুদিন আগেই কাওয়া সান উইন নামের একজন ২৮ বছর বয়সী তরুণ গিয়েছিলেন থুয়াঙতানে। কিন্তু তার আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় গ্রামবাসীরা তাকে গ্রামেই প্রবেশ করতে দেয়নি। কিন্তু মজার বিষয় হলো, পরবর্তীতে যোগাযোগ হলে জানা যায়, উইন আসলে একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং একই সঙ্গে তার পরিবারে হিন্দু ধর্মের চর্চাও আছে।

উইনের মতে, ‘গ্রামের কর্তাব্যক্তিরা তার নিরাপত্তা দিতে পারবে না বলে জানিয়েছিল। একারণে উইন ও তার সঙ্গী ওই গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। ওই একই সময়ে ফেসবুকে দেখা যায় গ্রামটির ইয়ুথ প্যাট্রিয়টিক নেটওয়ার্ক সেই সাইনবোর্ডটির পাশে দাড়িয়ে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করছে।’ মিয়ানমারের রোহিঙ্গা বিদ্বেষ শুধু আজকের সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যায় আক্রান্ত দেশটি। ধর্মীয়ভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠি রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে দেশটির প্রশাসন বরাবরই নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে এবং রাজনৈতিকভাবে এই সমস্যা সমাধানেরও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।






মন্তব্য চালু নেই