মেইন ম্যেনু

মৃত্যুর দিকে খাদিজা, জীবন বাঁচাতে ইমরান

রফিকুল ইসলাম কামাল: ধারালো চাপাতির একের পর এক আঘাত। রক্তাক্ত খাদিজা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন নিথর। কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না। কেউ সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছে না। দূর থেকে হৈচৈ শুনে এগিয়ে এলেন একজন। তার পর ভূলুণ্ঠিত মানবতাকে তুলে নিলেন কোলে। রক্তাক্ত খাদিজাকে কোলে নিয়ে ছুটলেন হাসপাতালের দিকে। ওই একজন হচ্ছেন ইমরান। পুরো নাম ইমরান কবির।

খাদিজা আক্তার নার্গিস এখনো বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন কি না, সেটা নিয়ে জোর সংশয়। তবে এখনো যে তিনি বেঁচে আছেন, তার পেছনে রয়েছে ওই ইমরান কবিরের এগিয়ে এসে রক্তাক্ত নিথর খাদিজাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ভূমিকা।

টগবগে তারুণ্যের মূর্ত প্রতীক ইমরান কবির (২০)। সিলেট সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে ব্যস্ত সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ঢালারপাড় গ্রামের এই যুবক। সোমবার বিকেলে প্রকৃতির সুনিবিড় ছায়াঘেরা এমসি কলেজে হাঁটতে গিয়েছিলেন তিনি। তার পর তো অসীম সাহসিকতায় মানবতার ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

বদরুল আলম নামের নিকৃষ্ট অমানুষের চাপাতির আঘাতে এমসি কলেজের পুকুরপাড়ে লুটিয়ে পড়েন খাদিজা আক্তার নার্গিস। রক্তাক্ত খাদিজা নিথর হয়ে পড়ে থাকেন। কেউ এগোয়নি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। সোমবার বিকেলে যখন ওই ঘটনা ঘটে, তখন কিছুটা দূরে ছিলেন ইমরান কবির। শোরগোল শুনে ঘটনাস্থলের দিকে এগোতে থাকেন তিনি। তার পর?

শোনা যাক ইমরান কবিরের মুখেই, ‘আমি যখন ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম সবাই দৌড়ে পালাচ্ছে। আমার একটু খটকা লাগল, সবাই কেন পালাচ্ছে!

আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখি, পুকুরপাড়ে একটা মেয়ে পড়ে আছে। রক্তাক্ত, নিথর। কেউ নেই পাশে। দৌড়ে তার কাছে ছুটে যাই আমি। চিৎকার করে সাহায্য করার জন্য ডাকাডাকি করি। দুজন অপরিচিত ব্যক্তি এগিয়ে আসেন।’

বলে চলেন ইমরান, ‘তাঁদের সঙ্গে নিয়ে ওই মেয়েটাকে (তখনো খাদিজার নাম-পরিচয় কিছুই জানেন না ইমরান) কোলে করে একটু এগিয়ে একটা সিএনজি অটোরিকশায় দিয়ে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

খাদিজার শরীরের রক্তে ভেসে যায় ইমরানের কাপড়চোপড়। হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দ্রুত ভর্তি করা হয় খাদিজাকে। রক্তের জন্য তাগদা দেন ডাক্তাররা। ইমরানের রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মিলে যায় খাদিজার রক্তের গ্রুপ। তাৎক্ষণিকভাবেই রক্ত দেন তিনি। এরপর বিভিন্ন ধরনের ওষুধের জন্য তাগদা দিতে থাকেন ডাক্তাররা। রক্তেভেজা শরীর নিয়ে ফার্মেসিতে দৌড়াদৌড়ি করে ওষুধ এনে দেন ইমরান।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। বাড়তে থাকে রাত। খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন খাদিজার আত্মীয়স্বজন। রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতিতে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে খাদিজাকে রেখে নিজ বাসায় ফেরেন ইমরান।

কেউ এগিয়ে আসেনি, আপনি এগিয়ে গেলেন, কেন? কী চলছিল আপনার মনের মধ্যে তখন? ইমরান কবিরের কাছে প্রশ্ন ছিল। জবাব দিতে দেরি করেননি মানবতার ডাকে সাড়া দেওয়া এই যুবক, ‘আমার মাথায় তখন শুধু একটাই চিন্তা ছিল, মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।’

খাদিজা বেঁচে থাকবেন কি না, সেই অনিশ্চিত উত্তর তোলা থাক সময়ের জন্য। কিন্তু ইমরান কবির নামের এই যুবক যে যুগে যুগে বেঁচে থাকবেন মানবতার দৃষ্টান্ত হয়ে, তা বলে দেওয়া যায় নিশ্চিত করেই।

লেখক : রম্য লেখক






মন্তব্য চালু নেই