মেইন ম্যেনু

মেঘনার জেলেদের কাছে ভয়ঙ্কর হচ্ছে জলদস্যু

বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ ও মেঘনার রুপালী ইলিশের বিখ্যাত জেলা ভোলাসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবীকার একমাত্র মাধ্যম মৎস্য শিকার। প্রতি বছর হাজার হাজার মেট্রিক টন ইলিশ অবৈধ ভাবে পাচার হচ্ছে বর্হিবিশ্বে। আমরা সমুদ্র সীমা জয় করছি, অর্জন করছি নতুন ভূখন্ড তার পরেও অরক্ষিত রয়েছে আমাদের মৎস্য শিকারী জেলেরা। নদী যাদের খাদ্য যোগায়, নদী যাদের বস্ত্র যোগায়, নদী যাদের বসতি স্থাপনে সহায়ক সেই জেলে বন্ধুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ আমরা।

জলের শত্রু জেলের শত্রু জলদস্যু যারা অন্যের উপার্জন কেড়ে নিয়ে নিজের উপার্জন বাড়ায়। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ গোটা জেলে সম্প্রদায়। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এরা মানুষের মুখের আহার কেড়ে নেয়। নাম মাত্র কোন কোন সময়ের অভিযানে রাগব বোয়াল বাদ দিয়ে চুনো পুটি শিকার করে থানায় ভরে। কিন্তু মুল হোতারা সব সময় ধরা ছোয়ার বাহিওে থেকে যায়। অনেক সময় দেখা যায় এসকল জলদস্যুরা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকতার সাথে লিয়াজো করে অপকর্ম করে যাচ্ছে নির্দিধায়। জলদস্যু আতঙ্কে প্রতিটি ইলিশ মৌসুমে উৎকন্ঠায় থাকে ভোলার জেলে পরিবার গুলো।

জলদস্যু আতঙ্ক বিরাজ করছে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলে পল্লীগুলোতে। প্রতি বছর বঙ্গোপসাগরে একের পর এক জলদস্যু হামলার শিকার হয়ে শত শত জেলেরা নিঃস্ব হয়ে গেছে। জলদস্যুদের কাছ থেকে যেসব জেলে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা মূল্যের আগাম ‘দস্যু পাস’ সংগ্রহ করবেন, তাদের অপহরণ করবে না বলে তাগিদ দিচ্ছে দস্যু বাহিনী। কিন্তু দস্যুদের দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর কোনো পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ করেছেন জেলেরা। বিভিন্ন সময় জেলে অপহরনের খবর পাওয়া যায় চরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বঙ্গোপসাগরে জেলেদেরকে অপহরণ করে জলদস্যুরা। পরে মোটা অঙ্কের টাকা মুক্তিপন দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনতে হয়েছে।

ইলিশ ধরার মৌসুমে জেলেরা বিকাশের মাধ্যমে পাস সংগ্রহে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা পাঠাচ্ছে সুন্দরবনের জলদস্যুদের কাছে। আগে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের উৎপাত কম ছিলো। বর্তমানে দস্যুরা নতুন নিয়ম করে তাদের কাছ থেকে আগাম কার্ড সংগ্রহ করার তাগিদ দিচ্ছেন। নতুবা প্রতি বছরের ন্যায় এবারো অপহরনের পর মুক্তিপন না পেলে হত্যা করবে বলেও হুমকি দিয়ে আসছেন। আটককৃত জেলেদের জীবিত ছাড়াতে অনেকে নিজের জমি বিক্রি করে দস্যুদের দাবিকৃত মুক্তিপন দিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনা হয়। একদিকে ধার দেনা করে জাল আর নৌকা নিয়ে সাগরে মাছ শিকারে গিয়ে মিকার করা মাছতো বিক্রি করার সুযোগ পায়না জেলেরা তার উপর জীবন বাচাতে ভিটেমাটি বিক্রি করে ছাড়িয়ে আনতে হয় বেচে থাকার তাগিদে। এ যেন মরার উপর খরার ঘা।

কোস্টগার্ড স্টেশনগুলো জলদস্যুদের দমনে তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছে কিন্তু তা নাম মাত্র, কোস্টগার্ড কিংবা সরকারি প্রশাসনের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা অস্ত্র চালিয়ে কোন সময় পরাজয় আর কোন সময় দু একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় কিন্তু নিঃশেষ হচ্ছে না দস্যুতা। আবার প্রশাসনের যৎ সমান্য লোকবলের কারনে অভিযান চালতে ব্যর্ততার কথাও স্বীকার করছে প্রশসনের কর্মকর্তারা। তার পরেও সাগরে জলদস্যু দমনের অভিযানে সব সময় তারা তৎপর রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।

জলদস্যুরা আইলার চেয়েও ভয়ংকর আইলা, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের চেয়েও দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের কাছে ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি হচ্ছে জলদস্যু। ঝড়-বন্যার তবুও আলামত পাওয়া যায়, কিন্তু জলদস্যুদের কোন আলামত পাওয়া যায় না। হঠাৎ করে এসে দস্যুরা জেলেদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে যায় বলে মন্তব্য জেলে পরিবারের। স্বামী মৎস্য শিকারে যাবার পর ফিরে না আসা পর্যন্ত স্বামীর চিন্তায় তিনি অস্থির থাকেন জেলে বধুরা। আতঙ্কে ওষ্ঠাগত প্রাণ কি জানি কি হয়। আকাশে মেঘ নেই, গাঙ্গে বানের কিংবা তুফানের আলামত নেই। তবুও তাদের উৎকণ্ঠা। না জানি কখন জলদস্যুরা হানা দিয়ে কেড়ে নেয় তার স্বামীর সবকিছু। জাল- বৈঠা নিয়ে ক্ষান্ত হবে তো! নাকি স্বামী সন্তান কে মারধর করে গাঙ্গে ফেলে দেবে। এ চিন্তা শুধু একা কোন জেলে বধুর না।

কারন একজন জেলের সাথে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের উজ্জল ভবিষ্যত বেচে থাকার স্বপ্ন। বিবাহ উপযুক্ত কন্যার নতুন জীবন কিংবা বিবাহ সামনে কোন হবু বরের রঙ্গিন ঘর বাধার স্বপ্ন, এসবের কোন মানে নেই জলদস্যূর কাছে। নেই কারো বাচা মরার স্বপ্ন ভাঙ্গার করুন আকুতির কোন দাম। জলদস্যুর চাই টাকা, অর্জিত সম্পদ না হয় তরতাজা প্রাণ।

অনেক স্বপ্ন বুনে জেলে পরিবার গুলো এবার ইলিশ মৌসুমে নতুন ঘর বানাবে, মেয়ের বিয়ে দিবে কিংবা জামাই মেয়ের সুখের ঠিকান গড়তে সাহায্য করবে। কিন্তু সে স্বপ্ন অনেক সময় বানের পানিতে ভেসে যায়। মৎস শিকারি সর্বস্ব হারিয়ে ফিড়ে আসে খালি হাতে। নতুবা খবর আসে বন্ধি জীবনের। বন্দি জীবন থেকে বাচানোর জন্য ডাক আসে ভিটে মাটি বিক্রির টাকা নিতে। অন্যথায় হাড়াতে হবে পরিবারের একমাত্র উপর্যনশীল মানুষটিকে।

কারণ মেঘনা নদী থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারীদের পাশাপাশি ঘুরে বেড়ায় জলদস্যু নামের একদল হায়না। বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন নদীগুলোতে নৌ-ডাকাতির সাথে জড়িত জলদস্যুদের অধিকাংশই থাকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে। আরো বেশ কয়েকটি গ্রুপ থাকে লক্ষীপুর, মনপুরা ও চরফ্যাশনের দূরবর্তী কালকিনি এলাকায়।

অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে ওইসব দস্যুরা নৌ-পথে চলাচল করে। গত কয়েক বছর পূর্বে ওইসব দস্যুরা জেলেদের জাল, নৌকা এমনকি শিকার করা ইলিশ ও ট্রলারের ইঞ্জিন পর্যন্ত তারা খুলে নিয়ে যেতো। গত দু’বছর ধরে ডাকাতির পরিবর্তে উপকূলের জলদস্যুরা সোমালিয়ার জলদস্যুদের মতো জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে আসছে।

জলদস্যুদের কাছ থেকে টোকেন ক্রয় করে জেলেদের নদী বা সাগরে জাল ফেলতে হয়। অসংখ্য গ্রুপ টোকেন বিক্রি করায় নির্দিষ্ট অংকের টাকায় এ টোকেন ক্রয় করেও অধিকাংশ সময় রক্ষা পাওয়া যায়না। এক গ্রুপের টোকেন ক্রয় করে মাছ শিকারে গিয়ে অন্য গ্রুপের হাতে পড়লে আর রক্ষা নেই। ফের অপহরণ এবং মুক্তিপণ।

জেলেদের জীবন বঙ্গোপসাগরের লোনা জলের আছড়ে পড়া ঢেউ ভেঙ্গে একসময় যারা দেশী-বিদেশী মানুষকে রূপালী ইলিশের স্বাদ জোগাত, সেসব পরিবারের মাঝে এখন শুধুই হাহাকার। একের পর এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলদস্যুদের তান্ডবে জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে দুর্বিসহ অভাব-অনটন। জেলেপল্লীর বাসিন্দাদের জীবনের সবকিছু যেন দিনে দিনে ওলোট-পালোট হয়ে যাচ্ছে।

ভোলার ঢালচর, চর কুকুরী-মুকুরী, পাতিলা, চর জহির উদ্দিন, মনপুরার চর নিজাম, তজুমদ্দিনের শশীগঞ্জ বেড়িবাঁধে অথবা মেঘনার তীরবর্তী হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এলাকার জেলেপল্লীগুলোতে এখন প্রায় একই চিত্র।

পুলিশ ও বনকর্মীদের হয়রানি সমদ্র থেকে মাছ শিকার করে বরিশালের মোকামে নিয়ে আসার পথে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ, বন বিভাগের কর্মী ও চাঁদাবাজদের হয়রানির শিকার হয় জেলেরা। মোড়লগঞ্জ, মংলা, নলি, শরণখোলা, পাথরঘাটা, নেয়ামতি, চর মোন্তাজ, রায়ন্দাসহ ঢালচর, পাতিলা ও কুকুরী-মুকুরীসহ বেশকিছু পয়েন্টে বনরক্ষী অথবা পুলিশকে প্রতি ট্রিপে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা দিতে হয়।

যে অঞ্চলে জেলেরা মাছ ধরতে যায় সে অঞ্চলের বন বিভাগ থেকে পাস সংগ্রহ করার নিয়ম রয়েছে। সরকারি নিয়মানুসারে এক সপ্তাহ মাছ ধরা বাবদ বন বিভাগের সীমানায় মাছ ধরতে ২৫০ টাকা ও প্রতি মন মাছের জন্য এক’শ টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু এর বাইরেও জেলেদের বাড়তি উৎকোচ দিতে হয়। এছাড়াও পুলিশ কিংবা বন কর্মকর্তাদের পছন্দের মাছটি তাদের হাতে তুলে দিতে হয় জেলেদের।

দাদন খুবলে খাচ্ছে জেলেদের দাদন নামের অভিশাপের যাঁতাকলে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে জেলেদের জীবন। নয়া কাবুলিওয়ালা নামে পরিচিত এ দাদন ব্যবসায়ীরা জেলেদের কাছে ভয়ংকর। মেঘনার হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ থেকে শুরু করে সাগরের তীরবর্তী পদ্মা স্লুইচ পর্যন্ত উপকূলের বিভিন্নস্থানে রয়েছে দাদন ব্যবসায়ীদের অসংখ্য আড়ত বা মোকাম। জেলেদের কাছে আড়তগুলো ফিশিংঘাট হিসেবেই পরিচিত।

সূত্রমতে, নভেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সাগর কিংবা নদীতে ইলিশ থাকে না। সাগরে কিছু রূপচাঁদা ধরা পড়লেও নদী থাকে একেবারেই ফাঁকা। তখন জেলেপাড়াগুলোতে চলে দুর্দিন।

এ সুযোগটিকে বেঁছে নেয় দাদন ব্যবসায়ী মহাজনেরা। চড়া সুদের ঋণের করুণার কাছে জেলেরা হেরে যায়। অনেক সময় মাছের দরটি তখনই বেঁধে দেয়া হয় বাজার দরের চাইতেও অনেক কম মুল্যে মাছ কিনে নেয় দাদন ব্যবসায়ী। পরিবারের সদস্যদের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতে নিরুপায় দরিদ্র জেলেরা এ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করে ইলিশ মৌসুমের।

জুন মাসের শুরুতে বর্ষা ও জোয়ারের পানি দেখে আশায় বুক বাঁধে জেলে পরিবারগুলো। তখন জালের ফাঁকে ইলিশ আটকালেও ভাগ্যের ফাঁক দিয়ে সেই ইলিশ চলে যায় মহাজনের মোকামে। ইলিশ ভর্তি জেলেনৌকা ঘাটে ভিড়ানোর সাথে সাথে বাজপাখির মতো ছোঁ মারে মহাজনের লোকেরা। দরদাম ঠিক হয় মহাজনের ইচ্ছানুযায়ী।

প্রতিবাদের শক্তি নেই জেলেদের। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে দেখেন। মেঘনা, তেঁতুলিয়া নদী থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত দাদন ব্যবসার পসরা বসিয়েছেন চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জের কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীরা। একজন দাদন ব্যবসায়ী এবার দাদন দিয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা।

কষ্টের সাথে নিবিড় আলিঙ্গন সাগর কিংবা উপকূলের নদীতে এখন আর আগের মত জেলে নৌকার বহর দেখা যায় না। জেলেপাড়ায় চলছে দুর্দিন। মহাজনের দাদনের টাকা ও এনজিওদের চড়া সুদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে অনেক জেলেরাই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হিজলার বেড়ি বাঁধের ওপর বসে কথা হয়েছিল এক জেলে আব্দুর রশিদ মাঝির সাথে। তার চোখে মুখে হতাশার কান্তি আর দুর্ভোগের ছাপ স্পষ্ট। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালেন, ইলিশের সেইদিন আর নেই।

একসময় ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ পড়ত। ৫/৬ জনে মিলে জাল টেনে নৌকায় তোলা হতো। দিনশেষে গাঙ্গ পাড়ের চায়ের দোকানের আড্ডাটা জমতো জমজমাট। সেইদিন হারাইয়া গ্যাছে। “এ্যাহন আর গাঙ্গে আগের মত মাছ নাই” তার উপরে একের পর এক প্রাকৃতিক ঝড় বয়ে যাচ্ছে, যেন আসমানী বালার মত গজব নেমে আসছে জেলেপাড়াগুলোতে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর জলদস্যু ও দাদন ব্যবসায়ীরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে জেলে পরিবারগুলোর সর্বস্ব।

জীবনভর একই আবর্তে উপকূলভাগের ইলিশ শিকারের সাথে যুক্ত পরিবারের মানুষগুলো জন্মের পরই সাগরের সাথে নিবিড় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সাগর এদের বাঁচায় আবার সাগরই এদের জীবন কেড়ে নেয়। এদের কাছে জলই জীবন-জলই মরণ। ঝড়-বাদল উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে সংগ্রাম করে এদের জীবন চলে। যে জলে ইলিশ আহরণ করে তারা জীবন ধারণ করে, সে জলেই তারা প্রাণ হারায়।

প্রিয়জনেরা তার লাশটি পর্যন্ত খুঁজে পায় না। যে মাছ শিকার করে তাদের জীবন চলে সে মাছের পেটেই চলে যায় তাদের লাশ। জেলেদের জীবন সাগরের ঢেউয়ের সাথে ঘুরপাক খেলেও এদের নাটাই থাকে মতিঝিলের এসি রুমে। সেখানেই জেলেদের নিয়ে নীতিমালা তৈরি হয়। যার বাস্তবতা এসে পৌঁছে না সাগর পাড়ের মানুষের কাছে। মহাজনের কাছে এরা অসহায়-জিম্মি-পরাধীন। এদের ভাগ্যের চাকা বদলায় না।

ভোজনরসিক মানুষের রসনা তৃপ্তির বাসনা পূরণের জন্য মাছ ধরতে গিয়ে একদিন তারা নিজেরাই মাছের পেটে চলে যায়। চাল-ডাল সঙ্গে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিংবা ট্রলারে চেঁপে এরা হারিয়ে যায় গভীর বঙ্গোপসাগরে। বেতার বার্তায় যখন ঝড়ের আভাস পায় তখন তারা আর কূলে ফেরার সুযোগ পায় না।

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরও ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অসহায় জেলেদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। জেলেদের আহরণ করা মাছ বিদেশে রপ্তানী করে যেসব ব্যবসায়ীরা কোটিপতি হয়েছেন তারাও জেলেদের ব্যাপারে উদাসীন।

ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ কিংবা বরিশাল থেকে পাথরঘাটায় গিয়ে দাদনের ব্যবসা করেন এ রকম ব্যবসায়ী রয়েছেন অনেক। তারা একের পর এক বরফকল তৈরি করে ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটিয়েছেন। কিন্তু জেলেপল্লীর বাসিন্দাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরছে উল্টো পথে। স্বচ্ছল হওয়ার পরিবর্তে জেলেদের বেড়েছে দারিদ্র্যতা।

সব হারালেও কুসংস্কার হারায়নি বরিশাল অঞ্চলের জেলেদের অতীত ঐতিহ্য ইলিশ, জাল ও নৌকা বলতে গেলে সব হারিয়ে গেছে। কিন্তু কুসংস্কার হারায়নি। তারা এখনো বিশ্বাস করেন, জালে কিংবা নৌকায় জুতা নিয়ে পাড়ালে সে সাবারে (জালে) মাছ ধরা পড়ে না। ভরা মৌসুমে মাছ ধরা না পড়লে তারা মিলাদ দেয়, সাগরে দুধ ছিটায়। কখনো বা সোনা-রূপার পানি ঢেলে দেয়া হয় জলে।

হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ, বঙ্গেরচর, রাজাপুর, দৌলতখান, তজুমদ্দিন, মনপুরা, চরফ্যাশন হয়ে দেশের সর্ব দক্ষিণের পাথরঘাটা পর্যন্ত অসংখ্য জেলেপল্লী রয়েছে। প্রকৃতির রুদ্ররোষ প্রায়ই জেলেপল্লীর তাজা প্রাণগুলো রকড়ে নিয়ে যায়।

জেলেদের কাছে সিডরের আগে ২০০৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের সামুদ্রিক ঝড় এখনো স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। আসেকেই সাগরে গিয়ে তারাও আর ফিরে আসেনি। সিডরে নিখোঁজ হওয়া শত শত জেলেদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন মানসিক বিকারগস্ত হয়ে উপকূলে ফিরে আসলেও ১৯ সেপ্টেম্বরের নিখোঁজ হওয়া জেলেদের মতো সিডরে নিখোঁজ অসংখ্য জেলেদের সন্ধ্যান আজো মেলেনি।

নিখোঁজ জেলেরা কে কোথায় ভেসে গেছেন তার কোন হদিস নেই। ঝড়ের সাথে গত কয়েক বছর ধরে যুক্ত হয়েছে জলদস্যুদের অত্যাচার। সাগর বা নদীর মোহনায় ইলিশ শিকারে গেলেই জেলেদের পড়তে হয় দস্যুদের কবলে। জেলেদের অপহরণ করে জলদস্যুদের আস্তানায় আটকে রেখে মোটা অংকের টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হচ্ছে।

জেলেদের কাছে মাঝি শেষ ভরসা সাগরের মৎস্য শিকারে যাওয়া ট্রলারের মাঝি জেলেদের কাছে জাহাজের ক্যাপ্টেনের মতো। তার আদেশ-নির্দেশ জেলেরা অমান্য করেন না। মাঝিকে মহাজন বেতনও দিয়ে থাকেন বেশি। কোথায় জাল ফেলতে যেতে হবে, কিভাবে কোন পথে উপকূলে ফিরতে হবে, সবকিছুই নির্ধারণ করেন মাঝি। ঝড়ের কবলে পড়লে মাঝির নির্দেশ ছাড়া জেলেরা সাগরে ঝাঁপ দেয় না। মাঝি ট্রলারটি ভাসিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন।

আবার ডাকাত কিংবা জলদস্যুরা ধাওয়া করলে মাঝিই ট্রলারটি নিরাপদ দূরে সরিয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। মাঝির নির্দেশেই জেলেরা ডাকাতদের প্রতিহত করতে লাঠিসোঁঠা হাতে নেয়। আবার মাঝি বললেই চুপচাপ ট্রলারের মধ্যে জেলেরা লুকিয়ে থাকেন।

মাঝির নির্দেশে জেলেরা নিজেদের আত্মসর্মপণ করে জলদস্যুদের সাথেই প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে চলে যান দস্যুদের নির্জন আস্তানায়। পরে মহাজন তাদের নানান অংকের টাকায় মুক্ত করে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। তবে জলদস্যুদের সাথে এ মুক্তিপণ নিয়ে দীর্ঘ দেন-দরবার ও চাহিদা অনুযায়ী মুক্তিপণ পরিশোধ করে জেলেদের মুক্ত করতে সপ্তাহ পেরিয়ে কখনো মাস কেটে যায়।

এই দীর্ঘদিন অপহৃত জেলেদের চরম শংকায় থাকতে হয় জলদস্যুদের আস্তানায়। আর দস্যুদের হাতে অপহৃত জেলে পরিবারগুলো থাকেন চরম উদ্বিগ্ন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ায় জেলে পরিবারগুলোর চুলায় আগুনও জ্বলে না।

কবে হবে এসকল অপকর্মের অবসান। আসবে সুদিন মুক্ত স্বাধীন পানিতে মাছ শিকার করে মুক্ত মনে ফিরবে জেলে চলবে তার পবিরার ঘুরবে দেশের অর্থনীতির চাকা। সব কিছুই সম্ভব প্রশাসনিক কঠোরতা সরকারি হস্তক্ষেপ অসাধু কর্মকতার চাকরিচ্যুতি ও জেলের সুন্দর স্বপ্নের সে সোনালী দিনের অপেক্ষায় আগামী মৎস শিল্প।






মন্তব্য চালু নেই