মেইন ম্যেনু

মেননকে ‘ভেজাইল্যা মন্ত্রী’ বলায় সংসদে তোপের মুখে সুরঞ্জিত

জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের প্রথম সারির কোনো মন্ত্রী উপস্থিত না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘এ অবস্থায় যদি হাউজ (সংসদ) চলে, তাহলে চালানোর দরকার নেই। সংসদ চালাতে হলে সামনের সারিতে অন্তত একজন মন্ত্রী হলেও উপস্থিত থাকার দরকার ছিল।’

এসময় সামনের সারিতে উপস্থিত বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং ওয়ার্কার্স পার্টি সভাপতি রাশেদ খান মেননের দিকে ইঙ্গিত করে সুরঞ্জিত বলেন ‘মেনন হাসছেন, যদিও উনি একজন ‘ভেজাইল্যা মন্ত্রী’ (অন্য দলের মন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি তিনি ইঙ্গিত করে)।

সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে সিনিয়র এ পার্লামেন্টারিয়ান মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি পাশাপাশি বাংলাদেশ নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিফেন মার্শিয়া ব্লুম বার্নিকাটের একটি মন্তব্যের জন্যও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশ নিয়ে একটি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য এবং সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে সরকারি দলের অন্তত ৬ জন সাংসদ বিতর্কে জড়ান। এদের মধ্যে তিনজন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের বিপক্ষে অবস্থান নেন। অপর তিন জন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

সুরঞ্জিত তার বক্তব্যে বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূত আমাদের দেশ নিয়ে এভাবে বলতে পারেন না।’ একই বিষয় উত্থাপন করেন সরকারি দলের অপর সিনিয়র পার্লামেন্টারিয়ান শেখ ফজলুল করিম সেলিম এবং ড. হাছান মাহমুদ। কিন্তু পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দেন এলজিইডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও সরকার দলীয় চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ।

এসময় স্পিকারের আসনে বসে থাকা ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে নিজের অসন্তোষ জানান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘মার্কিন রাষ্ট্রদূত বললেন- ইচ্ছা করলে তারা বাংলাদেশ দখল করতে পারতো। এ ধরনের বক্তব্য কূটনৈতিক শিষ্টাচারবর্জিত। আমরা এর নিন্দা জানাই। এটা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জোরালো আপত্তি জানাবে বলে আশা করি।’

সামনের সারিতে কোনো মন্ত্রী না থাকার বিষয়টি দৃষ্টিকটু। সুরঞ্জিতের বক্তব্যের বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি বলেন ‘আমি আশা করি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে তার সুবিধাজনক সময়ে বিবৃতি দেবেন।’

অন্যদিকে, মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি নিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্যের সমালোচনা করেন নারায়ণগঞ্জ থেকে নির্বাচিত শামীম ওসমান। এর আগে মন্ত্রীদের নিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মন্তব্য সংসদীয় কার্যবিধি থেকে বাদ দেয়ার দাবি জানান তিনি।

এরপর ফ্লোর নিয়ে সুরঞ্জিতের বক্তব্যকে সমর্থন করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন ‘আমরা ছোট রাষ্ট্র হতে পারি। আমরা নিম্নমধ্য আয়ের দেশ থেকে মধ্য আয়ের দিকে যাচ্ছি। আমাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মান আছে। যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছি। কাজেই কেউ এ দেশ দখল করা নিয়ে বক্তব্য দেবে, এটা কোন ধরনের আচরণ? পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব তাকে (বার্নিকাটকে) ডেকে সদুত্তর নিতে। বাংলাদেশ কারও দয়ায় স্বাধীন হয়নি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কী ভূমিকা ছিল সবাই জানে। তারা সেদিন গণতন্ত্রের কথা ভুলে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সেদিন পাকিস্তানকের অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। সেজন্য তারা এখনও দুঃখ প্রকাশও করেনি। যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর নাময়েছিল। সেদিন ষষ্ঠ নৌবহর না নামলে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হতো না। আজ বঙ্গবন্ধু নেই, তবে তার কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কী আইএস নেই? টুইন টাওয়ারে হামলা হয়েছে। এটা আফগানিস্তান ও সিরিয়া নয়। ৩০ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এ দেশ। কাজেই কেউ চাইলেই আমাদের স্বাধীনতা লুণ্ঠন করতে পারবে না। তাদের কত বড় ধৃষ্টতা, আমাদের স্বাধীনতা নিয়ে হুমকি দেয়! যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এই দেশের মানুষের সাহস অনেক বেশি শক্তিশালী। পররাষ্ট্র মন্ত্রীর উচিত তাকে ডেকে ব্যাখ্যা নেয়া।’

সুরঞ্জিত ও শেখ সেলিমের বক্তব্যের পরপরই ফ্লোর নেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক।

তিনি বলেন ‘আমাদের একজন সদস্য বললেন- মন্ত্রীরা পালিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, তারা পালিয়ে যাননি। তারা পালিয়ে যেতে পারেন না। মাননীয় স্পিকার, তার (সুরঞ্জিতের) এ বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করুন। কারণ, উনিও (সুরঞ্জিত) একসময় মন্ত্রী ছিলেন। মন্ত্রীরা আশপাশেই রয়েছেন। তাছাড়া আগামী দু’দিন শুক্র ও শনিবার ছুটি থাকায় মন্ত্রীরা অনেকে সংসদে যোগ দেয়ার পর নিজ নির্বাচনী এলাকায় গেছেন। আমার মনে হয়, উনি (সুরঞ্জিত) মনের অজান্তে এ মন্তব্য করেছেন।’

নানকের বক্তব্যের বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘সামনের কাতারে না দেখলেও আশপাশের কাতারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা আছেন। তবে মাননীয় সদস্য (সুরঞ্জিত) ‘ভেজাইল্যা’ যে শব্দটি বলেছেন সেটিসহ অন্য আরও কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে দেখা হবে।’

এরপর সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ দাঁড়িয়ে গতকালের সংবাদপত্রে প্রকাশিত বার্নিকাটের বক্তব্য পাঠ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য সম্পর্কে আমাদের কোনো কোনো সদস্য যা বলেছেন তা সত্য নয়। বার্নিকাট বরং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ঠেলে দিতে পারে না। এ ধরনের নীতিও তার দেশের নেই। তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করতে চায়। কাজেই তার বক্তব্য নিয়ে অনেকে যা বলেছেন তা মনগড়া।’

পরে নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান ফ্লোর নিয়ে সুরঞ্জিতের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন ‘শেখ হাসিনা যাদের মন্ত্রী করেছেন তারা পরীক্ষিত, তারা কেউ পালিয়ে যাওয়ার মত নেতা নন। এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মন্ত্রীদের অমর্যাদা করা হয়েছে। বার্নিকাটের বক্তব্যের বিষয়ে চিফ হুইপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কাজেই মন্ত্রীদের নিয়ে দেয়া বক্তব্য হয় তিনি (সুরঞ্জিত) নিজে প্রত্যাহার করুন, না হয় আপনি এক্সপাঞ্জ করুন।’

তখন ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘এ বিষয়ে আর বেশি আলোচনার দরকার নেই।’

সরকারি দলের সদস্যদের হইচইয়ের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘বার্নিকাট যে ভাষায় বলেছেন, সেভাবে বলা উচিত হয়নি। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের চেয়ে ২০ গুণ বেশি খুন হয়েছে। আমি সুরঞ্জিত দা’র বক্তব্যের ভক্ত। তারপরেও মন্ত্রীদের নিয়ে তিনি যা বলেছেন, তা বোধ হয় ঠিক নয়।’

হাছান মাহমুদের বক্তব্যের সময় চিফ হুইপ দাঁড়িয়ে মাইক ছাড়াই ডেপুটি স্পিকারের উদ্দেশে বলেন ‘আপনি কেন এই আলোচনা চালাচ্ছেন! বার্নিকাট কী বলেছেন, সেটি পত্রিকাতেই আছে। সেটিকেই রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণ করলেই হয়।’

জুনিয়র সদস্যদের এসব বক্তব্যের সময় সুরঞ্জিত অবশ্য তার আসনে বসে ছিলেন। তবে বক্তব্য দিয়েই সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন শেখ সেলিম। আর মন্ত্রীদের নিয়ে সুরঞ্জিতের ক্ষোভের কিছুক্ষণ পরেই লবি থেকে সংসদ কক্ষে ফেরেন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।






মন্তব্য চালু নেই