মেইন ম্যেনু

মেয়রের দিকে তাকিয়ে বনানীর পোড়া ফ্ল্যাটের মালিকরা

বনানীতে গ্যাস বিস্ফোরণে ছয়তলা বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি তিতাসের কমিটি। ফলে বনানীর সেই বাড়ির বাসিন্দারা জানেন না তাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে। তবে তারা ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হককে ‘মুরব্বি’ জ্ঞান করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

এদিকে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ থেকে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি।

গত শনিবার বনানীর ২৩/বি নম্বর রোডের, নয় নম্বর বাড়িতে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন প্ল্যাট মালিকের সঙ্গে। সরকারি সংস্থা থেকে বাড়িটি বাস-অনুপযোগী ঘোষণা করায় তারা সেখানে উঠতে পারছেন না। তবে নিজেদের ফ্ল্যাটগুলো পোড়া আবর্জনা সরিয়ে পরিষ্কার করছেন তারা।

বিস্ফোরণের বড় বড় ক্ষত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটির সামনে কিছু পোড়া সামগ্রীর ময়লার স্তূপ। বাড়ির সামনে খাকি রংয়ের পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মধ্যবয়সী নিরাপত্তারক্ষী।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ছয়তলা ভবনে মোট ২০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এগুলোর মালিক ১২ জন। মালিকদের বাইরে বাকি আটটিতে ভাড়াটিয়ারা থাকতেন।

তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। নিজের পরিচয় দিয়ে জানলাম তার নাম ড. এম এ খান; পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি এই ভবনের একটি ফ্ল্যাটের মালিক। দুজন শ্রমিক নিয়ে এসেছেন নিজের ঘরগুলো পরিষ্কার করার জন্য।

কী অবস্থা জানতে চাইলে এম এ খান বলেন, “ঘটনার দিন বাড়িতে ছিলাম না। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বনানীতে এক আত্মীয়ের বাসায় আছি।”

সরকার কিংবা কোনো সংস্থা থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আশ্বাস পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে এম এ খান বলেন, “আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। শুধু মেয়রের মুখের দিকে চেয়ে আছি।”

এ সময় বাড়ির সামনে একটি গাড়ি থেকে নেমে আসেন মাথায় সাদা ব্যান্ডেজ বাঁধা মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ভবনের আরেকটি ফ্লাটের এই মালিক আগুন লাগার দিন ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মাথায় আঘাত পান। তিনি বলেন, “আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে সেটা শুধু আমরাই অনুভব করতে পারছি।”

সাইফুল্লাহ বলেন, “এই অভিজাত এলাকায় সরকারের কর-খাজনা সবই বেশি। অথচ এখানকার বসিন্দাদের নিরাপত্তা কী হাল! একটি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে আজ আমাদের এই অবস্থা। কয়েকজন লোককে সাসপেন্ড করলেই এত বড় ক্ষতির দায় শেষ হয়ে যায় না।”

সরকারের পক্ষ থেকে কোন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা মেয়রকে মুরব্বি মনে করছি। উনি যা করেন, সেই অপেক্ষাতেই আছি।”

ঘটনার পরে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি পরিদর্শন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পৃথক দুটি প্রতিনিধিদল। তারা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করে। তবে ভবনটি সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী করে তোলা সম্ভব বলে মনে করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল।

ওই বিশেষজ্ঞ দলটি মনে করে, ঢাকা সিটি করপোরেশন রাস্তা খোঁড়াখুড়ির কারণে গ্যাসের পাইপে লিক হয়। ওই লিক থেকে গ্যাস ভবনের বিভিন্ন সংযোগের পাইপের মধ্যে ঢোকে। পরে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপের কারণে বিস্ফোরণ হয়ে আগুন ধরে যায় ভবনে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ মনে করেন মেরামতের মাধ্যমে ভবনটি বসবাসের যোগ্য করে তোলা যাবে। আর বিস্ফোরণ ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির দায়দায়িত্বের ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও তিতাস কর্তৃপক্ষ দুই সংস্থার দিকেই সৈয়দ ইশতিয়াকের তীর। তিনি বলেন, “এই ঘটনায় তিতাস কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিতাসের প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে কে এই ঘটনার জন্য মূলত দায়ী।”

ইশতিয়াক আরও বলেন, “তবে এটা আইনগত বিষয়, তাই কে ক্ষতিপূরণ দেবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।”

ওই ভবনের ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শামসুল আলম বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিনা তা জানি না। কয়েকবার এ ব্যাপারে মিটিং হয়েছে বলে শুনেছি। তবে বিষয়টি আমার কাছে ক্লিয়ার না।”

এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনটি রিসিভ করেননি।

জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, এ ব্যাপারে তিতাসের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করবে, তার আলোকেই বলা যাবে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি। তবে কবে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলেননি তিনি।

গত ১৭ মার্চ মধ্যরাতে গ্যাস বিস্ফোরণে বনানীর ওই বাড়িতে আগুন লাগে। এতে নিচের দুটি তলা ছাড়া ওপরের তলাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বেশ কিছু কক্ষের দেয়াল ভেঙে পড়ে।

এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মাসুদুর রহমান আকনকে সভাপতি করে তিনি সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাস্তায় গ্যাস লাইন লিক হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে সেখান থেকে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। বিষয়টি অনেকবার তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।






মন্তব্য চালু নেই