মেইন ম্যেনু

মেয়েকে ফেরত চাইতে গিয়ে ‘নির্যাতনের ভিডিও’

‘আমার মেয়েকে ছাদে নিয়ে নির্যাতন করত, নাকে খর দেওয়াতো, উপুড় করে শুইয়ে পেছন দিকে হাত-পা বেধে ছাদে ফেলে রাখত, তারপর চুল ধরে তাকে পেটাত। আর এখন বলছে, মেয়েটি কাউকে না বলে গেটের তালা খুলে একাই চলে গেছে। এ ঘটনার পর আমার সঙ্গে যোগাযোগ না করেই ঘটনা ধাপাচাপা দিতে নানা রকম ফন্দি ফিকির করা হয়।’

‘তার নাকি অনেক ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার বলেই থানা পুলিশ ম্যানেজ করে দিনের পর দিন পার করছেন। কিন্তু আমার মেয়েকে সশরীরে ফেরত চাই। একাধিক বার থানা পুলিশ ও মালিকের বাসায় গিয়েছি। সবাই টালবাহানা করছেন। আমি কিছু বুঝি না, আমার মেয়েকে ফেরত চাই। ওরা আমার মেয়েকে দিতে পারবে না। মেয়েকে হয়তো তারা মেরেই ফেলেছে।’

গৃহকর্তার বাসায় মেয়েকে খুঁজে না পেয়ে এক দিশেহারা বাবা এভাবেই বলছিলেন তারা ক্ষোভ ও দুঃখের কথাগুলো। শনিবার রাতে কথা হয় মিরাজ নামের এই বাবার। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাকলী গ্রামে মিরাজের বাড়ি। তিনি তিন চাকার নসিমন চালিয়ে সংসার চালান। গরিব এই মানুষটি তার মেয়েকে ফিরে পেতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

মিরাজ জানান, তার মেঝ মেয়ে তন্নি (১২) সাড়ে তিন বছর আগে পল্লবী থানার বরভিটা এলাকায় প্রফেসর হাসনান আহমেদের বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ নেয়। গৃহকর্তা হাসনান ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একাউন্টিংয়ের শিক্ষক। তন্নিকে ওই শিক্ষককের স্ত্রী রুবি বেগম প্রায়ই মারধর করতেন। এ কথা তন্নি তার বাবাকে অনেক বার বলেছে। এরপরও অভাবের সংসারের কথা ভেবে মেয়েকে সেখানেই কাজে রেখেছেন। কিন্তু মাসের পর মাস যায়, মেয়ের বেতনের টাকা পরিশোধ করেন না তারা।

মিরাজ জানান, গত ৬ জুলাই সন্ধ্যার দিকে তন্নির ফুফু ও দাদা মিরাজকে ফোন করে বলেন, তন্নিকে অনেক দিন ধরে দেখি না। ওকে ফোন করে দেখ তো, এবারে ঈদে বাড়িতে আসবে কি না। এরপর তন্নির মালিককে ফোন করেন তিনি। অনেক বার ফোন করে না পেয়ে টেনশনে পড়ে যান। পরে রাত ১০টার দিকে শিক্ষক হাসনান ফোন ধরে বলেন, ‘কেন আপনার মেয়ে বাড়িতে ফিরে যায়নি? ও তো সকালের দিকে কাউকে না বলে বাসা থেকে বের হয়ে গেছে। আমি জানি, সে আপনাদের বাড়িতে গেছে।’ তন্নি বাসা থেকে বের হয়ে গেছে সেটা আপনি তো আমাকে জানাতে পারতেন। কিন্তু না জানিয়ে এখন বলছেন সে পালিয়ে গেছে।

এরপর মিরাজ পরের দিন ঢাকায় চলে আসেন। মেয়ের খোঁজ শুরু করেন। কিন্তু সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেনি কিছু না। আসলে তন্নি পালিয়ে গেছে, না কি অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছে? সন্দেহ থেকে মিরাজ ছুটে যান পল্লবী থানায়। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, শুক্রবার (৬ জুলাই) তন্নি হারিয়ে গেছে মর্মে শিক্ষক হাসনান একটি জিডি করেছেন। মিরাজ ওসিকে ঘটনার আদ্যপান্ত খুলে বললে তারও একটি সাধারণ ডায়েরি নেয়। তবে জিডি নেওয়ার আগে পুলিশ আবেদনপত্রে লেখেন, তন্নি বাসা থেকে কাউকে না বলে পালিয়ে গেছে। এ কথার প্রতিবাদ করে মিরাজ বলেন, কেন এ কথা লিখলেন, আপনারা কি দেখেছেন তন্নি পালিয়ে গেছে। তন্নিকে তো খুনও করতে পারে। তখন পুলিশ হারিয়ে গেছে মর্মে একটি জিডি নেন।

জিডি নেওয়ার পর মিরাজকে নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই রায়হান হাসনানের বাসায় গিয়ে ঘটনার তদন্তের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। এরপর এসআই রায়হানের ফোনে একটি কল আসে। কল কেটে দেওয়ার পর রায়হান মিরাজকে বলেন, ঘটনা যা হয়েছে, চিন্তা করে লাভ নেই। সবাই মিলে মেয়েটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। এরপর মিরাজ গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ চলে যান।

ঝিনাইদহে গিয়ে মিরাজ এলাকার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান ফরিদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন। চেয়ারম্যান তাকে থানায় নিয়ে যান মামলা করাতে। কিন্তু ঝিনাইদহ সদর থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে বের হয়ে চেয়ারম্যান জানান, এখানে মামলা হবে না। ঢাকায় গিয়ে মামলা করতে হবে। কথা হয়, ২৭ জুলাই ঢাকায় যাবে একসঙ্গে। কিন্তু ২৭ জুলাই মিরাজকে রেখে চেয়ারম্যান একাই ঢাকা চলে আসেন এবং পল্লবী থানার এসআই রায়হান ও প্রফেসর হাসনানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ওই দিন মিরাজ চেয়ারম্যানকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘সব কথা হয়েছে। বাড়ি এসে তোর সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলব।’ বাড়িতে যাওয়ার পর মিরাজ দুই দিন গিয়ে না পেয়ে শেষে ঝিনাইদহ থানায় মামলা করতে যায়। এতে চেয়ারম্যানের ছোটভাই তাকে ফোন করে বলেন, ‘মামলা করলে তোর বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হবে।’ শেষে মিরাজ মামলা না করেই বাড়িতে ফিরে আসেন।

এরপর ১১ আগস্ট ঢাকার জজ কোর্টে এসে মিরাজ একটি মামলা করেন। মামলায় উল্লেখ করেন, আমার মেয়ে তন্নিকে শিক্ষক হাসনানের বাসা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আমার মেয়েকে ফেরত চেয়ে বারবার তাগাদা দিলেও তারা আমার মেয়েকে ফেরত দেয়নি। বরং নানাভাবে টালবাহানা করে সময় ক্ষেপণ করছেন। পুলিশও আমাকে কোনো রকম সহযোগিতা করছেন না। এই অবস্থায় আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই।

আদালত মামলা আমলে নিয়ে পল্লবী থানাকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দিতে বলেন। আদালতের এ নির্দেশ পল্লবী থানায় পৌঁছালে তদন্তের দায়িত্ব পান সেই এসআই রায়হান। এরপর রায়হান মিরাজের ওপর ক্ষেপে যান। অবশ্য আদালতে মামলা করার আগে একদিন এসআই রায়হান মিরাজকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘যা হওয়ার হয়েছে, ঢাকায় আসেন, তাদের সঙ্গে বসে একটা মীমাংসা করে দেব। কিছু টাকাও পাবেন। বেচারা শিক্ষকেরও সম্মান রক্ষা পাবে।’

মিরাজ জানান, এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এলে এসআই রায়হান ধমক দিয়ে বলেন, ‘একটি ঘটনায় দুটো জিডি হয়েছে। তদন্তও চলছে। আবার কী কারণে আদালতে গিয়ে মামলা করলেন।’

মিরাজ আরো জানান, দ্বিতীয় দফায় যখন হাসনানের বাসায় মেয়ের খোঁজে যান, তখন পাশের বাসার এক মেয়ে তন্নিকে নির্যাতন করার একটি ভিডিও সিডি আকারে দেন। এদিকে এই ভিডিওর কিছু অংশ কাছে হস্তান্তর করেছেন মিরাজ।

২ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বাসার ছাদে তন্নিকে হাত বেধে রাখা হয়েছে। উপুড় করে শোয়ানো। নাকে খর দেওয়া হচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরই এক নারী এসে তার চুল ধরে মারছেন। পাশের ছাদ থেকে কেউ একজন এই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন।

সবশেষ মিরাজ বলেন, আমি আমার মেয়েকে জীবিত অথবা মৃত ফেরত চাই। কোনো কথা আর শুনতে চাই না।

এ বিষয়ে প্রফেসর ড. হাসনান আহমেদ বলেন, ঘটনার দিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলাম। আমার বিদেশ ফেরত মেয়ে ও স্ত্রী রুবি বাসায় ছিলেন। তন্নি না কি কাপড় শুকাতে দেওয়ার কথা বলে ছাদে যায়। এরপর অনেক সময় ধরে ফিরে না আসায় তাকে ডাকতে গিয়ে দেখা যায়, তন্নি ছাদে নেই। এরপর আমাকে বিষয়টি জানালে সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি শুরু করি। গাবতলীতেও রাত পর্যন্ত খোঁজা হয়েছে। ওই দিনই থানায় গিয়ে একটি জিডিও করেছি।

তিনি আরো বলেন, আমি শিক্ষক মানুষ। আমার একটা সম্মান আছে। কখন তাকে নির্যাতন করেছে, সেটাও আমি জানি না। জানলে হয়তো একটা ব্যবস্থা নিতে পারতাম। এখন মেয়েটা নেই। সবাই তাকে খুঁজছি। এ নিয়ে ১২ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছি। যেদিন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিটি আসে, সেদিন সকালের দিকে একটা কল আসে। আমাকে বলা হয়, ফরিদপুর বসন্তপুর হাইওয়েতে একটি মেয়ে পড়ে আছে। তাকে অক্সিজেন দিতে হবে, কিছু টাকা পাঠান। এটা আপনাদের মেয়ে হলেও হতে পারে। এ কথা বলে ৫ হাজার টাকা নিলেও পরে আর তাদের খোঁজ মেলেনি।

তন্নিকে আমরা কিছু করিনি বলে দাবি করে প্রফেসর হাসনান বলেন, পুলিশ ও তদন্ত সংস্থা এসে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করুক। তদন্তে আমরা জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে যা হওয়ার তাই হবে। আইনকে শ্রদ্ধা করি।

এদিকে পল্লবী থানার এসআই রায়হান বলেন, ঘটনার তদন্তে এখন পর্যন্ত প্রতীয়মাণ হয়েছে, তন্নি কারো সহযোগিতায় প্রফেসরের বাসা থেকে পালিয়ে গেছে। আর নির্যাতনের ঘটনাটা ৮ মাস আগের বলে প্রফেসরের স্ত্রী রুবি জানিয়েছেন। এ ছাড়া আদালতে মামলার তদন্ত কাজও শেষ পর্যায়ে। আগামী ১০ অক্টোবর নাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া যাবে। রাইজিংবিডি






মন্তব্য চালু নেই