মেইন ম্যেনু

যমজ দেবতা

যমজ সন্তান নিয়ে মানুষের কৌতুহলের অন্ত নেই। হালে বিজ্ঞানের কল্যানে যমজ সন্তান জন্মের রহস্য মানুষ জানতে পেরেছে। তবে পৃথিবীতে এমন এলাকা রয়েছে, যেখানে যমজ সন্তানের জন্মকে এখনও কল্যান অথবা অকল্যানের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুধু মানুষ নয়, অনেক দেবতাও নাকি যমজ ছিলেন। পুরাণ ঘাটলে এমন অনেক দেবতারই নাম পাওয়া যায়।

পুরাণ বললে সবার আগে গ্রিক মিথলজির কথাটিই সামনে চলে আসে। গ্রিক মিথে কয়েকজন দেবতাই ছিলেন যমজ। হিন্দু পুরাণেও বেশ কয়েকজন যমজ দেবতা রয়েছেন। মিশরীয় , পারস্য ও মায়া পুরাণেও যমজ দেবতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এসব পুরাণ থেকে এবার উল্লেখযোগ্য কয়েকজন যমজ দেবতার কাহিনী তুলে ধরা হলো রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য।

হেলেনের যমজ বোন : গ্রিক পুরান মতে হেলেন হলেন দেবরাজ জিউসের সন্তান। স্পার্টার রাজা টিনডেরিয়াসের স্ত্রী লিডার সঙ্গে জিউসের অবৈধ সম্পর্কের ফসল হেলেন ও ক্লাইতেমেনস্ত্রা । হেলেনের কথা আমরা সবাই জানি। বিখ্যাত ট্রয় যুদ্ধতো ঘটেছিল হেলেন আর প্যারিসের প্রেমের কারণেই। ক্লাইতেমেনস্ত্রার বিয়ে হয়েছিল গ্রীক বীর আগামেননের সঙ্গে। ট্রয় যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ দশটি বছর তার দেশ আরগস থেকে দূরে ছিলেন আগামেনন। স্বামীর এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তার চাচাতো ভাই অ্যাগিসথাসের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ক্লাইতেমেনস্ত্রা। আগামেনন আরগসে ফিরে এলে তাকে কৌশলে হত্যা করেন ক্লাইতেমেনস্ত্রা। পরে অ্যাগিসথাস আরগসের রাজা হলে তাকে বিয়ে করেন ক্লাইতেমেনস্ত্রা।

ক্যাস্টোর ও পোলাক্স : এরা দুজন দেবরাজ জিউস ও স্পার্টার রাজা টিনডেরিয়াসের ছেলে। জিউস রাজহাঁসের বেশে টিনডেরিয়াসের স্ত্রী লিডার সঙ্গে মিলিত হলে পোলাক্স এবং টিনডেরিয়াসের ঔরসে জন্ম হয় ক্যাস্টরের। এরা দুই ভাই গৃহস্থের পশু চুরি করতে পারদর্শী ছিল। মানবসন্তান ক্যাস্টরের মৃত্যু হলে পোলাক্স জিউসের কাছে আবেদন জানান, তার আয়ুর অংশ যেন ভাইকে দেওয়া হয়। তাদের দুজনকে একত্রে নক্ষত্র জেমিনিতে পরিণত করা হয়। রাতের আকাশে এই নক্ষত্র দেখেই নাবিকরা পথের দিশা পেতেন।

রেমুলাস ও রেমাস : অ্যালবালঙ্গা নগরীর শাসক ছিলেন ট্রোজান বংশের শাসক নুমিটার। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচারক। তবে তার সহোদর আমুলিয়াস ছিলেন হিংসুটে ও স্বার্থপর। একদিন আমুলিয়াস তার ভাইকে হটিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। সিংহাসন নিশ্চিত করতে তিনি হত্যা করেন নুমিটারের ছেলেকে। আর ভাতিজি রিয়া সিলভিয়াকে হত্যা না করে যাবজ্জীবন সাজা দেন তিনি। নুমিটারের বংশের কোনো উত্তরাধিকারি যাতে না জন্মাতে পারে সেজন্য রিয়ার কাছ থেকে তিনি শপথ আদায় করেন যে, সে কখনো কাউকে বিয়ে করে সংসারী হবে না। আর এই শপথ ভঙ্গ করার শাস্তি মৃত্যু। কিন্তু রণদেবতা অ্যারিস বা মার্স ভালোবেসেন রিয়াকে। তাদের মিলনে জন্ম হয় যমজ সন্তানের। রোমের ইতিহাসে এরা রেমুলাস ও রেমাস নামে পরিচিত।

রিয়ার মা হওয়ার খবরে আমুলিয়াস ক্ষেপে গিয়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তার দুই শিশুপুত্রকে বাক্সে ভরে টাইবার নদীতে ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রহরীরা শিশু দুটিকে নদীতে ফেলে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু তাদের বাবা দেবতা অ্যারিস সন্তানদের রক্ষা করেন। দেবতার নির্দেশে টাইবার নদী শিশু দুটিকে তীরে পৌঁছে দেয়। একটি নেকড়ে সেই কাঠের বাক্সটি দেখতে পায়। ক্রন্দনরত শিশুদের দেখে নেকড়ের মায়া হয়। এই নেকড়ের দুধ পান করে বড় হতে থাকে শিশু দুটি। একদিন ফস্টুলাসনামে এক মেষপালক বনে শিশু দুটির সন্ধান পেয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে । মেষপালক আর তার স্ত্রীর কাছে বেড়ে ওঠে রেমুলাস ও রেমাস। গ্রামে ডাকাতের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় রেমুলাস ও রেমাসে এক সময় মেষপালকদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠন করে, যারা ডাকাতদের শায়েস্তা করত। কালক্রমে তাদের বীরত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। একদিন ঘটনাক্রমে দুই ভাইয়ের সঙ্গে তাদের নানা রাজা নুমিটারের পরিচয় হয়। নুমিটার জানতে পারেন তার নাতিরা বেঁচে আছে। দুই ভাই ও তাদের নানা এবার আমুলিয়াসের বিরুদ্ধে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে। তাদের বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে হামলায় পরাজিত হয় আমুলিয়াস। নানাকে নিজের রাজ্য বুঝিয়ে দিয়ে দুই ভাই আলাদা রাজ্য স্থাপন করে। একদিন রেমাস তার ভাইয়ের রাজ্যের সীমানা নিয়ে কটুক্তি তাকে হত্যা করেন রেমুলাস। এই রেমুলাসই প্রতিষ্ঠা করেন রোম নগরীর।

অশ্বিনীকুমার : এই যমজ দেবতা ছিলেন সবিতা (সূর্যদেব) ও উষাদেবী সজ্ঞার যমজ পুত্র। তার ছিলেন দেব-চিকিৎসক। একবার মহির্ষি চ্যাবনের রূপবতী স্ত্রী সুকন্যাকে স্নানরত অবস্থায় দেখে মোহিত হয়ে পড়েন তারা। চ্যাবনকে ত্যাগ করে তাদের একজনকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন অশ্বিনীকুমার ভ্রাতৃদ্বয়। তবে সুকন্যা তাতে সন্মত হননি। ঘটনাচক্রে এই দুই ভাইয়ের প্রসাদে চ্যাবন তাঁর যৌবন ফিরে পান। চ্যাবন তখন তাদের বর দেন , দেব-কর্মচারী হলেও তাদের সোমপান করবার অধিকার থাকবে।

নকুল-সহদেব: পঞ্চপাণ্ডবদের দুই ভাই। ঋষি দুর্বাসা রাজা পাণ্ডুর স্ত্রী কুন্তীকে বিয়ের আগে একটি বর দিয়েছিলেন। এই বরের সাহায্যে কুন্তী সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য যে কোনো দেবতাকে আহ্বান করতে পারতেন। এই বর ব্যবহার করে কুন্তী তিন পুত্র লাভ করেন। কুন্তীর কাছ থেকে দুর্বাসার সেই বর অল্পসময়ের জন্য চেয়ে নিয়ে পাণ্ডুর আরেক স্ত্রী মাদ্রি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহ্বান করেছিলেন। তাদের ঔরসেই নকুল ও সহদেব নামে দুই যমজ সন্তানের জন্ম হয়। এ কারণে নকুল ও সহদেবকে আশ্বিনেয়ও বলা হয়

যম ও যমী : এরা যমজ ভাই-বোন। অসহ্য তেজ সহ্য করতে না পেরে উষাদেবী সংজ্ঞা তার স্বামী সূর্যকে দেখলে চোখ নামিয়ে ফেলতেন। এই জন্য সূর্য ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন সংজ্ঞা তাঁর চক্ষু বন্ধ করার জন্য প্রজাদের সংযমনকারী যম-কে প্রসব করবেন। মৃত্যু দেবতা যমকে প্রসবের পর অত্যন্ত ভীত হয়ে চপলভাবে সূর্যের দিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন সংজ্ঞা। তাঁর এই চপল চক্ষু দেখে সূর্য বললেন যে, তিনি চঞ্চলস্বভাবা একটি নদী প্রসব করবেন। এই অভিশাপেই যমী নামে কন্যার জন্ম দিলেন সংজ্ঞা। এই কন্যা যমুনা নামে প্রবাহিত হয়।

যমী একদিন যমকে বলে- ‘তোমার সহবাসের জন্য আ অভিলাষিনী,গর্ভাবস্থা হতে তুমি আমার সহচর। বিধাতা মনে মনে চিন্তা করে রেখেছেন যে,তোমার ঔরসে আমার গর্ভে আমাদের পিতার এক নাতি জন্মাবে।’ তবে যমীর সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন যম।

আইসিস ও ওসিরিস : মিশরীয় পুরাণে মাতৃত্ব, জাদু ও ঊর্বরতার দেবী হচ্ছেন আইসিস। আর ওসিরিস হচ্ছেন মৃত্যুপুরীর রাজা। এরা দুজনই যমজ ভাই-বোন। আকাশ দেবী নুট ও পৃথিবীর দেবতা গেবের মিলনে তাদের জন্ম। পুরাণে আছে, মাতৃজঠরে থাকতেই ওসিরিস তার বোন আইসিসকে ভালবাসতে থাকেন। পরবর্তীতে ওসিরিসকে বিয়ে করেন আইসিস। তাদের দুজনের মিলনে বাজপাখির মাথাবিশিষ্ট দেবতা হোরাসের জন্ম। অন্ধকার ও বিশৃঙ্খলারও দেবতা সেতের হাতে ওসিরিসের মৃত্যু হয়।

 

হুনাহপু ও এক্সবালেংখুয়ে : এই যমজ দেবতার কাহিনী মায়া পুরাণের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় । তাদের কাহিনী শুরু হয়েছে যমজ বাচ্চা ছেলের কাহিনী দিয়ে। তাদের নাম ছিল এক হুনাহপু এবং সাত হুনাহপু । তারা দুজন বিখ্যাত বল খেলতে ভালবাসতেন। খেলায় সবসময় তারাই জিততেন। জেতার পরে তারা জোরে জোরে চিৎকার করতেন। তাদের এই চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল নরক দেবতা এক্সিবালবার। প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে এক্সিবালবা নরকের দুটি দূত পাঠিয়ে হুনাহপু ভ্রাতৃদ্বয়কে ডেকে পাঠান। ষড়যন্ত্র করে এক্সিবালবা তাদের দুজনকেই হত্যা করেন।

এক হুনাহপুর একটি কন্যাসন্তান জীবিত ছিল। যথাসময়ে তার যমজ সন্তানের জন্ম হল। তাদের নাম রাখা হল এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু। বাবা ও কাকার মতই তারা ভাল বল খেলোয়াড় ছিল। তবে তাদের তুলনায় বেশি বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী ছিল এক্সবালাংখুয়ে ও হুনাহপু । বাবা-কাকার মতো এরাও খেলার সময়ে প্রচন্ড জোরে চিৎকার করতেন। এতে বিরক্ত নরক দেবতা এক্সিবালবা তাদের দুজনকেই ডেকে পাঠালেন। নরকের উদ্দেশে যাত্রার আগেই দুই ভাই মায়ের কাছ থেকে তাদের বাবা-কাকার ভুলগুলি জেনে নিয়েছিল। এক্সিবালবা দুই ভাইকে যতগুলি পরীক্ষা নিল তার সবগুলিতেই উত্তীর্ণ হল তারা।

প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এক্সিবালবা তাদের কাঠের বেঞ্চিতে বসার আদেশ দিলে তারা সুকৌশলে সে আদেশ অমান্য করল। হুনাহপু এবং এক্সিবালেংখুয়ে নরকদেবকে বলল, তারা খেলতে এসছে, বসতে আসে নি। নরক দেবতা কি ওদের সাথে হেরে যাবার ভয়েই খেলতে চাইছেন না? এক্সিবালবা দুই ভাইয়ের এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথা শুনে ক্ষেপে উঠলো। ক্ষিপ্তস্বরে সে দুই ভাইকে বলল ,না, তিনি ভয় পান নি। এবার খেলতে বসা যাক।

এক্সিবালবা জানত সঠিকভাবে খেললে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে সে জিততে পারবে না। আর দুই ভাইয়েরও এটা জানা ছিল , তারা জিতলে নরক থেকে জীবন্ত ফিরতে পারবে না না। তাই চালাকি করে তারা হারার জন্য খেলতে শুরু করল। ফলে এক্সিবালবা সহজেই জিতে গেল । বেশ কয়েকটি খেলার পর অবশেষে দুই ভাইয়ের সাথে নরকদেবের চূড়ান্ত খেলা শুরু হল। প্রত্যেকটা ম্যাচে হারতে আর ভাল লাগছিল না দুই ভাইয়ের। আর তাই তারা শেষ ম্যাচে জিতেই গেল। এক্সিবালবা বুঝলেন, দুই ভাই তার সাথে প্রতারণা করেছেন। তারা সব ম্যাচেই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হেরেছেন তাও বুঝতে পারলেন। তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে দুই ভাইকে এক বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিতে বললেন। দুই ভাই তাতে ঝাঁপ দিতে সম্মত হলেন। তাতে দুই ভাইয়ের মৃত্যু হল। তারপর নরকদেব তাদের ছাই রক্তের নদীতে ফেলে দিলেন। তিনি জানতেন না যে, এটাই ছিল দুই ভাইয়ের গোপন খেলা। দুই ভাইয়ের জানা ছিল যে, ওই নদীতে তাদের ছাই ফেললেই তারা আবার বেঁচে উঠবে। তবে মানুষ নয়, মাছ রূপে। সেই জন্য তারা ঝাঁপ দেওয়ার আগে মনে মনে গোপন মন্ত্র পড়ে নিয়েছিল। ফলে কাটলফিশের রূপে জীবন নিয়ে ফিরতে অসুবিধা হল না।

তাদের এমন চমকপ্রদ যাদু দেখে এক্সিবালবা চমকে গেলেন। তিনি দুই ভাইকে মাছের রুপ থেকে মনুষ্য রূপে ফিরিয়ে আনলেন। এরপর তিনি তাদের জীবন ফিরে পাওয়ার গোপন রহস্য জানতে চাইলেন। দুই ভাই তাকে সব খুলে বললেও আসল মন্ত্রের পংক্তিটি জানায়নি । তারা একটা মিথ্যা মন্ত্র আওড়িয়ে বলল, এই মন্ত্র পড়ে ঝাঁপ দিলেই নরক রাজাও তাদের মতো করেই ফিরে আসবেন। এক্সিবালবা তাদের কথা বিশ্বাস করে ওই বিশাল চুল্লিতে ঝাঁপ দিলেন। এর ফলে তার মৃত্যু হলো। তার ছাইকে মাটিতে পুঁতে ফেলল দুই ভাই। এর ফলে তার আর ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই রইল না।

পারস্যপুরাণ

আহুরমাজদা ও আহরিমান: প্রাচীন ইরানের জরত্থুস্ত্রবাদ অনুসারে আহুরমাজদা ও আহরিমান যমজ ভাই। আহুরমাজদা হলেন আলোর ঈশ্বর । আর আহরিমান হচ্ছেন আঁধারের প্রভু। আহুরমাজদা যা কিছু মঙ্গলের জন্য সৃষ্টি করতেন আহরিমান তাই ধ্বংস করতেন। এক সময়ে আহুরমাজদা ও আহরিমান পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। জরত্থুস্ত্রবাদ অনুসারে, ভাল ও মন্দের এ লড়াই ততদিন চলবে যতক্ষন পর্যন্ত না খারাপ দেবতা আহরিমান পরাজিত না হয়।






মন্তব্য চালু নেই