মেইন ম্যেনু

যশোর-খুলনা থেকে মাত্র ৩ ঘণ্টায় ঢাকা!

বহুল কাঙ্খিত পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ এখন চূড়ান্ত। সেতু উদ্বোধনের দিন থেকেই চলবে ট্রেন। আগামী জানুয়ারিত নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ২০১৮ সালের মধ্যে রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার এই রেলপথ প্রকল্পের ফেইজ-১ এর নির্মাণ কাজ শেষ হবে। এবং আগামী ২০২১ সালের মধ্যে যশোর পর্যন্ত দ্বিতীয় ফেইজের কাজ শেষ হবে। আর এ রেলপথটি সম্পন্ন হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে মাত্র ১৬৬.৩৩ কিলোমিটার। তাতে মাত্র ৩-৪ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে যশোরে যাওয়া যাবে। এই রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব ব্যয় ধরা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা ৬৯ পয়সা।

শনিবার পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প ফেইজ-১ (ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা) এর কাজ শুরুর স্থান গেণ্ডারিয়া রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শন শেষে এ তথ্য জানান রেলপথমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক।

চায়না সরকারের অর্থায়নে এই রেলপথটি নির্মাণ করা হবে। ইতোমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তাই আগামী বছরের জানুয়ারিতে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে ২০১৮ সালে জুনে রেলপথটি নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে বলেও জানান রেলপথমন্ত্রী। সেই সঙ্গে যেদিন থেকে পদ্মাসেতু দিয়ে যানবাহন চলবে সেই দিন থেকেই চলবে রেলও।

প্রাথমিকভাবে পদ্মা নদীর উপর সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল সরকার। ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) এ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন করে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তবে মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মাসেতুতে রেলপথ যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি পদ্মাসেতুর সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সে অনুযায়ী, সড়ক ও রেলপথ সেতুর নির্মাণের নকশা চূড়ান্ত করা হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে রেলওয়ের আওতায় আনার লক্ষ্যে ঢাকা থেকে পদ্মাসেতু দিয়ে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয় রেলওয়ে মাস্টার প্ল্যানে।

কিন্তু নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হলেও পদ্মায় রেল সংযোগের অর্থায়নের বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চিত ছিল রেল বিভাগ। তাই গত বছর অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেল মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে রেলওয়ের আওতায় আনার জন্য পদ্মায় সংযোগ ও রেলওয়ের চারটি জোন করার নির্দেশ দেন।

এক্ষেত্রে যাবতীয় অর্থায়নেরও আশ্বাস দেন তিনি। তাই প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্প-১ (ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা) এবং প্রকল্প-২ (ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর) নামের প্রকল্প গ্রহণ করে রেলকর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে প্রকল্প দু’টির সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে।

এতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এর মধ্যে প্রকল্প-১ আওতায় রাজধানীর গেণ্ডারিয়া থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর উপর দিয়ে মাওয়া হয়ে পদ্মাসেতু দিয়ে ফরিপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার এই রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে পদ্মাসেতু পর্যন্ত ৪৪ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, সেতুর উপর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার ও সেতু থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৩১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার রয়েছে। এতে কারিগরি সহায়তা করবে এডিবি।

ঢাকা থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত এই রেলপথে ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এর জন্য গত ২৪ মার্চ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

এদিকে পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য চায়না সরকার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি সহায়তা পাওয়া গেছে। তাই পদ্মাসেতু রেল সংযোগ প্রকল্প-১ এর নির্মাণ কাজ আগামী বছর জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০১৮ সালে জুনের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।

এছাড়া প্রকল্প-২ এর কাজ ২০১৭ সালে শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানায় রেল কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) সাগরকৃষ্ণ চক্রবর্তী বলেন, ‘পদ্মাসেতু রেল সংযোগের বিষয়টি অনেক আগেই চূড়ান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে ডিপিপি তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার এই রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এই রেলপথটি নির্মাণ করা হবে ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইনের।’

রেলওয়ে সূত্র জানায়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ মানুষ ও দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখবে এই রেল যোগাযোগ। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে রেল যোগাযোগ সমন্বয়ের মাধ্যমে বাণিজ্য ও সহযোগিতা ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

এতে বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের ৬ জেলায় বিদ্যমান দু’টি স্টেশন ছাড়াও নতুন ৬টি রেল স্টেশন স্থাপন করা হবে। এগুলো হলো- কেরানিগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও শিবচর। রেলপথটি নির্মাণে মোট ৩৬৫ দশমিক ১০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর মধ্য ২৭৩ হেক্টর ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ৯২ হেক্টর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ)।

প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ৪টি বড় ও ৫৬টি ছোট রেল সেতু নির্মাণ করতে হবে। ৫টি রেল ক্রসিংসহ ৪০টি পয়েন্টে আন্ডারপাসসহ জাতীয় মহাসড়কে ৩টি ফ্লাইওভার থাকবে। ঢাকা সিটি করপোরেশন, সিরাজদিখান, শ্রীনগর, লৌহজং, জাজিরা, শিবচর ও ভাঙ্গা উপজেলার প্রায় ৮৭টি মৌজার উপর দিয়ে এই রেলপথটি নির্মাণ করা হবে। এতে বেশকিছু আধা-পাকা বাড়িসহ স্থায়ী ভবন অপসারণের প্রয়োজন হবে। এছাড়া ছোট-বড় বেশকিছু সেতু নির্মাণের ফলে প্রকল্পটির পরিবেশগত সমস্যার উদ্ভব হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রকল্পটির ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় এডিবি ও সরকারের গাইড লাইন অনুসরণ করা হবে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া সম্ভাব্য রুট নির্ধারণের জন্য সমীক্ষার সময়ে ৩টি তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করা হয়। এর মধ্যে সমীক্ষা-১ কে অধিক গ্রহণযোগ্য বলে সুপারিশ করা হয়েছে। কারণ হিসেবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জানায়, সমীক্ষা-১ অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রেলপথটি লাভজনক হবে। দ্রুত অর্থায়ন পাওয়া গেলে আগামী বছর প্রকল্পটি চূড়ান্ত করা যাবে।

ভাঙ্গা থেকে জাজিরা পর্যন্ত রেলপথ ২০২০ সালের মধ্যেই চালু করা সম্ভব হবে। তবে রাজধানী থেকে পদ্মা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ২০২২ সাল লাগতে পারে। প্রকল্প দু’টি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় হবে ১৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ব্যয় হবে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, পদ্মাসেতুর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল সংযোগ স্থাপনে পাচুরিয়া-ফরিদপুর-পুকুরিয়া-ভাঙ্গা ৬০ কিলোমিটার রেলপথ এরই মধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গা-যশোর রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপন হবে। তখন চার-পাঁচ ঘণ্টায় এ পথে খুলনা থেকে ঢাকা আসা যাবে।

বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের জনগণকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ ঘুরে রেলপথে রাজধানীতে আসতে হয়। তাই রেলপথটি নির্মাণ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী ও দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রখবে বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।

এদিকে রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ স্থাপন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি। এটি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রেলওয়ের জন্য সাশ্রয়ী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প দুটি দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই চলছে কাজ।’






মন্তব্য চালু নেই