মেইন ম্যেনু

যেভাবে তরুণদের মগজ ধোলাই করে আইএস

বিশ্বব্যাপী ভয় আর সংকটের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা মধ্যপ্রচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস), যারা অল্পবয়সী শিক্ষিত তরুণের দলে নিতে বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে আসছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের ফাঁদে পা দিয়ে অনেকেই আইএসে যোগ দেওয়ার জন্য নিজের দেশ ছাড়ছেন। তরুণদের এই আচরণ যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

কিন্তু কীসের টানে এসব তরুণরা যুদ্ধে যোগ দিতে যাচ্ছেন, কীভাবে তাদের মগজ ধোলাই করছে আইএসের মতো সংগঠনগুলো তা বোঝার চেষ্টা করেছেন নিউইয়র্ক টাইমসের রুকুমিনি ক্যালিমাছি।

সম্প্রতি রুকুমিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ২৩ বয়সী এক তরুণীর (ছদ্মনাম অ্যালেক্স) সঙ্গে কথা বলেছেন। যিনি আইএসের অনলাইন দাওয়াতকারীদের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যোগাযোগ রেখেছেন।

কীভাবে আইএস অনলাইনে সদস্য সংগ্রহ করে, কীভাবে নতুন সদস্যদের আকৃষ্ট করে তার বর্ণনা দিয়েছেন অ্যালেক্স। আইএস তাকে অনলাইনে যেসব মেসেজ পাঠিয়েছে, যেসব জিনিস পড়তে দিয়েছে এবং যে পদ্ধতিতে তার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে তার সবকিছুই নিউইয়র্ক টাইমসের ওই সাংবাদিককে দেখিয়েছেন অ্যালেক্স।

আল কায়েদা আর আইএস আলাদা সংগঠন হলেও তাদের নতুন সদস্য সংগ্রহের কৌশল অনেকটাই একরকম। আল কায়েদার আরবী থেকে ইংরেজী অনুবাদের একটি ম্যানুয়েল অনলাইনে পাওয়া যায়। আইএস যে কৌশলে সদস্য সংগ্রহ করে, তার অনেক কিছুই আল কায়েদার ম্যানুয়েলের সঙ্গে মিলে যায়। আর এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ব্যাপক উত্থানের কারণে সারা বিশ্বেই সদস্য সংগ্রহ করা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে।

অ্যালেক্সের দেওয়া বর্ণনার বরাতে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, আইএসের সদস্য সংগ্রহকারীরা এই সামাজিক মাধ্যমেই প্রথম অ্যালেক্সের সঙ্গে পরিচিত হয়। ধীরে ধীরে তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে থাকে। তারা অ্যালেক্সের সঙ্গে শুরুতে ইসলাম নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। এবং তাকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয় যে, পশ্চিমা মিডিয়াগুলো আইএসের গণহত্যাকে যেভাবে উপস্থাপন করছে, আইএস আসলে তেমন নয়।

তবে এখানে আল কায়েদা ও আইএসের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। আল কায়েদা সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক থাকে। কিন্তু আইএস মুক্তভাবে অনলাইনে সদস্য সংগ্রহের চেষ্টা করে। আইএস আবার নারীদের টার্গেট করে, যাতে সিরিয়া ও অন্যান্য জায়গায় তাদের ‘যোদ্ধাদের’ সঙ্গে এসব নারীদের বিয়ে দিতে পারে।

কোনো আগ্রহী তরুণ-তরুণীকে কীভাবে আইএস নিজেদের দলে টানে, তার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার বর্ণনা পাওয়া যায় আইএসের ম্যানুয়েলে।

হতাশ ও কম ধর্মপ্রাণ তরুণদের প্রধান্য

নতুন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আল কায়েদার ম্যানুয়েলে বলা হয়েছে, ‘ধর্মীয় মানুষদের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নইলে তারা আপনার দাওয়াত গ্রহণ করবে না, যেটা আমাদের ব্যর্থতার কারণ হবে।’

তবে আল কায়েদা যেমন ধর্মীয় মানুষদের টার্গেট করেছে, কিন্তু আইএসের কৌশল আবার ভিন্ন। আইএস এমন সব মানুষকে টার্গেট করে যারা বিপন্ন অবস্থায় আছে। একই সঙ্গে যারা জীবন নিয়ে খুবই হতাশ কিংবা যারা ইসলাম সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে না তাদের টার্গেট করে আইএস। তাদেরকে দলে টানা এবং আইএসের মতবাদ মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া অনেক সহজ বলে মনে করা হয়।

আইএস কম ধর্মপ্রাণ মুসলিম তরুণদের অগ্রাধিকার দেয়। তাদের ম্যানুয়েলে বলা হয়েছে, ‘কারণ আপনিই তাদের গাইড করবেন এবং আপনিই নির্ধারণ করবেন আপনার ব্রিগেডে কাকে কাকে নেবেন।’

বড় শহর থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থী

জিহাদিরা বড় বড় শহর থেকে বিচ্ছিন্ন তরুণদের টার্গেট করে। কারণ এ রকম বিচ্ছিন্ন তরুণদের মনে প্রাকৃতিকভাবেই ধর্মের প্রতি একটু ঝোঁক থাকে। তাই তাদেরকে একটু বুঝিয়ে অনায়াসেই নিজেদের ছাঁচে ফেলা যায়।

হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক টার্গেট

আইএস এর ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এমন একটা জায়গা যেখানে শিক্ষার্থীরা চার-পাঁচ-ছয় বছর কাটায়। এখানে প্রচুর তরুণ পাওয়া যাবে যাদের প্রচুর উৎসাহ আছে। আবার একই সঙ্গে এখানে সরকারবিরোধী শিক্ষার্থীও পাওয়া যাবে অনেক। তবে আপনাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে, কারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচুর গোয়েন্দাও থাকতে পারে।’

‘হাইস্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন তরুণ, অল্প কদিন পরই তারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাবে। তাই আপনি যদি এখনই তাদের দাওয়াত না দেন, তাইলে অন্য কেউ দিয়ে ফেলতে পারে। এসব কাজে তাড়াহুড়ো করা যাবে না। কারণ অতিরিক্ত তাড়াহুড়োর কারণে পুরো প্রক্রিয়াটাই ভেস্তে যেতে পারে। হাইস্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে গুণগুলো আছে সেগুলো হচ্ছে:

১. তাদের একটা নিষ্পাপ মন থাকে।

২. তাদেরকে দাওয়াত দেওয়াটা তুলনামূলক সোজা। কারণ প্রাথমিক দাওয়াতের পর তারা স্পাই বা গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করে না।’

সুক্ষ্ণভাবে দাওয়াত, যাতে সে ভয় না পায়

ম্যানুয়ালে বলা আছে এভাবে- ‘পরিচয়ের শুরুতে মুসলমানদের সামগ্রিক সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলার সময় খুব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাতে আপনি তাকে দলে টানছেন, এটা তিনি কিছুতেই বুঝতে না পারেন। বরং এক পর্যায়ে গিয়ে তিনি নিজে নিজেই বলবেন আমাদের সঙ্গে এসব কী হচ্ছে! আমি আপনার দলে যোগ দিতে চাই। আর কখনোই তাড়াহুড়ো করা যাবে না। সবকিছুরই নির্দিষ্ট ও উত্তম সময় আছে।’

‘পরিচয়ের প্রথম দিকে আল কায়েদা, সালাফি জিহাদি অথবা অন্য কোনো জিহাদি গ্রুপ নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। কিন্তু দাওয়াতকারী অবশ্যই মুজাহিদীন এবং বিরোধী পক্ষ নিয়ে প্রাথমিক ধারণা দেবে। কারণ, হতে পারে আগ্রহী তরুণ মুজাহিদীন সম্পর্কে কৌতুহলী হবে কিন্তু মিডিয়া, বিশেষ করে আল কায়েদা এসব মুজাহিদীনদের ইমেজ নষ্ট করে ফেলেছে।’

জিহাদি মতবাদ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে ধীরে ধীরে

ম্যানুয়াল বলছে- প্রতিদিন তাকে (আগ্রহী সদস্য) সময় দিতে হবে। প্রতিদিন অন্তত একটি লেকচার, কিছু বই ও প্রচারপত্র দিতে হবে, যাতে এগুলোই তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে উঠে।

আইএসের ম্যানুয়ালে আগ্রহী সদস্যদের ইসলামিক বই ও সিডি সরবরাহ করার কথা বলা আছে। এমনকি কোন কোন বই ও সিডি দিতে হবে তার তালিকাও বলা দেওয়া আছে।

দাওয়াতকারীকে শুরুতেই জিহাদি ভিডিও না দেখাতে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। যখন কোনো সদস্যের বিশ্বাস চূড়ান্তে উঠবে তখনই তাকে এসব ভিডিও দেখানোর কথা বলা হয়েছে। কারণ ওই সদস্যটি তখন এসব ভিডিও দেখলে তেমন কিছু করতে মন থেকে সাড়া পাবে।

মুসলমানদের চলমান দুর্দশার বর্ণনা

ম্যানুয়ালে দাওয়াতকারীদের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তারা যাতে উদাহরণ হিসেবে চলতি কোনো ঘটনা বা ভয়াবহ কোনো ঘটনার বর্ণনা দেন। যেমন গাজা অধিগ্রহণ এবং এর ফলে মুসলমানদের যে দুর্দশা হয়েছে, ইসলামিক প্রেক্ষাপটে তার বর্ণনা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘অধিকাংশ কথাই বলতে হবে ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে। কারণ এ বিষয়টিতে বিশেষজ্ঞ ও মুসলমানদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই এবং মুসলমানদের মনে ফিলিস্তিন একটা আবেগের জায়গা।’

আগ্রহীর সব চাহিদা পূরণ করতে হবে

ম্যানুয়ালে বলা হয়েছে, ‘তার সব চাহিদা পূরণ করতে হবে। এমনকি তিনি (আগ্রহী তরুণ) যখন হারাম কোনো কাজ করবেন, তখনও তার সঙ্গে ভালো ব্যাবহার করতে হবে। ভালো ব্যবহারের মাধ্যমেই তার ভুল ধরিয়ে দিতে হবে। কারণ ভালো ব্যাবহারকারীদের মানুষ সবসময় মনে রাখে। তার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা পেতে বেশি বেশি তার কথা শুনতে হবে। তার ভালো এবং খারাপ সময়ে তাকে সঙ্গ দিতে হবে।’

বারবার বেহেশতের কথা মনে করিয়ে দিতে হবে

‘তার সামনেই তার ভালো গুণগুলোর প্রসংশা করতে হবে এবং তার এসব ভালো গুণগুলোর সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক দেখাতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তার এসব ভালো গুণগুলো ইসলামের প্রচারে কাজে দেবে। তাকে সবসময় বেহেশতের অবর্ণনীয় সুখের জীবনের কথা মনে করাতে হবে। কিন্তু জাহান্নামের সীমাহীন কষ্টের কথা তার সামনে বেশি বেশি বলা যাবে না।’

জিহাদ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া

যখন আপনার (দাওয়াতকারী) কথায় তিনি পুরোপুরি আশ্বস্ত হয়ে যাবেন, তখন সে নিজেই জিহাদ ও শহীদ সম্পর্কিত হাদিস ও কোরআনের আয়াতগুলো জানতে চাইবেন। কেউ যখন তার গুণাহ ও শাস্তি সম্পর্কে ভয় পাওয়া শুরু করবেন এবং জানতে পারবেন যে জিহাদ করলেই তিনি কেয়ামতের দিন এসব গুনাহ থেকে মুক্তি পাবেন, তখনই সে জিহাদ সম্পর্কে ইসলামে কী বলা আছে তা জানতে চাইবেন। এ ধাপে ওই সদস্যটি যাতে সারাক্ষণ কোরআন আর হাদীস পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সদস্যদের মধ্যে দ্বিধার সৃষ্টি করা যাবে না

সদস্যদের মধ্যে যাতে কোনো বিষয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি না হয়, দাওয়াতকারীকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ম্যানুয়ালে যেভাবে বলতে পরামর্শ দেয়া আছে:

‘আমাদের অনেক মুজাহিদীন ভাই বড় কোনো অপারেশনের স্বপ্ন দেখছেন। মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি আরও বাড়তে পারে। এ সুযোগেই জিহাদের কথা সুস্পষ্টভাবে তার সামনে বলতে হবে এবং মুজাহিদিনদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে কিংবা তাদের কোনো ভিডও দেখাতে হবে, যাতে সে মুজাহিদিনদের ভালোবেসে ফেলে। ’

‘অথবা তাকে মুজাহিদিনদের উপর নির্মিত কোনো ডকুমেন্টারি দেখাতে হবে। যেমন ইরাকে জিহাদের উপর ডকুমেন্টারি। মুজাহিদিনদের জীবন ধারণ কেমন, তা দেখাতে হবে। মিডিয়াগুলো জিহাদ নিয়ে যেসব খবর প্রচার করছে, জিহাদকে যেভাবে উপস্থাপন করছে, মিডিয়াগুলো হিপোক্রেসিগুলো তার সামনে তুলে ধরতে হবে।’

-বিজনেস ইনসাইডার অবলম্বনে






মন্তব্য চালু নেই