মেইন ম্যেনু

যেভাবে শুরু হয়েছিল কবর দেয়ার রীতি

প্রায় ১২ হাজার বছর আগে ইসরায়েলে রহস্যময় এক মৃত নারীর সম্মানে একটি ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। ভোজের অনুষ্ঠানে আগত লোকজন অদ্ভূত সব জিনিস দিয়ে ওই নারীর সমাধিটি পূর্ণ করে দেয়। এরপর ঘটে আরো আশ্চর্যজনক একটি ঘটনা। লোকজন তাদের খাবারের অবশিষ্টাংশ সমাধিটির দিকে ছুড়ে মারতে থাকে।

সম্প্রতি ইসরায়েলের হিলাজোন তাছতিত গুহায় ওই ভোজসভার এবং ভোজসভায় অংশ নেয়া লোকদের মৃতদেহের কিছু অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। এর আগেও সেখানে মানবদেহের বিভিন্ন অংশ পাওয়া গিয়েছিল। ওই গুহায় বিভিন্ন জিনিসের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার পর থেকেই তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আসছে প্রত্মতত্ত্ববিদরা। সেই নারীর ভোজসভার পরের ঘটনাগুলো কী ঘটেছিল তাও নির্ণয় করতে সমর্থ হয়েছে তারা। তাদের আবিষ্কারটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘কারেন্ট এনথ্রপোলজি’।

প্রত্মতত্ত্ববিদদের মতে, হিলাজোন তাছতিত গুহায় যে দলটির অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে সেগুলো নাচুফিয়ান সংস্কৃতির লোকজনের। ধারণা করা হয়, ১৫ হাজার থেকে ১১ হাজার ৫০০ বছর আগের সময়ের মধ্যে লেভেন্ট অঞ্চলে বাস করতো তারা। লেভেন্ট অঞ্চল বলতে সাইপ্রাস, মিশর, ইরাক, সিরিয়া, ইসরায়েল, জর্দান, লেবানন, ফিলিস্তিন এবং তুরস্ক এলাকাকে বোঝায়। এই এলাকায় লোকেরা তখন দলবদ্ধভাবে বসবাস করতো এবং কৃষিযুগের সূচনার আগেই সেখানে তারা স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিল।

ওই সময়ের সবচেয়ে অস্বাভাবিক বিষয়টি হচ্ছে: মানবজাতির বেশিরভাগ লোকই তখন শিকারজীবী দলে একত্রিতভাবে বাস করতো এবং তারা একস্থান থেকে অপর স্থানে ঘুরে বেড়াতো। এসব দলের মধ্যে নাচুফিয়ানরাই প্রথম মরদেহ সমাধিস্থ করার একটা নির্দিষ্ট কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছিল।

গত আট বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেম’র গবেষক লিওরে গ্রসম্যান। তিনি বলেন, ‘সেই সময়ে এই প্রথম নিয়মতান্ত্রিকভাবে মৃতদেহ সমাধিস্থ করার সূচনা হয়।’ গবেষকদের মতে, এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত মৃতদের ভোজসভার মধ্যে হিলাজোন তাছতিতের ভোজসভাটিই ছিল সবচেয়ে ব্যাপক এবং সবচেয়ে প্রাচীন।

ভোজসভার খাবারের মেনুতেও ছিল উল্লেখযোগ্য কিছু খাদ্য। এর মধ্যে মাছ, পাহড়ি হরিণের মাংস, লাল শেয়াল, সাপ এবং খরগোশসহ আরো কিছু জিনিস। এছাড়া ভাজা কচ্ছপও পছন্দের খাদ্যের মধ্যে ছিল তখন। সেখানে প্রায় ৮০ রকমের খাবারের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। এগুলোর ওজন ২০ কেজির মতো। এতে বোঝা যায়, ভোজসভায় অনেক লোকই উপস্থিত ছিল। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় সম্ভব না।

গ্রসম্যান এবং তার সহকর্মী যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাটালি মনরো তাদের গবেষণায় দেখেন, অন্তেষ্টিক্রিয়া এবং ভোজের অনুষ্ঠানকে পরিকল্পনা মাফিক কমপক্ষে ছয় পর্বে ভাগ করা হয়েছিল। ওই নারীকে কবর দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে নাচুফিয়ানরা কবর তৈরির জন্য গুহার মেঝে খনন করে। এরপর কবরের ভেতরে চুনাপাথর দ্বারা নির্মিত বৃহৎ একটি পাত্র রাখে এবং অদ্ভূত বিভিন্ন বস্তু দিয়ে সেটাকে ভরিয়ে দিয়। এসব বস্তুর মধ্যে ছিল পুরুষ হরিণের শিং, পোড়া মাটির খণ্ড, তিন অথবা তার চেয়ে বেশি কচ্ছপের খোলস এবং খোলসের আরো কিছু টুকরা। পরে তারা ছাই দিয়ে বাকি অংশ পূর্ণ করে দেয়।

চতুর্থ পর্যায়ে গিয়ে ওই নারীর মৃতদেহটিকে বসিয়ে কবরে সমাহিত করা হয়। এরপর বন্য শূকরের সামনের দিকের পা এবং আরো কিছু কচ্ছপের খোলস তার মাথার নিচে রাখা হয়। এছাড়া ওই সমাধিতে আরো অনেক স্বাভাবিক জিনিসও পাওয়া গেছে। সবচেয়ে অদ্ভূত জিনিসটি ছিল একটি ‘জোড়া লাগানো পা’, যা অন্য কারো দেহ থেকে মৃতদেহে জোড়া দেয়া হয়েছিল। অন্য কবরগুলোতে তেমন কোনো অস্বাভাবিক জিনিস দেখতে পাওয়া যায় না।

পঞ্চম পর্যায়ে চলত ভোজের অনুষ্ঠান। লোকজন তাদের খাবারের অবশিষ্টাংশ কবরে ছুড়ে দিত এবং এটি ঢেকে যেত। প্রাচীন মানুষের মধ্যে সাধারণত কবর বা এই জাতীয় বিষয়গুলো নিয়ে ভয় কাজ করতো। তবে কবরে খাবারের অবশিষ্টাংশ ছুড়ে দিতে তারা মোটেও ভয় পেত না। ষষ্ঠ পর্বে এসে নাচুফিয়ানরা বড় একটি ঢাকনা দিয়ে মৃতদেহটি ঢেকে দিত। ঢাকনাটির ওজন হতো সাধারণত ৭৫ কেজি। নাচুফিয়ানদের সময়ের আবিষ্কৃত জিনিসগুলোর মধ্যে এই ঢাকনাটি ছিল সবচেয়ে ভারী কোনো জিনিস।

ভোজের অনুষ্ঠানটি হতো খুবই বিশাল আকারের। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতো ভোজের বিভিন্ন জিনিসপত্র সংগ্রহের কাজ। তবে ওই নারীকে কেন এরকম একটি বিশেষ প্রকৃতির কবরের মধ্যে সমাহিত করা হলো- তা নিশ্চিত বলা যায় না। পাশের অন্য কবরগুলো ছিল সাধারণ ধরনের কবর। সেগুলোতে ওই নারীর কবরের মতো এতো সাজসজ্জা করা হয়নি। ধারণা করা যেতে পারে, ওই নারী তাদের সম্প্রদায়ের বিশেষ কেউ ছিল।

নাচুফিয়ানদের কবর দেয়ার রীতি প্রমাণ করে, তাদের সামাজিক সম্পর্কটি ছিল খুব উন্নত মানের। কারণ তাদের অনুষ্ঠানগুলোতে অনেক লোককে আমন্ত্রণ জানানো হতো। অন্য শিকারজীবী দলগুলোও পরে নাচুফিয়ানদের কাছাকাছি এসেছিল এবং তাদের কাছ থেকে ‘নিয়মতান্ত্রিক’ পদ্ধতিতে কবর দেয়ার রীতিটি আয়ত্ত্ব করেছিল। তবে নাচুফিয়ানরাই প্রথম কবর দেয়ার নিয়মতান্ত্রিক এই রীতিটি অনুসরণ করেছিল বলে ধারণা গবেষকদের।






মন্তব্য চালু নেই