মেইন ম্যেনু

যে কারণে এইডসের ওষুধ ব্যর্থ হচ্ছে

এইডস রোগের জন্য দায়ী এইচআইভি (HIV, Human Immunodeficiency Virus ) নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে অনেক আগে থেকেই। ১৯৮১ সালে শনাক্ত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি লোক মারা গেছে এই ঘাতক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। ৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কারের পরও এ নিরাময়ের কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, প্রতি বছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে ৪০ লাখ মানুষ। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা কেন নাকানিচুবানি খাচ্ছেন এই ভাইরাসটির প্রতিষেধক বা ভ্যাক্সিন বের করতে?

শুনলে হয়তো অবাক হবেন, আর কিছুই নয়- এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, আনুবীক্ষণিক ভাইরাসগুলো আমাদের সঙ্গে খেলছে ‘মিউটেশন এবং প্রাকৃতিক নির্বাচনের’ মাধ্যমে ঘটানো বিবর্তনের এক ভয়াবহ লুকোচুরি খেলা।

বিজ্ঞানীরা একে মোকাবিলা করার জন্য যে-ই না একটা ওষুধ প্রয়োগ করছেন সেই তারা (এইচআইভি) বিবর্তিত হয়ে নতুন রূপে দেখা দিচ্ছে। নতুন নতুন ওষুধগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে। এই লুকোচুরির ব্যাখ্যা করতে গেলে আগে আমাদের একটু বিবর্তনবাদ নিয়ে জানতে হবে-

কোনো জীবের টিকে থাকা নির্ভর করে তার নিজস্ব গোষ্ঠীর মধ্যে বেশি পরিমাণে ধরন বা ভিন্নতা সৃষ্টির মাধ্যমে। জীবন সংগ্রামে যেসব ধরন জীবকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকতে সুবিধা দেয়, সেইসব জিনের অধিকারী জীবগুলো বড় হওয়া পর্যন্ত টিকে থাকে। আর অন্যদিকে যারা পরিবেশের সঙ্গে কম খাপ খাওয়াতে পারে তারা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যায়। এটাই সংক্ষেপে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মূল কথা।

অন্যদিকে জিনের মধ্যে বিভিন্ন সময় আকস্মিক কিছু পরিবর্তন ঘটে যায়। আর একেই বলে পরিব্যপ্তি বা মিউটেশন। এই মিউটেশন কিন্তু প্রাণীর প্রয়োজনে ঘটে না, ঘটে একেবারেই বিক্ষিপ্ত ও এলোমেলোভাবে। অঙ্ক করার সময় কখন আপনি আনমনা হয়ে ভুল করবেন, সেটা যেমন আগে থেকে বলা যায় না, তেমনি বংশবৃদ্ধি করার সময় আপনার জিনের কোন অংশটা কপি করতে ভুল হয়ে যাবে, সেটাও বলার উপায় নেই। কিন্তু এই মিউটেশনের ফলে যে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যগুলো তৈরি হয় তা দিয়ে যদি কোনো জীব বেঁচে থাকার জন্য বাড়তি কোনো সুবিধা পায়, তাহলে প্রাকৃতিক নিয়মেই সেগুলো টিকে যায়।

এখন আসা যাক বেটা এইচআইভির কাছে! এইচআইভি ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য এক ধরনের এনজাইমের দরকার হয়, যেটা মানুষের শরীরে থাকে না। শুধু ভাইরাসের কোষেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। ‘রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেস’ নামের এই এনজাইম খুবই দুর্বল ধরনের প্রাচীন এক পদ্ধতিতে তৈরী। আর সে কারণেই বংশবৃদ্ধির সময় সে জেনেটিক কোডগুলো থেকে সব সময় ঠিকমতো কপি বা প্রতিলিপি করতে পারে না। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের ভাইরাসগুলোর মধ্যে অনবরতভাবে অসংখ্য মিউটেশন ঘটতে থাকে। যে কারণে প্রতি নতুন প্রজন্মেই অসংখ্য রকমের নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ভাইরাসের উৎপত্তি হচ্ছে।

ফলে মানুষের শরীরের ভেতরে যে শুধু এই ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত হারে বংশবৃদ্ধি করছে তাই নয়, তাদের মধ্যে এই মিউটেশনের কারণে নতুন জাতের জন্ম নিচ্ছে অনেক বেশি হারে। আর এই বিবর্তনের কারণে তারা মানুষের শরীরে খেলতে থাকে এক অদম্য ভয়াবহ বিবর্তনের খেলা।

বিজ্ঞানীরা এইচআইভির প্রতিষেধক ওষুধ আবিষ্কার করেন রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেসের কাজে বাধা দিতে, যাতে তারা মানুষের ডিএনএর ভেতরে ঢুকতে না পারে। আবার আরেক রকমের ওষুধ তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে ভাইরাসগুলো যেন মানবদেহের কোষের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে।

কিন্ত এই ওষুধ দিয়ে আপাততভাবে এইডসের প্রকোপ অল্প কিছু দিনের জন্য কমলেও কয়েক মাস বা বছর ফুরালেই এইচআইভি ভাইরাসগুলো নিজের নতুন জাত তৈরি করে ওই ওষুধের প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে ফেলে। এতে ওষুধ অকার্যকর হয়ে পড়ে এবং প্রবল বিক্রমে ভাইরাস আবার ফিরে আসে।

কখন কীভাবে কোন আকস্মিক মিউটেশনের ফলে ভাইরাসগুলো কী রকমের বিবর্তন ঘটাবে তা আগে থেকে বলা মুশকিল! এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে এই যে, এইডসে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর পরিস্থিতি ও তার দেহের ভাইরাসের বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করে তারপর প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা ওষুধ তৈরি করতে হবে। তবেই রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হবে।

কিন্ত তা তো সম্ভব নয়। কারণ এটি হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন একটিমাত্র ভ্যাক্সিন প্রয়োগ না করে ভ্যাক্সিনের ককটেল প্রয়োগ করলে কেমন হয়! এ প্রক্রিয়ায় না কি সাফল্যও পাওয়া যাচ্ছে।






মন্তব্য চালু নেই