মেইন ম্যেনু

রক্তের অক্ষরে লেখা ছিল ‘আমি বাঁচতে চাই’

আজ ১৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এদিনে রংপুর টাউন হলে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন রংপুরের মানুষ। তখনও হলের ভিতর থেকে ভেসে আসছিল অসংখ্য নারীর করুণ আর্তনাদ। রঙ্গমঞ্চের গ্রিন রুমের সামনে থেকে কোনো এক যুবতী ‘পানি’ ‘পানি’ বলে চিৎকার করে ছটপট করছিল। এ সময় গ্লাস হাতে ছুটে এসেছিলেন শিখা সংসদের পিয়ন নির্মল রায়। এক ঢোকে পানি পান করে তৃষ্ণা নিবারণের আগইে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সেই যুবতী মেয়েটি। আর জ্ঞান ফিরে আসেনি তার। জানা যায়নি পরিচয়। সেদিন এই টাউন হল থেকে ৫০ জন বিবস্ত্র নারী উদ্ধার হয়। টাউন হলের এককোণে কম বয়সী একটি মেয়ে নিজের আঙ্গুল কামড়ে রক্তাক্ত করে সেই রক্তে দেয়ালে লিখেছিলেন “আমি বাঁচতে চাই”। কিন্তু পাকিস্তানি নরপশুদের অমানবিক অত্যাচারের চোট তাকে বাঁচতে দেয়নি।

এভাবেই একাত্তরের বেদনা ধুসর আজকের এ দিনটির কথা বর্ণনা করছিলেন রংপুর টাউন হল বধ্যভূমির সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন।

মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয়ের পতাকা হাতে নিজ শহরে আসা মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেন এই দিনে টাউন হলের পিছনে শিখা সংসদের কাছে ইঁদারার কাছে যান। বাতাসে লাশের গন্ধে তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়। তার মধ্যেই এগিয়ে উকি দিলেন ইঁদারার ভিতরে। কিন্তু যা দেখলেন তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। স্বপ্নেও ভাবেননি মানুষ এতটা নৃশংস হতে পারে হানাদারদের বুট বুলেটের আঘাত আর পাশবিক নির্যাতন। ইঁদারার ভিতরে পড়ে ছিল অগণিত মানুষের মৃতদেহ।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে আকবর হোসেন বলছিলেন, ‘আমি সেখান থেকে সরে আসি। এগিয়ে যাই কৃষি ফার্মের (বর্তমান শিল্পকলা একাডেমি হলের পিছনে চিড়িয়াখানায়) ঝোপ জংগলের দিকে। সেখানে তখন অজ্ঞাত পরিচয়ের বেশ কয়েকজনের পঁচা লাশ নিয়ে টানা হেঁচড়া করছিল কুকুর-শেয়াল। পুরো কৃষি ফার্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল নাম না জানা অসংখ্য শহীদদের মাথার খুলি। এসব দেখার পর আমি আর ঠিক থাকতে পারেনি। সরে এসেছিলাম ওই ক্যাম্পাস থেকে।’

পরদিন আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আবারও যান টাউন হলে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গলিত-অর্ধ গলিত-ছিন্ন ভিন্ন দেহাবশেষগুলো মাটি চাপা দিলেন তারা। ১৯ ডিসেম্বর সেখান থেকে সংগ্রহ করা হল ১৬৭ টি মাথার খুলি। পরে মাথার খুলিগুলো টাউনহলের পাশে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরির ভবনে রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের একটি কক্ষে স্থাপিত মুক্তিসেনানি সংস্থার অফিসে রাখা হয়। কিন্তু অত্যন্ত লজ্জাজনক যে, একদিন সেই খুলিগুলো চুরি হয়ে গেল। যা হতে পারতো মুক্তিযুদ্ধের স্মারক।’

আকবর হোসেন বলেন, ‘পরবর্তীতে বন্ধ করে দেয়া হয় সেই ঐতিহাসিক ইঁদারা। বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে জায়গা দেয়া হলো সেই বধ্যভুমি ব্যবহারের জন্য। এখনও সেখানে সংস্কৃতির চর্চা হয়, মহড়া হয় নাটকের। কিন্তু এ প্রজন্মের ওই সব তরুণরা জানে না তারা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানে না তাদের বিচরণ ক্ষেত্রের মাটির নীচে রয়েছে অসংখ্য নাম না জানা শহীদের দেহাবশেষ। ভরাট করা ইঁদারায় রয়েছে নিরাপরাধ মানুষের নর কঙ্কাল।’

রণাঙ্গনের আরেক এক সাহসী যোদ্ধা প্রবীণ সাংবাদিক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হল ঐতিহ্যবাহী রংপুর টাউন হল। সেই টাউন হলকেই মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদাররা বানিয়েছিল ‘গণনির্যাতন কেন্দ্র’। বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনা হতো নিরপরাধ মুক্তিকামী বাঙালি মানুষজনকে। যাদের একটি বড় অংশ ছিল কম বয়সী নারী। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধরে আনা সেই সব নারীদের উপরে দিনের পর দিন চলতো পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস এখানে পাকিস্তানি হায়েনাদের নজিরবিহীন গণধর্ষণ, গণনির্যাতন আর গণহত্যা চলেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় এখনও যেখানে কান পাতলে শোনা যায় শহীদী আত্মার করুণ আকুতি “আমরা বাঁচতে চাই! আমরা বাঁচতে চাই”।’

সরকারিভাবে এই বধ্যভূমিকে সংরক্ষণে সরকারকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুর টাউন হলে হত্যাযজ্ঞের কোনো অনুসন্ধান হয়নি। হয়নি শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ। বছর দুয়েক আগে রংপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্যোগে ইঁদারার স্থানটিকে চিহ্নিত করে সেখানে নামমাত্র একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই