মেইন ম্যেনু

রক্তের গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল শোকালিয়া !

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন শোকালিয়া ঈদের জামাতকে রক্তের গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার মহা পরিকল্পনা ছিল সন্ত্রাসীদের। সে মোতাবেক কাজ ও চলছিল । কিন্তু বাধা হয়ে দাড়ায় পুলিশ!! পরিকল্পনা মতো দেশের বিভিন্ন এলাকার ৫ জনের একটি দল ২৭ রমজানের দিন কিশোরগঞ্জে এসে অবস্থান নেয়। এরপর টানা তিনদিন তারা ঈদগাহ এলাকা রেকি করে। এ সময় তারা ঈদগাহে প্রবেশের জন্য শহরের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন সবুজবাগ এলাকার সড়কটিকে নিরাপদ রুট হিসেবে বাছাই করে। কিন্তু ঈদের দিন ভোর থেকেই সড়কটিতে পুলিশের নিরাপত্তা বলয় তাদের সে পরিকল্পনাকে তছনছ করে দেয়। মুসল্লিবেশে সকাল সাড়ে আটটার কিছু পরে বিদ্যালয় সংলগ্ন মুফতি মোহাম্মদ আলী (রহ.) জামে মসজিদ এলাকার সবুজবাগ সড়কে ওঠতে গিয়েই পুলিশের বাধার মুখে পড়ে তারা। ঈদগাহ প্রবেশের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সেখানেই কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। বোমা বিস্ফোরণে অন্তত পুলিশের ১১ সদস্য আহত হন। এ সময় আহত পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম (৩০) মুফতি মোহাম্মদ আলী (রহ.) জামে মসজিদের সড়কের উপর অবস্থিত টয়লেটে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলে সেখানেই তাকে চাপাতি দিয়ে কোপায় হামলাকারীরা। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হামলাকারীদের ধাওয়া করলে তারা সবুজবাগ এলাকার দু’টি বাসায় অবস্থান নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হয়। বন্দুকযুদ্ধে পুলিশের গুলিতে এক সন্ত্রাসী ঘটনাস্থলেই মারা যায়। তার পরিচয় জানা যায়নি।

এদিকে আহত পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কনস্টেবল জহিরুল ইসলামের মৃত্যু হয়। অন্য আহতদের মধ্যে কনস্টেবল আনছারুল হক (২৮), রফিকুল, প্রশান্ত, তুষার, জুয়েল, মতিউর ও এএসআই মতিউরের অবস্থার অবনতি ঘটায় তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে কনস্টেবল আনছারুল হককে ময়মনসিংহ সিএমএইচে নেয়ার পর সেখানে তার মৃত্যু হয়। নিহত দুই কনস্টেবলের মধ্যে কনস্টেবল (নং-১৪৭৬) জহিরুল ইসলাম ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে এবং কনস্টেবল (নং-১৪৩০) আনছারুল হক নেত্রকোনা জেলার মদন থানার দৌলতপুর গ্রামের সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে। অন্যদিকে পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে সবুজবাগ এলাকার ঝরণা রাণী ভৌমিক (৪৫) নামে এক গৃহবধূ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজ বাসাতেই মৃত্যুবরণ করেন। নিহত গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিক এলাকার ব্যবসায়ী গৌরাঙ্গ চন্দ্র ভৌমিকের স্ত্রী। অন্যদিকে বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে পুলিশ ও র‌্যাব অভিযান চালিয়ে হামলাকারী সন্দেহে তিনজনকে আটক করে।

আটককৃতরা হলো, দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট থানার রাণীগঞ্জ বাজার এলাকার আবদুল হাই-এর ছেলে শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিল (২০), কিশোরগঞ্জ শহরের তারাপাশা এলাকার মো. আবদুস সাত্তারের ছেলে জাহিদুল হক (২৪) ও শহরের বয়লা এলাকার আবদুল হাই এর ছেলে আহসান উল্লাহ (২৫)। তাদের মধ্যে শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিল গুলিবিদ্ধ অবস্থায় র‌্যাবের হাতে আটক হয়। তাকে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বন্দুকযুদ্ধের সময় পুলিশ হামলায় ব্যবহৃত একটি ধারালো চাপাতি ও একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে।

অন্যদিকে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, র‌্যাবের হাতে আটককৃত সন্ত্রাসী শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিলের কাছ থেকে দু’টি পিস্তল উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সন্ত্রাসী শরীফুল ইসলাম আবু মোকাতিল জানিয়েছে, শোলাকিয়ার ঈদজামাতকে টার্গেট করে তারা হামলার পরিকল্পনা করেছিল। এজন্যে পাঁচ সদস্যের একটি সন্ত্রাসীদল ২৭ রমজানের দিনই কিশোরগঞ্জে এসে অবস্থান নিয়েছিল। এই তিনদিন তারা ঈদগাহ এলাকাসহ প্রবেশপথ রেকি করে। অন্যদিকে পুলিশ হামলায় ব্যবহৃত চাপাতি ও একটি পিস্তল উদ্ধার করেছে।

এদিকে শোলাকিয়া ঈদগাহের পুলিশ চেকপোস্টে সন্ত্রাসী হামলা ও পুলিশ সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এ সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান বলেন, হামলায় পুলিশের দুই সদস্য নিহত হয়েছে। হামলাকারীদের একজন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। এছাড়া জানালা ভেদ করে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক নারীর মৃত্যু হয়ে। হামলাকারীরা অবশ্যই জঙ্গী। এর আগে পুলিশের সঙ্গে অভিযানে যোগ দেয় র‌্যাব ও বিজিবি। পরে পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথবাহিনী সবুজবাগ এলাকার বাসাবাড়িতে তল্লাশি চালায়।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের মাত্র ৩০০ গজ দূরত্বে অবস্থিত সবুজবাগ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মুহুর্মুহু গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটলেও শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে নির্বিঘ্নে উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদজামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে সন্ত্রাসী হামলার কারণে শোলাকিয়ার ঈদজামাতের নির্ধারিত ইমাম ইসলাহুল মুসলিহীন পরিষদের চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ হেলিকপ্টারযোগে সকাল নয়টার কিছু আগে কিশোরগঞ্জে এসে পৌঁছলেও তিনি সার্কিট হাউজ ময়দানে অবস্থান করেন। সকাল ১০টা ৫মিনিটে শুরু হওয়া জামাতে তার পরিবর্তে ইমামতি করেন হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আবদুর রউফ। তিনি ১০মিনিটের মধ্যে নামাজ ও খুতবা শেষ করেন। পরে মুসল্লিদের মাইকিং করে আজিমুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার দিক দিয়ে বের না হয়ে বিকল্প পথে বাড়ি ফেরার আহ্বান জানানো হয়।

এদিকে দুপুরে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদ জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাসসহ জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি নিহত গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিকের পরিবারকে সৎকারের জন্য ২০ হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই