মেইন ম্যেনু

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি :

রহস্য উন্মোচন হচ্ছে সাত দিনের মধ্যে

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় তদন্তে বড় অগ্রগতি হয়েছে। বলা হচ্ছে, আগামী সাত দিনের মধ্যেই রহস্য উন্মোচন হবে। আর এমন আশার বাণী শুনিয়েছেন মামলার তদন্ত দলের অন্যতম সদস্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অর্গানাইজড ক্রাইম টিমের বিশেষ পুলিশ সুপার মির্জা আবদুল্লা হেল বাকী।

বৃহস্পতিবার এ কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত প্রায় শেষ। ৫-৭ দিনের মধ্যেই রহস্য উন্মোচন করতে পারব। যে ধরনের বিষয় নিয়ে সিআইডির কাজ করা উচিত এটা সে ধরনেরই একটি মামলা। আর আমাদের টিমের কাজ হল অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ে কাজ করা। এ মামলাটিই সত্যিকারের একটি অর্গানাইজড ক্রাইম।’ তিনি বলেন, ‘তদন্তে দ্রুত অগ্রগতি আনতে আমরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্তত ৫০ জন কর্মকর্তাকে জেরা করেছি। ব্যাংকের কম্পিউটারগুলো থেকে তথ্য কপি (ইমেজিং) করেছি। আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের কাছে বিদেশী অপরাধীদের তথ্য চেয়ে চিঠিও পাঠিয়েছি। দেশীয় সন্দেহভাজনরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সে জন্য সব বন্দরে প্রয়োজনীয় মেজেস পাঠানো হয়েছে।’ এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর সিআইডির সাত সদস্যের তদন্ত দল বাংলাদেশ ব্যাংকে যায়।

পরিদর্শন শেষে এ দলের নেতৃত্বে থাকা সিআইডির ডিআইজি সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ইতিমধ্যে তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সেন্ট্রাল ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের মূল সার্ভারসহ হ্যাকড হওয়া কম্পিউটার ও প্রিন্টার জব্দ করেছে। সার্ভারের নিরাপত্তায় কী ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হতো সে বিষয়ে যেমন খোঁজ নেয়া হচ্ছে তেমনি নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের পুরো বিষয় যাচাই করা হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর ঘটনাটির তদন্তে মার্কিন তদন্ত সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) সহযোগিতা নেয়া হবে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুক্রবার (আজ) এফবিআইয়ের ঢাকা অফিসের প্রধান সিআইডি অফিসে আসবেন। এরপর তিনিসহ এফবিআইয়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সিআইডির একটি বৈঠক হবে। তারা চাইলে সহযোগিতা নেয়া হবে। তাদের কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ মতামতও জানতে চাওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা জানান, সাইবার অ্যাটাক হয়েছে ৪ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। এ সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওই সময় দায়িত্বে ছিলেন অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেট ডিপার্টমেন্টের ব্যাংক অফিস অব ডিলিং রুমের যুগ্ম পরিচালক ও মামলার বাদী জোবায়ের বিন হুদা, সুইফট শাখার সহকারী পরিচালক রফিক আহমেদ মজুমদারসহ প্রায় এক ডজন কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চইলে সিআইডির তদন্ত দলের অন্যতম সদস্য মির্জা আবদুল্লা হেল বাকী বলেন, ‘আমরা এখনও সন্দেহভাজনদের কোনো তালিকা তৈরি করিনি। তবে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি।’ তিনি বলেন, ‘শুধু ফরেন এক্সচেঞ্জ অফিস শাখার লোক নয়, এখানে যারা ইন্টারনেট লাইন দিয়েছেন তারাসহ কর্মরত আইটি বিশেষজ্ঞ এবং দেশী-বিদেশী কর্মকর্তাদের মধ্যে কার কোথায় কতটুকু সম্পৃক্ততা থাকতে পারে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ কাউকে সন্দেহের বাইরে রাখা হয়নি।’

সন্দেহভাজনদের পাসপোর্ট জব্দের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাসপোর্ট জব্দের প্রয়োজন হয় না। আমরা নির্দিষ্ট ব্যক্তির পাসপোর্ট নম্বর আমাদের সিস্টেমের মধ্যে মার্ক করে রাখি। এরপর সন্দেহভাজনরা দেশ ত্যাগের জন্য কোনো বন্দরে গেলে সেখান থেকে সিআইডির ক্লিয়ারেন্স নেই বলে ফেরত পাঠানো হয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কর্মকর্তার বিদেশ সফরের যাবতীয় তথ্য তদন্ত সংস্থা সংগ্রহ করেছে। সিআইডির এই মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কিছু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। কিন্তু ঠিক যখন অপরাধ সংঘটিত হয় সেই সময়কার ফুটেজ আছে কিনা তা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। এ বিষয়ে কাজ চলছে।’

সার্ভার ব্যবহারকারীদের তথ্য প্রসঙ্গে আবদুল্লা হেল বাকী বলেন, ‘সার্ভার ব্যবহারকারীদের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ওই রুমে কারা কারা প্রবেশ করেন, কারা কম্পিউটার ব্যবহার করেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, সার্ভারের ওই কক্ষে বাইরের কেউ আসেনি। নির্দিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারাই সার্ভার ব্যবহার করেছেন।’ জব্দ তালিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা বেশ কিছু কম্পিউটার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য কপি করে নিয়েছি। যাকে বলা হয় ইমেজিং। আশা করছি, এর মাধ্যমেই ঘটনার রহস্য উন্মোচন সম্ভব হবে।’ টাকা উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে এই তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা সরকারের বিষয়। তবে যে পদ্ধতিতে টাকা উদ্ধার সম্ভব সে বিষয়ে আমরা সরকারকে কিছু সুপারিশ করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘টাকা ৪টি অ্যাকাউন্টে গেছে। এই অ্যাকাউন্টধারী কারা সেটা ইতিমধ্যে সবার কাছে পরিষ্কার।’

ওই সময় পরিকল্পিতভাবে সফটওয়্যার অকার্যকর করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা মামলার উপসংহারে বলা যাবে। এখনও আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রিজার্ভের টাকা চুরিতে জড়িতদের তথ্য চেয়ে ইন্টারপোলে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইন্টারপোল থেকে সারা দুনিয়ায় তথ্য ছড়িয়ে যাবে। কারণ ইন্টারপোলের মাধ্যমে যে কোনো দেশ থেকে তথ্য পাওয়া বা কাউকে আটক করে আনা সম্ভব।’ মামলার তদন্ত দলের অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনাটি ৪০ দিন আগের। আমরা ৪০ দিন পর তদন্ত শুরু করেছি। খুন-ডাকাতির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে আলামত পাওয়া সহজ। সেখানে ডিএনএ টেস্ট করে অনেক কিছু বের করা যায়। কিন্তু এটা সাইবার অ্যাটাক। এ ক্ষেত্রে আমরা কিছু ফরেনসিক ডিভাইস ব্যবহার করে মুছে ফেলা তথ্য উদ্ধার করতে পারি। কিন্তু এখন এন্টি ফরেনসিক সফটওয়্যারও আছে। তাই এন্টি ফরেনসিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য মুছে ফেলা হলে তা উদ্ধার করা খুবই কঠিন।’ অপরাধীরা বাংলাদেশ ব্যাংকে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করেছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা এখনও নিশ্চিত নই।’ তিনি আরও বলেন, তদন্তে ডিলিং রুম, ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ, সুইফট কোড, আইটি সিকিউরিটি শাখা ছাড়াও বাইরের কিছু ক্লু ধরে এগোচ্ছেন তারা।

এ ছাড়া সূত্র বলছে, কয়েক মাস আগের একটি তথ্যকে গুরুত্বপূর্ণ ক্লু হিসেবে ধরা হয়েছে। তদন্ত করতে গিয়ে সংশ্লিষ্টরা ঘটনার পেছনের ওই ক্লু কাজে লাগাচ্ছেন। আর এ সূত্রই সিআইডিকে সত্য উদ্ঘাটনে কাছাকাছি নিয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত দলের একজন কর্মকর্তা জানান, সুইফট কোড ব্যবহার করে জিরো আওয়ারে রিজার্ভ স্থানান্তরের অ্যাডভাইসগুলো পাঠানো হয়েছিল। ৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টার কাছাকাছি সময়ে এ ঘটনা ঘটে। এরপর ছিল শুক্র ও শনিবার বাংলাদেশে সরকারি ছুটির দিন। আর রোববার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ছুটির দিন। ফলে পুরো তিন দিন হাতে সময় নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়। এ ছাড়া ঘটনার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোডের লেনদেন-সংক্রান্ত তথ্য প্রেরণকারী কম্পিউটারের প্রিন্টারটি সঠিকভাবে কাজ করছিল না। অর্থাৎ কোনোভাবে বিষয়টি যাতে ধরা না পড়ে সে ব্যাপারে চোরের দল আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে মোট ১০১ মিলিয়ন ইউএস ডলার চুরি হয়। যার মধ্যে শ্রীলংকার প্যান এশিয়া ব্যাংকিং কর্পোরেশনে পাচার হওয়া ২০ মিলিয়ন ডলার আটকানো সম্ভব হয়েছে। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ইউএস ডলার আটকানো সম্ভব হয়নি। ১০১ মিলিয়ন ডলার মানি লন্ডারিং বিষয়ে ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।

টাকা উদ্ধারের প্রস্তুতি : এদিকে ফিলিপাইনে মামলা করে টাকা উদ্ধারের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার ও আইনশৃংখলা বাহিনী। সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধারে ফিলিপাইনে মামলা করার বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার আলোচনা করেছেন তারা। বিষয়টি সরকারকেও জানানো হয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় মামলাটি হবে সেটা নির্ধারণের কাজ চলছে। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সিআইডি সরকারের পক্ষে এ মামলা করবে।

এ ছাড়া নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ফিলিপাইন সরকারের কাছে টাকা ফেরতের জন্য ক্লেম করা হবে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল হায়দার এ বিষয়ে যুগান্তরকে বলেন, ‘রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি টাকা উদ্ধারের বিষয়টিও আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। এ জন্য হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে সে দেশে গিয়ে মামলা করার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।’ দেশের টাকা দেশে ফেরত আনতে মামলা করা বুদ্ধিমানের কাজ বলেও জানান এ কর্মকর্তা। মামলা তদারকির সঙ্গে সম্পৃক্ত সিআইডির এ কর্মকর্তা বলেন, টাকা উদ্ধারের জন্য বিদেশের অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এসে মামলা করে। আর আমাদেরও সে সুযোগ রয়েছে। সেটা দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। এমনিতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই সিআইডি সবকিছু গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। যুগান্তর






মন্তব্য চালু নেই