মেইন ম্যেনু

‘রাইতে এক প্লেট ভাতও হইবো না’

মঙ্গলবার দুপুর ২টা। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি নিম্নবিত্ত পরিবারের গৃহিনীরা যখন পরিবারের জন্য নিজের রান্না করা খাবার পরিবারের সবাইকে খাওয়াতে ব্যস্ত, তখন সম্পূর্ণই ভিন্ন চিত্র হাইকোর্টের মাজারে। ক্ষুধার জ্বালা মিটাতে বিনামূল্যে দানকৃত খাবারের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায়, পথের পাশে ঠাঁই মেলা আটমাসের অন্তঃসত্ত্বা জেসমিন। তার স্বামী রাজ্জাকও পুরুষদের লাইনে দাঁড়িয়েছেন। খবর বাংলামেইলের।

দীর্ঘ লাইন অতিক্রম করে আধা ঘণ্টা পর খাবার মিলল জেসমিনের। তবে রাজ্জাক তখনও খাবার পাননি। কিন্তু স্বামীকে ছাড়া খেতে বসবেন না তিনি। তাইতো দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলেন সেখানে। অবশেষে খাবার সংগ্রহের যুদ্ধে জয়ী হলেন রাজ্জাক। সে সময় দু’জনের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো অমূল্য সম্পদ পেয়েছেন তারা।

খাবার সংগ্রহ শেষে হাইকোর্টের বারান্দায় খেতে বসেছেন দু’জন। তারা আলাদা বাটিতে আলাদা খাবার পেলেও জেসমিনের প্লেটেই একসাথে খাওয়া শুরু করলেন রাজ্জাক। এতে একটু বেশিই খুশি হলেন জেসমিন।

খেতে খেতে রাজ্জাক বলেন, ‘প্রতিদিন মাজারে ১শ থেকে দেড়শ মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেয়া হয়। আমরা ওইখান থেকেই খাবার নেই। তবে যেইদিন খাবার না দেয়, ওইদিন সমস্যায় পড়তে হয়। না খেয়েই থাকা লাগে। কাজ না থাকলে তো প্রতিদিন সকালে দুইজন না খেয়েই থাকি। গতকাল রাতেও না খাইয়া ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘কমলাপুর রেলস্টেশনে কুলির কাজ করলেও প্রতিদিন কাজ থাকে না। তবে আমি কাজ না থাকলে ভাঙ্গারি টোকাই। সেইখানেও ঝামেলা। মানুষ খারাপ মনে কইরা তাড়ায়ে দেয়, খারাপ ভাবে। সেইজন্যই ওই কাজে মন বসে না। কিন্তু আর কোনো কাজও তো পাই না। কয়েকদিন ধইরা কমলাপুরেও কাজ নাই। ঈদের ছয়দিন আগে থেইকা আজকে পর্যন্ত কাজ পাই নাই। তবে ভাঙ্গারি টোকাইয়ে যা পাই তাই দিয়া এখন চলি।

গতকাল রাইতেও তো টাকা ছিল না বইলা খাইতেই পারি নাই। তয় টাকা থাকলে রাস্তার পাশে ৪০ টাকায় এক প্লেট ভাত বেচে, ওইখান থেকে দুইজন কিনা খাই। কিন্তু আজকে পকেটে আছে ৩০ টাকা। এই টাকা দিয়া তো আর আজকে রাইতে এক প্লেট ভাতও হইব না। একটা চাকরি হইলে তো আর এমন কোনো সমস্যাই থাকতো না।’

এতোসব দুঃখের কথাগুলোর মধ্যেই হঠাৎ জেসমিন জানালেন তাদের ছেলে সন্তান হবে। ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানতে পেরেছেন তারা। কিন্তু ক্ষণিকের মধ্যে পরিবেশটা একটু পরিবর্তন হয়ে গেল। স্বামী রাজ্জাকের দিকে তাকিয়ে জেসমিন বললেন, ‘ছেলে হইলেও আমরা কিন্তু মেয়ে চাইছিলাম। ওর (রাজ্জাক) মেয়ের শখ আছিল। আমিও চাইছিলাম যাতে মেয়ে অয়।’ রাজ্জাকও জানালেন মেয়ে সন্তানই শখ ছিল তার। কিন্তু ছেলে সন্তান হলেও অখুশি নন তিনি। আল্লাহ যা দেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে চান দুইজন।

কুরবানিতে শ্বশুর বাড়িতে যাবেন জানিয়ে রাজ্জাক বলেন, ‘শ্বশুড়ের সাথে কথা হইছে। উনি কইছে কুরবানিতে ওইখানে যাইতে। শ্বশুড় বাড়িতেই আমাদের বাচ্চা জন্ম নিব ইনশাল্লাহ। শ্বশুড় আমাকে আশ্বাস দিয়া কইছে, চিন্তা করার কিছু নাই, তারা আমার সাথে আছে। তবে আমার বাপ আমার কোনো খোঁজ-খবরই নেয় না। অনেক আগে থেইকাই তার সাথে যোগাযোগ নাই।’

রাজ্জাক-জেসমিন দম্পতি দুইমাস ধরে হাইকোর্টের সামনের রাস্তার ফুটপাতে বাস করছেন। এরই মধ্যে বেশ কিছু বন্ধু হয়েছে তাদের। এদের মধ্যে একজন ফারুক। তিনি হাইকোর্টের ক্যান্টিনে কাজ করেন। বন্ধুত্বের খাতিরে মাঝে মধ্যেই রাজ্জাককে বিনামূল্যে খাবার দেন তিনি। ফারুক বলেন, ‘ওরা সমস্যায় আছে। তাই মাঝে মধ্যে ওদের খাবার দেই। আমি তো বলছি প্রতিদিন যাইতে। কিন্তু রাজ্জাক তো নিতে চায় না। খুব ঠেকলে যায় আমার কাছে। ওর একটু লজ্জা বেশি।’

বন্ধুর কাছ থেকে সাহায্য নিতে লজ্জা কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে রাজ্জাক বলেন, ‘আসলে ও (ফারুক) তো চাকরি করে ক্যান্টিনে। ওর মালিক দেইখা ফালাইলে তো আর ওর চাকরি থাকবো না। তখন তো ও নিজেও সমস্যায় পইড়া যাইবো। তাই যাই না ওইখানে খুব একটা। তবে খুব বিপদে পড়লে যাইতেই হয়।’






মন্তব্য চালু নেই