মেইন ম্যেনু

রাজনীতি এবং গণমাধ্যম

রাজনীতির সাথে গণমাধ্যমের নিবীড় সম্পর্ক রয়েছে। সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, অনলাইন পোর্টাল, রেডিও-টেলিভিশন তথা গণমাধ্যম রাাজনীতির প্রচার-প্রসারে সহায়ক হিসাবে কাজ করে থাকে। রাজনীতির বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা অতীতের চেয়ে বর্তমানে কয়েকগুন বেড়েছে বৈ কমেনি। বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।

আমাদের স্বাধীনতা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিরোাধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচী-কর্মকান্ডগুলো তৎকালীন গণমাধ্যমে প্রচারিত-প্রকাশিত হওয়ার কারনে আন্দোলনে ব্যাপকতা বেড়েছিল এবং গণমানুষের স্বতঃস্ফ’র্ত অংশগ্রহন বেড়েছিল। পাকিস্তান আমলে সরকার বিরোধী আন্দোলনগুলো যদি তৎকালীন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত না হতো তাহলে এত ব্যাপকতা পাওয়া যেতো না। পত্রিকাগুলো শুধু সংবাদই নয় পোষ্টার, হ্যান্ডবিল, লিফলেট, প্ল্যাকার্ডের ছবি পর্যন্ত ছাপিয়েছিল। ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙ্গালীদের চেতনাকে এই গণমাধ্যম অনেকদুর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বর্তমান বিশ্বে গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমে গনমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। সমাজের অসংগতি, অব্যবস্থাপনা নিরসন করে সুস্থ সমাজ-দেশ গঠন তথা জাতির চিন্তাধারা দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে জনমত গঠনে গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। রাজনীতিকে বিকশিত করার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

রাজনীতিতে সরকার দল এবং বিরোধী দলের অবস্থান থাকে। বিরোধী দলের মতো সরকারী দলও তার কর্মকান্ডকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে ব্যাকুল থাকে। সরকারের ইতিবাচক কর্মকান্ড গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় কিন্তু সরকারের গণবিরোধী নেতিবাচক কর্মকান্ড গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকলে সরকার তখন গণমাধ্যমের উপর বিরুপ মনোভাব প্রকাশ করার চেষ্টা চালায়। আর তখনি ঘটে বিপত্তি।

একপর্যায়ে সরকার তার দাম্ভিকতা-ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করতে শুরু করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে। আইন করে গণমাধ্যমের টুটি চেপে ধরতে চায় কিংবা টুটি চেপে ধরেও। গণতন্ত্রের কথা বলে ক্ষমতায় এসে সরকার তখন বাক স্বাধীনতা হরন করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠে। ’৭৩ এর প্রেস এন্ড পাবলিকেশন্স এক্ট গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছিল। আবার বিরোধী দল গণমাধ্যমের সহায়তাকে কাজে লাগিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করার সহজ সুযোগ পায়। বিরোধী দল গণমাধ্যমের মাধ্যমে গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করে। বেগবান করে এবং সফলতা অর্জন করে।

বর্তমানে গণমাধ্যমের ব্যাপক সুযোগ এর যুগে বহুল প্রচারিত একটি কথা রয়েছে প্রচারেই প্রসার। বিষয়টি শুধু পণ্য বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নহে। এটা জীবনের সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। গণমাধ্যম এর কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলো তার কর্মকান্ড কর্মসূচীকে ব্যাপক প্রচারের সুযোগ পাচেছ বিধায় বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে আমজনতা সহজেই ধারনা লাভ করতে পারছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মসূচী ঘোষনা করার সাথে সাথেই জনগন গণমাধ্যমের কল্যানে জানতে পারছে।

জনগন রাজনৈতিক দলগুলোর গৃহীত কর্মসূচীর ধারনা লাভ করার ফলে কর্মসূচীর আগাম ইতিবাচক নেতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগ পাচেছ। গণমাধ্যমের কল্যানেই উভয় পক্ষই অর্থাৎ রাজনৈতিক দল-জনগন-সরকার ও তাদের পদক্ষেপ গ্রহনের সুযোগ পাচেছ। বিরোধী দলের কর্মসূচী গণমূখী হলে বিরোধী দল লাভবান হয় আর গণমূখী না হলে সরকার লাভবান হয়। গণমাধ্যমের কল্যাণে আগাম একটা হিসাব পাওয়া সহজতর হয়। গণমাধ্যমের উপকারিতা আছে অপকারিতাও আছে।

সরকারও গণমাধ্যমের উপকারিতা ভোগ করতে পারে। তারা তাদের এ্যাক্টিভিটিস বর্ধিত মাত্রায় কৌশলীভাবে ব্যাপক প্রচার করে নিজেদের কর্মকান্ডের প্রসার ঘটাতে সক্ষম হয়।। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় গোয়েবলসীয় সেই পুরনো কায়দা কৌশল যেকোনো মিথ্যা বার বার প্রচারে সত্যে পরিণত হয়। সরকারের হুমকি ধামকিও বিরোধী শিবিরে ভয়-আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে আন্দোলনকে গতিহীন করতে পারে।

এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রনের চিন্তা করে সরকার। আর গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রনের মধ্য দিয়েই সরকার স্বৈরশাসনের রুপ নেয়। গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিরোধী দল যখন অকার্যকর হয়ে যায় সরকার যখন ননা ভূল পথে হাটতে থাকে তখন সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাব বোঝাতে গনমাধ্যম সমাজের আয়না হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করে। গনমাধ্যমের কল্যানে জনমনে গনতন্ত্রিক চিন্তা চেতনার সৃষ্টি হয়। পরিনতিতে গনতান্ত্রিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে জনবিছ্ন্নি একঘরে হয়ে পড়া সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত হতে দেখা যায়। এ ভয়েই জনবিচিছন্ন সরকার গণমাধ্যমকে বেশি মাত্রায় নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা চালায়।

এমনকি নতুন নীতিমালা ও তৈরী করতে পারে। গণমাধ্যমের টাইট নীতিমালা শুধু সাংবাদিকদেরই বিষয় নয় রাষ্ট্র ও সমাজের অবাধ স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক হয়। একটি গণতান্ত্রিক সুন্দর রাষ্ট্র হিসেবে রু“পান্তরিত করার ক্ষেত্রে সরকার-জনগন-গনমাধ্যম সবার স্বার্থই জড়িত। প্রত্যেকের স্বাধীন সুচিন্তিত মত প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এটা বলা হয়ে থাকে যে, কোনো দেশের সরকার যখন স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হয় তখন তারা গণমাধ্যমের উপর খবরদারি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। স্বৈরাচারী সরকার গণমাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রনে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠে। একের পর এক আইন প্রনয়ন করে সম্পূর্ণ নিজেদের কব্জার মুঠোয় রাখতে চায়। যদিও সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকে তবুও সরকার তা মানতে চায় না। গণমাধ্যমের উপর স্টিমরোলার চালিয়ে তারা গোটা রাজনীতি তথা জনগনের স্বাধীন মত প্রকাশের উপর একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে চায়।

এসব করেও তারা নানান দুর্বল যুক্তি দেখিয়ে বোঝাতে চায় তারা গণমাধ্যমের কল্যানেই কিংবা গণমাধ্যমকে বিকশিত করতেই নতুন করে গণমাধ্যম তথা সম্প্রচার নীতিমালা করতে বাধ্য হচ্ছে কাজেই বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝার কিছু নেই। বিষয়টাকে অনেকে সুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের করার সাথে তুলনা করতে চান।

গণমাধ্যম বা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া-প্রিন্ট মিডিয়ায় পরিবেশিত সংবাদ-তথ্যাদি-বিনোদন জনগগকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে থাকে। গণমাধ্যম এর সংবাদ তথ্যাদি নিরপেক্ষ হলে দেশ জনগন তথা মানবতার কল্যানে অবদান রাখতে পারে। তেমনি শাসকদের বিবেক হিসাবেও কাজ করতে পারে। স্বাধীন শক্তিশালী গণমাধ্যম প্রকৃত অর্থেই সরকার-জনকল্যানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এটাও ঠিক গণমাধ্যমের ভুল সংবাদ প্রকাশ কিংবা অতিরঞ্জিত সংবাদ অনেকক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার সুযোগ পায়।

গণতান্ত্রিক চেতনা বিসর্জন দিয়ে রাজনীতি রাষ্ট্র জনগনের কাম্য নয়। কিন্তু সরকার স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন হলে জনগনের তোয়াক্কা না করেই গনতন্ত্রকে হত্যা করতে গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নগ্ন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করতে উদ্দত হয়। গনতন্ত্রেও সেই দুঃসময়ে গনতন্ত্র রক্ষায়, গনতন্ত্রের বিকাশে গনমাধ্যম অগ্রসর ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যম ব্যক্তিকে-দেশবাসীকে রাজনৈতিক সচেতন করে তোলে। গনতন্ত্র প্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোকে গনতন্ত্রের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে সহায়তা করে থাকে।

অবশ্য এর জন্য গনমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রয়োজন। গনমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া সমাজ রাষ্ট্র দেশ অগ্রসর হয়না। গনমাধ্যমের উপর শাসকের স্বৈরাচারী মনোভাব গনতন্ত্রের বিনির্মানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। কাজেই গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েমে স্বাধীন গনমাধ্যমের বিকল্প নেই। সুস্থ রাজনীতির অবাধ চর্চায় স্বাধীন গনমাধ্যম বিকাশে সরকার বিরোধী দলকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনীতির অন্যতম মাধ্যম মত প্রকাশের স্বাধীনতা আর মত প্রকাশের স্বাধীনতার অন্যতম মাধ্যম হলো গনমাধ্যম । কাজেই রাজনীতি এবং গনমাধ্যমের সুসসম্পর্ক অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সর্বদাই সচেষ্ট দৃস্টি রাখতে হবে।

লেখক: সৈয়দ নাজমুল আহসান






মন্তব্য চালু নেই