মেইন ম্যেনু

রাজনীতি এবং বিজ্ঞান

রাজনীতি এবং বিজ্ঞান দু’টি ভিন্ন শব্দ। কিন্তু যদি শব্দ দুটোকে মিলিয়ে প্রশ্ন করা যায় রাজনীতিতে বিজ্ঞান নাকি বিজ্ঞানে রাজনীতি তাহলে এর একটি ভাবার্থ থাকে।

রাজনীতি এবং বিজ্ঞান বলতেই অনেকেই বলে উঠতে পারে রাজনীতির সাথে বিজ্ঞানের আবার সম্পর্ক কি থাকতে পারে। অবশ্যই রাজনীতির সাথে বিজ্ঞানের একটা নিবীড় সম্পর্ক আছে। আজকে রাজনীতি বিজ্ঞান বা পলিটিক্যাল সায়েন্স একটি স্বীকৃত বিষয়। অবশ্য পলিটিক্যাল সায়েন্স বলতে রাজনীতি বিজ্ঞান এর চেয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞানকেই বেশি বোঝান হয়। ইংরেজি পলিটিক্যাল সায়েন্স বাংলায় রাষ্ট্র বিজ্ঞান বলেই ব্যাপক পরিচিত। তাই পলিটিক্যাল সায়েন্স সম্পর্কে অনেকে অবগত থাকলেও রাজনীতি বিজ্ঞানকে অনেকে খুঁজে পান না। তবুও রাজনীতি বিজ্ঞান বর্তমান সময়ে স্বীকৃত একটি বিষয় এ কথা স্বীকার করতেই হবে। পলিটিক্যাল সায়েন্স শব্দের পলিস বা পলিটিস অর্থ নাগরিক বা নগর বা রাষ্ট্র। পলিটিক্যাল সায়েন্স হলো নগর বা রাষ্ট্রের বিজ্ঞান বা রাজনীতি বিজ্ঞান। পলিটিক্যাল সায়েন্সকে স্টেট সায়েন্সও বলা যেতে পারতো কিন্তু তাও না বলে রাষ্ট্র বিজ্ঞানই বলা হচেছ কিংবা রাজনীতি বিজ্ঞানও বলা হচেছ না? আসলে পলিটিক্যাল সায়েন্সকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বলা হচেছ সম্ভবতঃ রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জনক খ্যাত এরিস্টটল এর প্রতি সন্মান প্রদর্শনার্থে তার রচিত ”দি পলিটিকস্” নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি যাতে রাষ্ট্র সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে এরিস্টটলের বিখ্যাত সেই গ্রন্থটির নামেই পলিটিকসকে রাষ্ট্র আর পলিটিক্যাল সায়েন্সকে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বলা হচেছ মানে রাষ্ট্রের বিজ্ঞান বলা হচেছ। পলিটিক্যাল সায়েন্সকে বিজ্ঞানের অংশ ধরা হলেও পলিটিক্যাল সায়েন্সকে সত্যিকার অর্থে সামাজিক বিজ্ঞান বলা চলে। কারন পলিটিক্যাল সায়েন্স হচেছ সামাজিক বিজ্ঞানের সে অংশ যা রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সরকারের বিভিন্ন নীতি সম্পর্কে আলোচনা করে। পলিটিক্যাল সায়েন্স বা রাষ্ট্র বিজ্ঞান বা রাজনীতি বিজ্ঞান এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচেছ রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহকে নিয়মনীতি অনুসারে সুসংবদ্ধ করা এবং ওগুলোর মধ্যে যুক্তি সংগত ও কার্যকরনগত যে সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে তা নির্ধারন করা সেসাথে রাষ্ট্রের মৌলিক অংগসমূহের মধ্যে অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নির্ণয় করা বা রাষ্ট্রের গঠন-পরিচালনার সকল উপাদান সমূহের প্রকৃিত সম্পর্কে সম্যক ধারনা প্রদান করা এবং রাষ্ট্রের প্রকৃতি-বিবর্তন-উৎকর্ষ সাধন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা।

রাজনীতি এবং বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনায় আমরা বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারনা থেকেই বলতে পারি বিজ্ঞান হলো কোনো বিষয়ে সুসংবদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা এবং পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমে সেই অর্জিত জ্ঞান ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করা। রাজনীতি বিজ্ঞান এ বিজ্ঞান এর মতো করেই পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নীরিক্ষা বিশ্লেষনের মাধ্যমে রাজনীতি সম্পর্কে সুসংবদ্ধ ধারনা পাওয়া যায়। তাইতো মহান রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এরিস্টটল রাজনীতিকে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছিলেন।

রাজনীতির সাথে বিজ্ঞানের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। সাধারনার্থে বিজ্ঞান মানেই বিশ্লেষন রাজনীতি বিজ্ঞানেও রাষ্ট্র-রাজনীতি নিয়ে নানানভাবে বিশ্লেষন করা হয়। তাইতো রাজনীতিকে বিজ্ঞানের পরিবারভূক্ত করা হয়েছে। বিজ্ঞানের মতো রাষ্ট বিজ্ঞানেও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান পদ্ধতি প্রয়োগ করেই সুনাগরিক/নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য, সরকার ও শাসন ব্যবস্থার জ্ঞান, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান, গনতান্ত্রিক কার্যক্রমের জ্ঞান, কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে সুশাসনের জ্ঞান অর্জন, তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষন তথা গবেষনা তত্ত্ব-তথ্য মনস্তাত্তিক বিষয়াদি, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রকৃতি পরিধি-বিষয়বস্তু, রাষ্ট্র, সরকার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, রার্ষ্টের অতীত বর্তমান ভবিষ্যত ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ করা হয়।

সমস্ত রাজনৈতিক জগত হচেছ রাষ্ট্র বিজ্ঞানের গবেষনাগার যেখানে রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা রাষ্ট্র, রাজনীতি, নিয়ে গবেষনা চালান। যাতে করে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দূর্নীতিপরায়নতার সংস্কৃতি, নিুমূখী বা স্থবির অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপ এর কারন অন্বেষনসহ কল্যানকর স্থিতিশীল রাষ্ট্রের প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারী সকল সমস্যা নির্ধারন ও বাস্তবতার নিরিখে সমাধানের পথ অন্বেষন করা হয়। আর এটাতো ঠিক যে একজন দক্ষ রাজনীতিবিদকে সাধারন জ্ঞান সৃজনশীল কল্পনা শক্তির অধিকারী এবং দুরদৃস্টিসম্পন্ন হতে হয়। সেসাথে গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র,স্বৈরতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারনা থাকতে হয়।

অনেকেই হয়তো রাজনীতি বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে বলতে পারেন রাজনীতিতো বিজ্ঞান হতে পারে না কারন রাজনীতি বিজ্ঞানের জন্য তো কোন সুনির্দিষ্ট গবেষনা পদ্ধতি নেই, অনুবীক্ষন যন্ত্র নেই রাসায়নিক দ্রব্যাদি নেই এটাতো শুধু অনুমাননির্ভর মাত্র। যা অবৈজ্ঞানিক। এমনটা যারা বলেন আপাত দৃষ্টিতে তাদের যুক্তি হয়তো ঠিক মনে হবে কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে আরো গভীরে গেলে বোঝা যাবে এটা পূর্ণাঙ্গরুপে সঠিক নয়। বিজ্ঞান মানেই গবেষণা করা পর্যবেক্ষন করা, রাজনীতি বিজ্ঞানও তাই করে থাকে। তবে রাজনীতি বিজ্ঞান পর্দাথ বিজ্ঞান রসায়ন বিজ্ঞান জীব বিজ্ঞানের মতো নয় এটাকে সামাজিক বিজ্ঞান বলা যায়। কারন রাজনীতি বিজ্ঞানে সামাজিক বিজ্ঞানের মতো সমাজ ও রাষ্টীয় জীবনের নানান দিক নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করা হয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে মনোবিজ্ঞান, নীতি বিজ্ঞানেরও চর্চা করা হয়। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে বিভিন্ন মনীষীদের রাজনৈতিক চিন্তা, তাত্ত্বিকগনের রাজনৈতিক চিন্তাধারা অনুধাবনের মাধ্যমে একটি কমপ্লিট রাজনৈতিক চিন্তা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়।

মানুষ হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হচেছ মানুষ। মানুষের জীবন যেমন গতিশীল তেমনি মানুষ্য সমাজও পরিবর্তনশীল। পরিবর্তনশীল সমাজ বা রাষ্ট্রে গতিধারার নিয়মনীতি নির্ধারন থেকেই রাষ্ট্র বিজ্ঞানের

উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। পলিটিক্যাল সায়েন্স বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে এমন কিছু নিয়েই আলোচনা করা হয়। নাগরিক জীবনধারা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষন বা আন্তঃ সমাজ বিজ্ঞান (অর্থনীতির সমাজবিজ্ঞান, জন প্রশাসন, জন অধিকার, জাতীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক,রাজনীতি, সংগঠন, রাজনীতির তত্ত,¡ ইতিহাস, সমাজ, ঐতিহ্য সমাজ কল্যান, নৃবিজ্ঞান ইত্যাদির সমাহার) এর বিশ্লেষনে পাওয়া যায় রাষ্ট্র বিজ্ঞানে। তাইতো এরিস্টটলের ভাষায় রাষ্ট্র বিজ্ঞান হলো রাষ্ট্রের বিজ্ঞান। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও শিক্ষার্থীদের জন্য আজকাল রাষ্ট্র বিজ্ঞানের উপর উচচতর ডিগ্রী নেয়ার ব্যবস্থা আছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্স নামে একটি ডিপার্টমেন্ট আছে। যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট এবং একটি উচচতর ডিগ্রী। এর উপরে পিএইচডি করারও সুযোগ আছে। রষ্ট্রবিজ্ঞানীদের পরিশ্রমে সৃষ্ট রাষ্ট্র বিজ্ঞানের উদ্ভব সম্ভবতঃ ২৫০০ বছর আগে ধরা হলেও গত ১৯ শতক থেকেই এর প্রকৃত চর্চা শুরু হয়েছে বলা যায়।”পলিটিক্যাল সাইন্টিস্ট” রা রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা পলিটিক্যাল সায়েন্স এর চর্চা-উৎকর্ষ সাধনে নিবেদিত রয়েছেন। যা বিশ্ব রাজনীতির কাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচেছ। একসময় রাষ্ট্র বিজ্ঞান অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতি অবলম্বন করা হলেও আজকাল আধুনিক পদ্ধতিতে সামাজিক বিজ্ঞানের অংশ হিসাবে রাষ্ট্র বিজ্ঞান অধ্যয়ন চর্চা করা হচেছ। রাষ্ট্র বিজ্ঞানে রাষ্ট্র নামক বৃহত্তম সামাজিকীকরন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক ও রাষ্ট্রূীয় কার্যাবলী, আধুনিক শাসন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তথা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাজনীতি প্রভৃতির তুলনামূলক পর্যালোচনাও করা হয়ে থাকে।

রাষ্ট্র বিজ্ঞান অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসাবে দেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সংস্কৃতিক পটভূমি তথা বাংলাদেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সমাজিক প্রতিষ্ঠান,সংবিধান,শাসন বিভাগ,প্রশাসনে স্বচছতা ও জবাবদিহিতা, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংগঠন সম্পর্কে জ্ঞান, বাংলাদেশের সাথে বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিদেশ নীতির গুরুত্ব, জাতীয় সংসদের কার্যক্রম, বিচার বিভাগ এর কার্যক্রম সুখী সুন্দর সমৃদ্ধশালী দেশও উত্তম নাগরিক জীবন গঠনে এবং বিশ্ব শান্তি রক্ষা করে প্রত্যেক দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন ও সহযোগিতামূলক সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, নাগরিক সমাজে সংগতি রক্ষা ও দেশের কল্যানে যথার্থ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হতে পারি। যা আমাদের স্বদেশ প্রেম জাগ্রত করনে উদ্বুদ্ধ হতে সহায়ক হতে পারে। রাজনীতি এবং বিজ্ঞান নিয়ে ব্যাপক আলোচনার প্রেক্ষিতে জ্ঞানী বার্নাড ’শর ভাষায় সুর মিলিয়ে একবাক্যে বলা যায়- রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষাই সভ্যতার একমাত্র রক্ষাকবচ।

[মতামত কিংবা লেখনির দায়ভার সম্পূর্ণ লেখকের]






মন্তব্য চালু নেই