মেইন ম্যেনু

রাজনীতি থেকে সৈয়দ আশরাফের সততা ও শিষ্টতার বিদায়

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুলের ছেলে সৈয়দ আশরাফ। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারে বঙ্গবন্ধুর শূন্যতা পূরণ করেছিলেন সৈয়দ নজরুল। এক-এগারো সেনা সমর্থিত সরকার আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করলে; সৈয়দ আশরাফ ওনার শূনাতা পূরণ করেছিলেন। রাজনীতিতে দুই প্রজন্মে এমন অকৃত্রিম বন্ধু পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়।

সৈয়দ আশরাফ সম্যক শিক্ষিত ও প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা। প্রধানমন্ত্রী যে ওয়েস্টমিনস্টার সরকার পদ্ধতির কথা বলেন, সেটিকে সৈয়দ আশরাফ অনাবাসে বসবাসকালে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। ফলে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মন্ত্রীর কর্ম-পরিসীমা ও নৈতিকতা সম্পর্কে সবচেয়ে জ্ঞাত ব্যক্তিটি তিনিই।

এই যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠে মন্ত্রীর বাড়ীর বারান্দায় নানা ধান্দা নিয়ে কিছু মোটা-সোটা ডাকাত প্রকৃতির লোক বসে থাকার, তাদের নানান ধান্দার দরখাস্তে সুপারিশ প্রদানের যে কুসংস্কৃতি; তাতে সৈয়দ আশরাফের অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করা অনুচিত।

বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নিরংকুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে কেবল নিজের দল ও জামাত-সঞ্জাত মেয়রদের একটু বেশী সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রতিপক্ষের মেয়রদের বঞ্চিত করতে খুব পছন্দ করে। আবার স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা খর্ব করতে গতানুগতিক ভাবনার যেসব সাংসদরা খুব আগ্রহী; তাদের সঙ্গে তাল দিয়ে যাওয়াই স্থানীয় সরকার মন্ত্রীদের কাজ।

এই ভিলেজ পলিটিক্সে সৈয়দ আশরাফ ছিলেন না। আধুনিক গণতন্ত্রে মন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়া মানে দলের নয়, জনগণের নেতা হওয়া এবং সব দলের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সমান প্রাধিকার নিশ্চিত করাই মন্ত্রীর কাজ; এই সহজ সভ্য সংস্কৃতি সৈয়দ আশরাফের জানা।

পরিমিতিবোধের সঙ্গে শিষ্টতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন সৈয়দ আশরাফের পারিবারিক ঐতিহ্য। এই পরিবারটি রাজনীতি থেকে কিছু নিতে আসেনি, আজকের অপরাজনৈতিক শিশু গড ফাদারদের মত গ্যাং পুষে চাঁদাবাজি করা বা লোকজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন সৈয়দ আশরাফের কাছে অপরিচিত এক কালো-সংস্কৃতি। ফলে রাজনীতিকে যারা ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে; তাঁদের কাছে সৈয়দ আশরাফ পথের বাধা। সুতরাং পথের বাধা সরিয়ে নিন; গ্যাং-গুলোকে মোটাতাজা হতে দিন। সৈয়দ আশরাফ এখন দপ্তরবিহীন মন্ত্রী।

মুক্তিযুদ্ধ বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধু যেদিন বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পা রাখলেন, সেদিন বিমান বন্দরে তিন-চারজন তৎকালীন গ্যাং লিডার (মুশতাকসহ) বঙ্গবন্ধুর কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন, তাজউদ্দীন বেশী কড়া লোক; কর্মীরা আশাহত, পথের বাধা সরিয়ে নিন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাহত একটি দেশে নানা ষড়যন্ত্রের মাঝে খুবই বিপন্ন বোধ করছিলেন। বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে কিছু ঋণ জরুরী ছিলো। তাজউদ্দীন একরোখা মানুষ; উনি আত্মনির্ভর উন্নয়ন কৌশলে আগ্রহী ছিলেন। এই দ্বৈতদ্বন্দ্বের মাঝে মুশতাক অতিশয় আনুগত্যমলিন ভক্তিনেত্রে বঙ্গবন্ধুকে প্রতিদিন নিয়ম করে ‘কানপড়া’ দিয়ে যেতেন। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে কানপড়া এক সফল মন্ত্রের নাম। ফলে সরে যেতে হয় তাজউদ্দীনকে; এই যে আজ যেমন সৈয়দ আশরাফ সরে গেলেন। ইতিহাসের ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা নেয়া যে আমাদের ধাঁতে নেই।

সৈয়দ আশরাফের দিন শুরু হয় অনেক ভোরে। প্রথমেই উনি অনলাইন পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলিয়ে নেন। উনার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত রিপোর্টের ক্লিপিংস ফাইলের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। দেখে নেন মিডিয়ায় দল সম্পর্কিত আর কী গুজব আছে, পশ্চিমা মানবাধিকার ও নৈতিকতার দোকানীদের খেলাধূলার গতি প্রকৃতিও দেখে নেন। কারণ মিডিয়া আর পশ্চিমা শক্তির এক্কা দোক্কা খেলাটি সম্পর্কে উনি যথেষ্ট জানেন। সে কারণেই টকশোতে বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন, অপসাংবাদিকতা এবং নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে পশ্চিমা মদদে ক্ষমতায় বসে যাবার সাপলুডু খেলা সম্পর্কে তিনিই বারবার জাতিকে সাবধান করেছেন।

এরপর উনি বাসায় বসেই মন্ত্রণালয়ের ফাইল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়গুলো অনেকটা হাসপাতালের মত; সেখানে আসে সুপারিশের রোগীরা; আর অসহায় মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছক্কা-পাঞ্জা খেলে কেরানী চিকিৎসকেরা। কিছুক্ষণ পরপর একজন সুপারিশকারীর আগমন, বা কেরানীর তৈল-সঞ্চালন, অথবা কোন উৎসুক সাংবাদিকের প্রশ্ন, আপনার অনুভূতি কী? চিড়ির বন্দরে ছয়জন টিআর কাবিখার সাহায্য পায়নি, মেরে দিয়েছে সরকারী গ্যাং; অথচ আপনাকে এতো ফ্রেশ দেখাচ্ছে কেন?

এই চিড়িয়াখানা বা হাসপাতাল; যাকে আমরা সচিবালয় বলি; সেখানে সৈয়দ আশরাফ কম সময় দিয়ে বরং হোম অফিসে মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু অত্র অঞ্চলে এভাবে কাজ হয়না। কাজ মানেই টিভি ক্যামেরা নিয়ে তোমাদের পাশে এসে বিপদের বাঁশী হতে হয়, সাংবাদিককে সন্দেশ খাইয়ে খেজুরে আলাপ গড়তে হয়; এরপর আবেগে কলাম লিখে ফেলে সন্দেশ প্রিয়, আশরাফ ভাইয়া কাজ-পাগল মানুষ; উনাকে দিয়েই হবে, উনিই পারবেন। সুপারিশ করে দলীয় অকর্মাদের চাকরী পাইয়ে দেয়া আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি কদাচার। সৈয়দ আশরাফ স্বজনপ্রীতির লোক নন; যোগ্যতাই তাঁর কাছে চাকরী প্রাপ্তির একমাত্র মাপকাঠি। ফলে আশাহত গ্যাং-এরা আশরাফ ভাই বেশী ঘুমান, কাজে মন নাই ইত্যাদি নালিশ দেয় কুসুমকলি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকার কাছে।

একটা মিথ্যা কথা কয়েকশোবার বললেই সত্যি হয়ে যায় গ্রামাঞ্চলে। সুতরাং উনি এখন দপ্তর বিহীন মন্ত্রী। অথচ এই সৈয়দ আশরাফ মন্ত্রীত্বে এসে উনার ব্যক্তিগত সম্পদ কমেছে। বেতনের বাইরে একটি পয়সা, একটি সুবিধা নেয়া উনার জীনে নেই, পারিবারিক শিক্ষায় নেই। অথচ মন্ত্রী হলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু হাই প্রোফাইল অতিথি আপ্যায়ন করতে হয়। একে বলা হয় নেটওয়ার্কিং। এটা অন্যেরা নিজেদের জন্য করে; সৈয়দ আশরাফ করেছেন দেশের জন্য। ফলে বেতনের অর্থে কুলায়নি; ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে হাত পড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজে আজকের এই অন্ধকার যুগে সৈয়দ আশরাফের মত সৎ মন্ত্রী পাওয়া যাবে না; এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কারণ ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিকতম সব স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরা গড়েছে টাকার পাহাড়। যে কারণে ভারতে কংগ্রেস ও পাকিস্তানে পিপলস পার্টি ক্ষমতাচ্যুত। বর্তমানে উভয় রাষ্ট্রের মৌলবাদী সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রীরাও সম্পদের এভারেস্ট ও কে-টু গড়তে ব্যস্ত। সৈয়দ আশরাফ অন্ধকার অরণ্যে সততার দ্যুতি হয়ে রয়ে গেলেন আমাদের মানসপটে।

সব হারই হেরে যাওয়া নয়। কখনো কখনো হেরে যাওয়াই জিতে যাওয়া। আর সৈয়দ আশরাফতো জীবনকে কোনো রেসই মনে করেননি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায়-টকশোতে-শোবিজে আইকন খুঁজে কী লাভ? সততা আর শিষ্টতার অনিবার্য আইকন সৈয়দ আশরাফ। হোক এখন কাজ করছি কাজ দেখানোর ছাগল নাইয়া থিয়েটার। নিভৃতে অন্তর্মুখিতার নৈঃশব্দে কাজ আজকের পলিটিক্যাল গ্যাং-বাজারে অচল।

সার্বিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক নিমজ্জনের সময়ে এই বেশ ভালো। পঁচা ডিম বিক্রি বা পঁচা ডিম দিয়ে উন্নয়নের পাউরুটি তৈরীর এই সার্কাসে জোকারেরাই নাকে লাল বল লাগিয়ে নেত্য করুক। আলোর মানুষ সৈয়দ আশরাফ থাকুন তাঁর শূচিতার জগতে; শতায়ূ হোন; আমার চোখে আপনি একজন ‘দার্শনিক রাজা’।

লেখক: সাংবাদিক ও ব্লগার।



« (পূর্বের সংবাদ)



মন্তব্য চালু নেই