মেইন ম্যেনু

রাজন, আমাদের ক্ষমা কর

প্রথমেই নিজের কিছু অক্ষমতা ও দুর্বলতার কথা দিয়েই শুরু করি। আমাদের সমাজে সংঘটিত যে কোনো হৃদয়বিদারক ও নির্মম ঘটনা সবাই একরকমভাবে নিতে পারে না। আবার সবার সহনীয় ক্ষমতাও একরকম নয়। এদিক থেকে যে কোনো নির্মম ঘটনা আমার জন্য খুবই অসহনীয়। এসব ঘটনা দখলে কিংবা কোনো কাহিনী শুনলে বেশ ক’দিন আর নিজে স্বাভাবিক থাকতে পারি না। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, মাথায় রক্ত উঠে গিয়ে শরীর-মনে নানা অসুস্থতার উপসর্গ দেখা দেয়। এজন্য এসব ঘটনা প্রত্যক্ষ করা তো দূরে কথা, পারলে সর্বদা দশ হাত দূরে থাকার চেষ্টা করি।

প্রসঙ্গত, সেই ছোটকালের কথা (১৯৮১-৮২)আজও স্মরণে আছে, সম্ভবত তখন আমি সবেমাত্র প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়েছি। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি আমাদের বাড়ির অদূরে নদীর ঘাটে ত্রিশালের এক নামকরা ডাকাত সর্দারের লাশ পড়ে আছে। উৎসুক জনতা আর অন্য সহপাঠীদের সাথে লাশ দেখে ফিরে এসে এই যে বিছানায় পড়েছিলাম, ৬-৭দিন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। এরপর থেকে মাঝে মধ্যেই ঘুম থেকে আতকে উঠতাম। এটা দীর্ঘদিন ধরে ছিল। পড়ে আমার দাদী অনেক গাছাগাছালী-লতাপাতার ওষুধ খাইয়ে এবং তাবিজ-কবজ শরীরে বেঁধে সুস্থ করেছিলেন।

শুধু বাস্তবের মারামারি, কাটাছিড়া, জখম, দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনাই নয়, টেলিভিশন কিংবা সিনেমায় কোনো নির্মম নিষ্ঠুর ঘটনার বিবরণ দেখলে কিংবা শুনলেও নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। যেমনি হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয় তেমনি চোখ দিয়ে গাল বেয়ে অঝরে পানি ঝড়তে থাকে। এ জন্য আমি খুব কমই টেলিভিশনের সামনে বসি। মাঝে মধ্যে খবর দেখি কিন্তু কোন মর্মান্তিক দৃশ্যের খবর হলে টেলিভিশন বন্ধ করে দেই। অথবা রিমোট টিপে অন্য কোনো চ্যানেল দেখার চেষ্টা করি। এসব কারণে সাধারণত কেউ আমার সাথে টিভি দেখতে বসেন না। এ জন্য অবশ্য স্বজন ও বন্ধুবান্ধবরা আমাকে দুর্বল হার্টের মানুষ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। যে যাই বলুক যতটা পারি চেষ্টা করি এ ধরনের নিষ্ঠুর-নির্মম ঘটনা থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে শত চেষ্টা করেও সিলেটের রাজন হত্যার নির্মম ঘটনা থেকে নিজেকে আড়াল করতে পারিনি। কেননা, পেপার-পত্রিকা, টেলিভিশন-রেডিও, ফেসবুক-টুইটার সর্বত্রই ছড়িয়েছে এ ঘটনা। যেখানেই চোখ রাখি সেখানেই এই নির্মম-নিষ্ঠুরতার ঘটনা।ফলে একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই ঘটনার নিন্দা জানাতে অনেকটা বিবেকের তারণা থেকেই অকালে ঝরে যাওয়া রাজনের বিদেহী আত্মার কাছে ক্ষমা চাইতেই আজকের আমার এই লেখাটুকু।

এই কয়দিনে মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সবাই অবগত, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কিভাবে ঘটেছে, কারা এর সাথে জড়িত আর পুলিশ প্রশাসনেরই বা ভুমিকা কি ছিল? ফলে ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে এখানে পাঠকের বিরক্তি ঘটাতে চাই না।

সিলেটের শহরতলি কুমারগাঁও এলাকায় চোর সন্দেহে সামিউল আলম রাজনকে (১৩) পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিন দিন ধরে এই নিয়ে সর্বত্রই প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে ফেসবুক-টুইটারে।

যতদূর জানি তাতে, এরকম ক্ষোভ, এরকম প্রতিক্রিয়া মানুষের একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে, এতো স্বতঃস্ফূর্ত, অন্তত সাম্প্রতিক সময়ে কোনো ঘটনায় চোখে পড়েনি। সিলেটে ভিডিও ক্যামেরার সামনে কিশোর রাজনকে পেটানোর পর তার মৃত্যুর ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা, যন্ত্রণা আর অসহায়ত্বের কথা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের গণমাধ্যমেও ঘটনাটি তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তা গুরুত্বের সাথে স্থান পেয়েছে। যার ফলে অপরাধী-পুলিশের গোপন আতাতেঁও অন্য ১০টি ঘটনার মতো এটিকে আর ধামাচাপা দিতে পারেনি। পত্রপত্রিকার প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যে যা জানতে পেরেছি তাতে, হত্যার পর লাশ গুম করতে গিয়ে জনতার হাতে অপরাধী ধৃত, ১২ লাখ টাকার রফায় ৬লাখ টাকা নগদ পেয়ে মূলহত্যাকারী কামরুলকে বিদেশে পাড়ি দেয়ার সুযোগ করে দেয় পুলিশ। তবে শেষ রক্ষা হয়নি সেখানেও প্রবাসীরা ঘাতককে খোজেঁ ধরিয়ে দিয়েছে।
ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে, দুই আসামী মুহিত আলম ও ইসমাইল গ্রেফতার হয়েছে, তাদেরকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তারা হত্যার দায়ও স্বীকার করেছে। সৌদিতে পালিয়ে যাওয়া কামরুলকে প্রবাসীরা ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছে। আমাদের পুলিশ প্রশাসনের লোকজন ও স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী খুশিতে গদ গদ।
কিন্তু তাতে কী!রাজনের মা-বাবা কি ফিরে পাবে তাদের এই সন্তানকে? বিচার পেলেও তারা কি কখনো ভুলতে পারবেন সন্তানের উপর মানুষরূপী নরপশুদের নির্মম নিষ্ঠুর নির্যাতনের এই কাহিনী, আমরা কি পারবো ইতিহাস থেকে জাতির এই নিষ্ঠুর কলঙ্কের ঘটনা মুছে ফেলতে? না, পারবো না।
যে যেভাবেই ঘটনাটিকে দেখুক না কেন, নিকট অতীতে কোথাও এ ধরনের নির্মম নিষ্ঠুর ঘটনার নজীর বিরল। শুধু নিকট অতিতেই নয়, আদিম ও মধ্যযুগেও এভাবে পিটিয়ে শিশু হত্যার নজীর ইতিহাসে আছে বলে আমার জানা নেই। প্রসঙ্গত, বছর দুয়েক আগে রাজশাহী সীমান্তে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ কর্তৃক গরু ব্যবসায়ী বাংলাদেশি যুবক হবিবুর রহমান হবুকে উলগ্ন করে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার চেষ্টা করেছিল। পরবর্তীতে সেই ভিডিও চিত্র ইউটিবে ফাঁস হলে বিশ্বব্যাপী এনিয়ে হৈ-চৈ পড়েছিল। সেটাছিল ভিনদেশী সীমান্ত রক্ষীর দ্বারা প্রাপ্তবয়স্ককে নির্যাতন।
কিন্তু আজ নিজ দেশের পাষণ্ড নাগরিকের হাতে জীবন দিতে হয়েছে রাজনকে। যা জেনেছি এই নরপশুদের কুৎসিত চরিত্রের খায়েশ পূরণ না হওয়ায় প্রতিবন্ধী শিশু রাজনকে চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকঘন্টা ধরে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এঘটনায় বিশ্ববাসী স্তম্ভিত-নির্বাক-নিস্তব্ধ! আমরা গোটা জাতি লজ্জিত। ধরা যাক, শিশুটি চুরিই করেছিল, তাই বলে কি এভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে-রক্তাক্ত করে মেরে ফেলতে হবে ? এটা কি সভ্য সমাজ নাকি আমরা সেই বর্বরতম অসভ্য যুগে ফিরে যাচ্ছি। একটি প্রতিবন্ধী ছেলের বাঁচার সে যে কি আকুতি….! পানি খাওয়ার যে কী আকুতি..! আর নির্মম নির্যাতনের আহাজারি যেন বারবার আমার কানে ভেসে আসছে।
আজ আমাদের সভ্য রাষ্ট্রের মানবাধিকার কমিশন কোথায়, ড. মিজানুর রহমান স্যার কোথায়? রাজনীতিতে যে কোনো ঘটনা ঘটলেই আমাদের রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা ও প্রশাসনের কর্তারা বক্তব্যের বুলি উড়ান, আজ তারা চুপচাপ কেন? তাহলে এখানেও কি তারা কোনো ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজছেন, না অন্য কিছু? অবশ্য ড. হাসান মাহমুদ বলেই ফেলেছেন রাজন হত্যার পেছনেও নাকি খালেদা হাত রয়েছে! কি বিস্ময়কর আমাদের দেশের রাজনীতি, আইন-বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থা। আমার তো মনে হয় না, এ ধরনের ভিত্তিহীন কথা বলে পৃথিবীর আর কোনো দেশে কোন নাগরিক এভাবে পার পেতে পারেন।
আমাদের সমাজ কেমন জানি, ক্রমেই অসভ্য হয়ে উঠছে। আইন-বিচার কোনো কিছুই স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। সমাজে অন্যায়ের বিচার হচ্ছে। রাষ্ট্র-সমাজের নিস্ক্রিয়তায় অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যাচ্ছে। অবশ্য হত্যার এই সংস্কৃতি একদিনে আসেনি। যেখানে বিচারবহির্ভুত হত্যা আমাদের সমাজে রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। কথা কথায় নাগরিককে ধরে নিয়ে পিটানো হয়। নির্যাতনে হেফাজতে মৃত্যু হলেও দায়মুক্তি দেয়া হয়। রাজণৈতিক সভাসমাবেশে পুলিশ প্রকাশ্যে গুলি করে এবং ধরধর বলে গণপিটুনিতে নিরপরাধ ব্যক্তি হত্যা করা হয়। এগুলো আমাদের সমাজে যে অসহিষ্ণুতা ও নির্মমতার লক্ষণ তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার নেই।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের ষান্মাসিক প্রতিবেদন অনুসারে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৮ জন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে, ২০১০ সালে ১৬৭ জন, ২০১১ সালে ১৪৫ জন, ২০১২ সালে ৯৯ জন এবং ২০১৩ সালে ১২৩ জন পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছ। প্রায়ই আমরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘গণপিটুনি’ বলে বর্ণনা করতে শুনি। এর কোনো সঠিক বিচার হয়না। ফলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকেই এ ধরনের অপরাধ আমাদের সমাজে বেড়েই চলেছে। সেই সাথে নির্মমতাও বাড়ছে। থাক, এসব কথা।
দাবি উঠেছে অবিলম্বে এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টিমূলক শাস্তির। তাই প্রশাসনের উচিত সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। এটি যত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হবে ততই মঙ্গল। যেন ভবিষ্যতে এমন হীন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। অন্যথা আমাদের সমাজের আরো অধপতন ঘটবে। এতে ভেঙ্গে পড়বে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা। এছাড়া এ ঘটনায় জড়িতরা উপযুক্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পেলে সমাজে এক খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকাবে। এর সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থার উপর। তাই প্রশাসন এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি আমাদের এই রাষ্ট্রের প্রধান, আপনি ১৬ কোটি নাগরিকের অভিভাবক। এখানে যেমন ভাল কিছু ঘটলে এর সুনামের অংশিদার হন আপনি, তেমনি খারাপ কিছু ঘটলেও এর দায় রাষ্ট্র, সমাজ তথা আপনি কোনোভাবেই এড়াতে পারেননা। বাংলাদেশ যখন বিশ্ব দরবারে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের সোনার ছেলেরা যখন ক্রিকেট মাঠে একের পর এক জয় দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা পতপত করে উড়াচ্ছে। নিম্নআয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। অনেকটাই নিশ্চিন্তভাবে ভিশন-২০২১ অনুযায়ী উচ্চ মধ্য আয়ের দেশ ও ভিশন-২০৪১ অনুযায়ী উন্নত দেশের গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে চলেছে। ঠিক তখন এ ধরনের ঘটনা জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি তো দুই সন্তানের জননী। আজকে রাজন যদি আপনার সন্তান হতো তাহলে আপনি কি করতেন, চুপ থাকতেন। কখনোই না।তাহলে আজকে রাজনের বাবা মাকে কি বলে শান্তনা দিবেন? জানি তাদেরকে কোনোভাবেই শান্তনা দিতে পারবেননা। তাই আমরা জানি মা হিসেবে আপনি খুবই সন্তানপ্রিয়। একজন মা হিসেবে আপনিই পারেন রাজনের হত্যাকারীদের এবং খুনিদের সাথে আতাঁতকারী পুলিশ সদস্যদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। তাই আমরা সবাই দৃঢ় বিশ্বাস করতে আপনি এ ব্যাপারে নিশ্চুপ না থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন।
অন্যথা, আমরা যতই স্বপ্ন দেখিনা কেন, মানব উন্নয়ন সূচকে এগুতে না পারলে কোনো লাভ হবে না। সবশেষে এই সভ্য সমাজে মানবরূপী নিষ্ঠুর পাষাণ ঘাতকদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত রাজনের শোকাহত খেটে খাওয়া দরিদ্র বাবা-মা ও পরিবারকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। শুধু হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশায় রইলাম। সেই সাথে বলবো, হে ছোটভাই রাজন, আমাদের ক্ষমা কর। আমরা এই নষ্টা সমাজের অসভ্যতা, নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতা থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারিনি। যে কারণে তোমাকে অকালেই পৃথিবী থেকে তোমাকে বিদায় নিতে হয়েছে।

কলামলেখক ও সমাজবিষয়ক গবেষক। ই-মেইল:[email protected]






মন্তব্য চালু নেই