মেইন ম্যেনু

রামু সহিংসতার চার বছর পূর্ণ

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর। চার বছর পূর্ণ হলো কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের নারকীয় ঘটনার। কিন্তু কোন মামলারই বিচার কাজ শেষ হয়নি।

অভিযোগ উঠেছে, ঘটনায় জড়িত চিহ্নিত ব্যক্তিরা আইনের আওতায় না আসার পাশাপাশি নানাভাবে সাক্ষীদের ভয়-হুমকি প্রদানের কারণে এ সংশয় তৈরি হয়েছে। আর মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে বিরাজ করছে চরম অসন্তুষ্টি।

এরমধ্যে রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার সদরে এ ঘটনায় দায়ের করা ১৯ টি মামলার মধ্যে একটি মামলা বাদির সাথে আপোষ করে আদালত থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অপর মামলার সাক্ষী গ্রহণ শুরু হলেও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষী দিতে ভয় পাচ্ছেন। রীতিমত হুমকির মুখে আছেন বলে তাদের অভিযোগ।

সরকার পক্ষের আইনজীবীও স্বীকার করেছে নানা কারণে মামলার সাক্ষীরা সাক্ষ্য না দেওয়ায় আপাতত মামলার সাক্ষী গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছে। সরকার পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে এসব মামলা পুলিশের পিবিআই এর অধিনে অধিকতর তদন্ত হচ্ছে।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন, পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের যুবক উত্তম বড়–য়ার ফেইসবুকে পবিত্র কোরআন আবমাননার জের ধরে বিগত ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে একদল দূর্বৃত্ত মিছিল সহকারে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালায়। পরদিন ৩০ সেপ্টেম্বর হামলা চালায় উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ বিহার ও বসতির উপর। ওই সময় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয় রামুর ১২টি, উখিয়ায় ৫টি ও টেকনাফে ২টি বৌদ্ধ বিহার এবং শতাধিক বসত বাড়ীতে। লুট করা হয় প্রাচীন ও দূর্লভ বুদ্ধ মূর্তি ও ধাতু।

ঘটনার এক বছরের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বৌদ্ধিক স্থাপত্য শৈলীতে নতুন করে নির্মাণ করা হয় ১৯টি বৌদ্ধ বিহার। পাশাপাশি নতুন করে নির্মাণ করা হয় ক্ষতিগ্রস্ত বৌদ্ধ বসতিগুলো। হামলার ঘটনায় ১৯টি মামলা দায়ের করে।

এর মধ্যে রামু থানায় ১২টি, উখিয়া থানায় ৫টি ও টেকনাফ থানায় ২টি। এ ১৯টি মামলায় মোট ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামী দেখানো হয় এবং এজাহারে নাম উল্লেখ করা হয়েছিল ১৭৫ জনের। ঘটনার ৩ বছরে এসে ২০১৫ সালে আদালতে সব মামলার চার্জশীট দাখিল করে পুলিশ। এই ১৯টি মামলায় মোট ৯৪৫ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছিল। এদের মধ্যে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল ৫৩৬ জনকে। এর পর আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।

এর মধ্যে ঘটনার অন্যতম পরিকল্পনাকারি নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমদের সঙ্গে এক বিচারকের সম্পর্কে অভিযোগ উঠে। এমনকি ওই বিচারক তোফায়েল আহমদের খামার বাড়িতে গিয়ে আতিথিয়েতা গ্রহণও করেন। এর প্রেক্ষিতে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হলে বিচারককে কক্সবাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনার চার বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে নতুন করে হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর বান্দরবন থেকে ফের গ্রেফতার হন এ তোফায়েল আহমদ।

মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবী কক্সবাজার জেলা দায়রা ও জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মমতাজ আহমদ জানান, ১৯ টি মামলায় পুলিশ আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর পর্যাক্রমে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হলে সৃষ্টি হয় নানা দ্বন্দ্ব।

এর কারণ হিসেবে সরকারি এই আইন কৌশলী জানান, মামলার অভিযুক্তরা চিহ্নিত অপরাধি এবং প্রভাবশালী পর্যায়ের। একই সঙ্গে আসামী রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীও। অভিযোগ উঠেছে এসব আসামীরা সাক্ষীকে নানাভাবে হুমকি দিচ্ছে। এতে সাক্ষীরাও ভয়ে আদালতে সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিরত থাকে। এর প্রেক্ষিতে সরকার পক্ষের আবেদনে সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে। এখন মামলা সমুহ পুলিশের পিবিআই এর অধিনে অধিকতর তদন্ত করা হচ্ছে।

এ্যাডভোকেট মমতাজ আহমদ জানান, এর মধ্যে সরকার পক্ষের অগোচরে ১৯ টি মামলার মধ্যে ১ টি মামলা বাদি ও আসামীর মধ্যে সমঝোতা হয়ে আদালতে আপোষও হয়ে গেছে। নি¤œ আদালতে এ আপোষ হওয়ায় তিনি বিষয়টি নিয়ে অবহিত ছিলেন না।

মামলায় সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়ে ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী কক্সবাজার জেলা ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহসান ভুলু জানান, ঘটনার দিন কি হয়েছে তা সকলের জানা এবং পরিষ্কার। এ ঘটনাটির চিত্র এবং ভিডিও চিত্র রয়েছে। ঘটনায় জড়িতরাও চিহ্নিত। আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হওয়ার পর তিনি দুইটি মামলার সাক্ষ্য দিয়েছেন। ঘটনার দিন তিনি যা দেখেছেন তাই আদালতকে অবহিত করেছেন। কিন্তু মামলার অন্যান্য সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দেননি।

তিনি বলেন, ‘মামলার জড়িতরা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাক্ষীদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে তারা মামলার সাক্ষ্য প্রদান করতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে মামলার বিচার নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।’

মামলার এক সাক্ষী শংকর বড়ুয়া জানান, ঘটনা শুরু হলেও নিজের নিরাপত্তার কারণে তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন বিহারের আগুন জ্বালছে। এ ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন দেখেননি। তাই আদালতে জানিয়েছেন তিনি।

রামু কেন্দ্রিয় সীমা বিহারের আবাসিক ভিক্ষু প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, ঘটনায় সারাসরি জড়িতরা যেখানে প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করেন ওখানে নিজকে কিভাবে নিরাপদ বলে মনে করবেন সাক্ষীরা। তাই তারা আদালতে সাক্ষী দিতেও যাচ্ছেন না। যদিও পুলিশের পক্ষে সাক্ষীদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এতেও সাক্ষীরা নির্ভয় হচ্ছে না।

নিজকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করেন না বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় গুরু বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাবেক সভাপতি সত্যপ্রিয় মহাথের। তিনি জানান, সরকারের উদ্যোগে তাদের ধারাবাহিক নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে। এ নিরাপত্তা অব্যাহত রাখার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এটা অব্যাহত না থাকলে ফের অঘটন ঘটতে পারে।

বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ। তিনি জানান এখন পরিবেশ শান্তিপূর্ণ। এটা অব্যাহত রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সজাগ রয়েছে।

রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনার ৪ বছর পূর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন। দিনটি পালনে রামু কেন্দ্রিয় সীমা বিহারে বিশ্বশান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখার কামনায় হাজারো প্রদীপ প্রজ্জ্বলন এবং প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।






মন্তব্য চালু নেই