মেইন ম্যেনু

রিজার্ভের অর্থ হ্যাকের সময় সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ হ্যাকের সময় বন্ধ ছিল দুটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। ঘটনার সময়কালে সংঘটিত লেনদেনের লগ তথ্যও গায়েব। কারা কম্পিউটার ও সার্ভারে প্রবেশ করেছে কিংবা ব্যবহার করেছে সে সংক্রান্ত তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনটি আইডি শনাক্ত করা গেলেও পুরো লগ তথ্য উদ্ধার করা যায়নি।

ঘটনার আগে থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহূত ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের দুটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বন্ধ ছিল। ফলে ডিলিং রুমে কারা ছিল, সুইফট কোড ব্যবহার করে কারা কাজ করছিল সেসব তথ্য বের করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, ৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফেডারেল রিজার্ভে ডলার পেমেন্টের বার্তাগুলো পাঠানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুমে সুইফটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট পরিচালন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে বার্তাগুলো পাঠিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা অথবা হ্যাকার।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমে ঢুকতে পৃথক ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড রয়েছে। এই পদ্ধতিতে সিস্টেমে কারা প্রবেশ করল এবং কারা বের হলো সেসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সার্ভারে ও কম্পিউটারে থাকার কথা। গতকাল পর্যন্ত তিনটি আইডিকে শনাক্ত করা গেছে বলে সূত্র জানায়। কিন্তু কোন কর্মকর্তা এই আইডি ব্যবহার করেছেন, কিংবা তাদের আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করেছেন কি না সে বিষয়ে তথ্য নিশ্চিত নয়।

ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের এই কক্ষে বিশেষ কার্ডের সাহায্যে প্রবেশ করতে হয়। এখানে দুটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার কিছু দিন আগে থেকেই ডিলিং রুমের দুটি ক্যামেরা অকেজো ছিল বলে সূত্রে জানা যায়।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ফায়ারআইয়ের সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড় সাইবার চুরির ঘটনাগুলোর কয়েকটির তদন্ত করেছে সিলিকন ভ্যালির এই কোম্পানি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান সাইবার নিরাপত্তা পরামর্শক রাকেশ আস্তানা এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। রাকেশ আস্তানা এক সময় বিশ্বব্যাংকের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে তার মৌখিক পরামর্শে নতুন সফটওয়্যার সংযোজন করা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সব কম্পিউটারে। নিরাপত্তার জন্য নতুন সফটওয়্যারটি সরবরাহও করবেন রাকেশ আস্তানা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অফিস আদেশে বলা হয়েছে, রাকেশ আস্তানার মৌখিক পরামর্শে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সকল বিভাগ, ইউনিট ও সার্ভারে তার সরবরাহকৃত সফটওয়্যার ইন্সটল করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। রাকেশ আস্তানার মৌখিক পরামর্শে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সকল পিসি ও সার্ভারে সফটওয়্যার বসানোর বিষয়টি নতুন করে সাইবার নিরাপত্তাহীনতায় ফেলবে কি না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

সহযোগিতার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকাররা কীভাবে চুরি করল তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রও সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে। ব্যাংকের টাকা চুরির যেসব ঘটনা এ পর্যন্ত বিশ্বে ঘটেছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ঘটনাকে ‘অন্যতম বড়’ বলছে রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এই তদন্ত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে বলেও খবর দিয়েছে সংবাদ সংস্থাটি।

এদিকে ফিলিপাইনে কারা অর্থ লোপাট করেছে তার ধোঁয়াশা কাটছে না। ইনকোয়ারারের প্রতিবেদন অনুযায়ী অভিযুক্ত চীনা বংশোদ্ভূত ‘উইলিয়াম’ রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দিয়েছেন। জুয়ার মাধ্যমে (ক্যাসিনো) অর্থ লোপাটে উইলিয়ামকে দায়ী করে ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংবাদ সংস্থায় নাম আসার পর তিনি তা অস্বীকার করেন। ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের জুপিটার ব্রাঞ্চে ওই ব্যবসায়ীর স্বাক্ষর জাল করে এই অর্থ তুলে নেয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রিজাল ব্যাংকের ওই শাখায় তার কোন একাউন্ট নেই। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন ডেকেও উপস্থিত হননি। এই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।

এদিকে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও লরেঞ্জ তান ছুটিতে যাবার ঘোষণা দিয়েছেন। এত বড় আর্থিক কেলেংকারির পরও তিনি পদত্যাগ করছেন না। তার বিরুদ্ধে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হলে তার আইনজীবী জানান, মুক্তভাবে তদন্তের স্বার্থে তিনি কিছুদিন ছুটিতে থাকবেন, তবে তিনি পদত্যাগ করছেন না। এদিকে ফিলিপাইনের এক সিনেটর বলেছেন, আগামী ১৫ মার্চ মানিলন্ডারিং এর ঘটনায় একটি গণ শুনানি করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের একটি বড় অংশ রাখা আছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে। সেখান থেকেই টাকা তোলার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ৩০টি আদেশ পাঠানো হয়। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি আদেশে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা চলে যায় শ্রীলংকা ও ফিলিপাইনের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে। টাকার সন্দেহজনক গন্তব্যের কারণে পরবর্তী আদেশগুলো কার্যকর করেনি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক।

নজরদারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা গত ৬ মাসে ফিলিপাইন বা শ্রীলংকা গেছেন, তাদের সঙ্গে সেসব দেশের কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ওই তালিকায় যারা আছেন, তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ঢাকার বাইরে না যাওয়ার জন্য মৌখিক নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তালিকায় কতজন আছেন, কারা-কারা আছেন, সে বিষয়ে কেউই মুখ খুলছেন না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বর্তমানে দিল্লি অবস্থান করছেন। তিনি পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আয়োজিত তিনদিনব্যাপী এক সেমিনারে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার দিল্লি গেছেন। তিনি আগামী ১৪ মার্চ সকালে ঢাকায় ফিরবেন বলে জানা গেছে।

সহায়তায় প্রস্তুত বিশ্বব্যাংক

বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, এ ধরনের আর্থিক ঘটনায় সহযোগিতার জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি বিভাগ রয়েছে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতা চায় সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শ্রীলংকার অর্থ ফেরত নিয়ে সংশয়

হ্যাক হওয়া ১০০ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার শ্রীলংকা থেকে ফেরত পাওয়া যাবে বলে এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশাবাদ ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু শ্রীলংকা বলছে যে, তারা পুরো ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। শ্রীলংকায় এই অর্থ নেই। ফিলিপাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনকোয়ারারের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলংকার একটি এনজিওতে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিল হ্যাকাররা। তবে ‘ফাউন্ডেশন’ শব্দটির বানান ভুল করায় সতর্ক হয়ে উঠেন ব্যাংকাররা। লংকা বিজনেসের খবর অনুযায়ী ওই টাকা শ্রীলংকাতে যায়নি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ক্যাসিনোর বাইরে টাকার হদিস নেই

পাচার হওয়া অর্থের মধ্যে ফিলিপাইনের স্থানীয় জুয়ার আসরে গেছে ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, বাকি অর্থ পুনরায় কোনও বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করে কোথাও পাচার করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম ইনকোয়ারার উল্লেখ করেছে, সোলেয়ার রিসর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনোতে গেছে ২ কোটি ৬০ লাখ আর ২ কোটি ডলার গেছে ইস্টার হাওয়াই ক্যাসিনো অ্যান্ড রিসর্টে। বাকি সাড়ে তিন কোটি ডলার কোথায় গেছে তার হদিস নেই। স্থানীয় জুয়ার আসরে ওই টাকা ঢোকেনি।

ডিজিসহ ৮ কর্মকর্তার মোবাইল কললিস্ট গোয়েন্দাদের হাতে

রিপোর্ট: গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে আতংকে আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডিজিসহ আট কর্মকর্তা। তাদের মোবাইল ফোনের তিন মাসের কললিস্ট যাচাই-বাছাই করছে অনানুষ্ঠানিকভাবে তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি, ডিবি ও র্যাব। রিজার্ভ লোপাটের বিষয়টি এই তিন সংস্থা পৃথকভাবে ছায়া তদন্ত করলেও গতকাল থেকে তদন্ত কর্মকর্তারা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশনা পেয়ে তদন্তকারী সংস্থাগুলো গত বৃহস্পতিবার থেকে নড়েচড়ে বসেছে। র্যাবের গোয়েন্দা শাখার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ফাইল ও পাসপোর্ট খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের কে কখন বিদেশ সফর করেছেন- সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। সিআইডি’র এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডিজিসহ আট কর্মকর্তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই করা হচ্ছে। তাদের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডও বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কল রেকর্ড থেকে হ্যাকারদের সঙ্গে তাদের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, গত বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে র্যাবের একটি টিমের বৈঠকে দাবি করা হয়েছিল, ব্যাংকের রিজার্ভ সার্ভারে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ তাদের কাছে দিতে বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে দেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের বাহির ও ভিতরে ১২শ’ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আছে। র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ভিডিও ফুটেজ ছাড়াই অন্য আলামতের মাধ্যমে বিষয়টি ছায়া তদন্ত করছি। তদন্তের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সহযোগিতা না করলেও তারা এই তদন্ত চালিয়ে যাবেন।

সন্দেহভাজন ৮ কর্মকর্তা ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেকেই আতংকে রয়েছেন। তারা এখন ব্যাংকের রিজার্ভ লোপটের বিষয়ে কারো সাথেই মোবাইল ফোনে কথা বলা তো দূরে থাক, সামনা সামনি কোন মন্তব্যও করছেন না। সূত্র: ইত্তেফাক






মন্তব্য চালু নেই