মেইন ম্যেনু

রিট-রুল-ডিরেকশনে সরগরম সুপ্রিম কোর্ট

বিদায়ী বছরের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রিট, রুল ও আদেশের জন্য আলোচনায় ছিল দেশের উচ্চ আদালত। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিন মামলা, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রী পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন, ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম নিয়ে রিট আবেদন এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় অধিকতর তদন্ত চেয়ে করা আবেদন বিদায়ী বছরে আদালত অঙ্গনে আলোচনায় ছিল। বছরজুড়ে আলোচনায় থাকা সর্বোচ্চ আদালতের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো :

নতুন প্রধান বিচারপতি : বিদায়ী বছরের ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ২১তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধান বিচারপতি মামলাজট কমানোর উদ্যোগ নেন, যার ইতিবাচক ফল এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

তারেকের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা : বছরের প্রথম দিকে উচ্চ আদালতের আলোচিত ঘটনা ছিল বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার আদেশটি। বিদায়ী বছরের ৭ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারের ওপর গণমাধ্যমের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন হাইকোর্ট।

আইনের দৃষ্টিতে পলাতক ও ফেরারি আসামি হওয়ায় বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকী লিনা তারেকের বক্তব্য বাংলাদেশের মিডিয়ায় প্রচার না করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

ব্রাজিলের ‘পচা’ গম : ব্রাজিল থেকে আমদানিকৃত গমের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিদায়ী বছরের ২৯ জুন ব্রাজিল থেকে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার নিম্নমানের গম আমদানিতে দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন পাভেল মিয়া নামে এক আইনজীবী। ৮ জুলাই বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ‘ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গম কাউকে জোর করে দেওয়া যাবে না এবং কেউ ওই গম ফেরত দিতে চাইলে কর্তৃপক্ষকে তা ফেরত নিতে হবে’— এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে এ বিষয়ে দায়ের করা রিট নিষ্পত্তি করে দেন হাইকোর্ট।

মায়ার মন্ত্রিত্ব নিয়ে রিট : দুর্নীতির মামলায় খালাসের রায় বাতিল হওয়ার পর কোন কর্তৃত্ববলে এখনো মন্ত্রী ও এমপি পদে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বহাল আছেন, তা জানতে চেয়ে বিদায়ী বছরের ৭ জুলাই আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ রিট আবেদন দায়ের করেন। শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের ওপর বিভক্ত আদেশ দেন। এরপর নিয়মানুযায়ী বিষয়টি শুনানির জন্য বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের একক বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি। পরে হাইকোর্ট বেঞ্চ সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট খারিজ করে দেন।

ঐশীর আপিল : পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও স্ত্রী স্বপ্না রহমানকে হত্যার মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাদের মেয়ে ঐশী রহমান বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছেন। বিদায়ী বছরের ৬ ডিসেম্বরে দায়ের করা আপিল আবেদনে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস চাওয়ার পাশাপাশি ঐশীর বিচার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

এই মামলার মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায়ের নথিসহ ডেথ রেফারেন্স গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টে আসে। গত ১২ নভেম্বর পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যায় তাদের একমাত্র মেয়ে ঐশী রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয় ঐশীকে।

সাত খুনের অধিকতর তদন্ত : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় পুলিশ চাইলে মামলার অধিকতর তদন্ত করতে পারবে। এ জন্য হাইকোর্টের নির্দেশের প্রয়োজন হবে না। সাত খুন মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য করা আবেদনের নিষ্পত্তি করে এই আদেশ দেন হাইকোর্ট।এই মামলার অভিযোগপত্র দাখিলের পর এর বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন জানায় নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। তবে তার আবেদন নারায়ণগঞ্জ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালত খারিজ করে দেয়। সেই খারিজের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এতে নূর হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও মামলার অধিকতর তদন্তের আবেদন জানানো হয়।

বিডিআর হত্যা মামলা : আলোচিত বিডিআর হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। রাজধানীর পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অবস্থিত ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ইতিহাসের কলঙ্কজনক এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন, ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে (তিন বছর থেকে ১৭ বছর পর্যন্ত) কারাদণ্ড, ২৭৮ জনকে খালাস দেওয়া হয়। আর ৪ জন আসামি বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পান।

রাজন-রাকিব হত্যার ডেথ রেফারেন্স : আলোচিত সিলেটের শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনার রাকিব হাওলাদার হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর। বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ‘ডেথ রেফারেন্স মামলা’ হিসেবে পরিচিত।

উল্লেখ্য, সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চুরির অপবাদে ১৩ বছরের রাজনকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালত। এ ছাড়া একজনের যাবজ্জীবনসহ পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। অন্যদিকে খুলনার মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিলরুবা সুলতানা ১২ বছরের রাকিবকে হত্যার দায়ে দুজনকে ফাঁসির আদেশ দেন।

খালেদার ৩ মামলা : উচ্চ আদালতে এ বছর বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার তিনটি দুর্নীতি মামলা সচল হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় ছিল। বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের হওয়া বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, গ্যাটকো ও নাইকো দুর্নীতি মামলা নামে পরিচিত এসব মামলার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে খালেদা জিয়াকে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

‘বনখেকো’র সাজা বহাল : এ বছরে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও সম্পদের হিসাব বিবরণীতে তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ‘বনখেকো’ ওসমান গনিকে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১২ বছরের কারাদণ্ডের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা মামলায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে ২০০৭ সালের ২৯ মে ওসমান গনির উত্তরার বাসায় অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা নগদ ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৬০০ টাকা, ১৩০০ ডলার, ৩ হাজার মালয়েশিয়ান রিংগিত ও প্রচুর স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে।

সন্ত্রাসী জোসেফের মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন : বিদায়ী বছরের শেষের দিকে আলোচিত ঘটনা ছিল পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তোফায়েল আহমেদ জোসেফের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়টি। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে তিন সদস্যের আপিল বিভাগ ব্যবসায়ী মোস্তফা হত্যা মামলায় নব্বইয়ের দশকের আলোচিত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তোফায়েল আহমেদ জোসেফের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে মামলার আরেক আসামি যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত কাবিল সরকারকে খালাস দেন আদালত। ১৯৯৬ সালে লালমাটিয়ায় ব্যবসায়ী মোস্তফা নামে ফ্রিডম পার্টির এক নেতাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে ওই মামলা হয়েছিল।-রাইজিংবিডি






মন্তব্য চালু নেই