মেইন ম্যেনু

রুশনীতির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়!

এই দশকের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর অন্যতম সিরিয়া সংকট। গত পাঁচ বছরের সহিংসতায় গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় মারা গেছে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি মানুষ। ঘরছাড়া হয়েছে আরও কয়েক লাখ। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আন্তর্জাতিকভাবে এই সংকটের অবসান ঘটেনি। বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি স্টেটবিরোধী অভিযানের নামে সিরিয়ার পরিস্থিতি আরও খারাপ করে ফেলে। সংকট দূর হওয়া তো দূরের কথা বরং সেই সংকট বেড়েছে আরও বহু গুণে।

সিরিয়ায় পশ্চিমা স্বার্থের সংশ্লিষ্টতা অনেকেই বোঝতে পেরেছেন। দীর্ঘদিন আইএসবিরোধী অভিযান পরিচালনার নামে সেখানে আইএসকে মদদ দেওয়া এবং তাদের কাছ থেকে তেল কেনার ব্যাপারটিও একসময় ফাঁস হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সমর্থন দেওয়া রাশিয়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিমান হামলা চালায় সিরিয়ার আইএস ঘাঁটিতে। সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে সে হামলা কতটা তীব্র ও কার্যকরী তা সবাই দেখেছে। রাশিয়ার হামলার চিত্র কেমন তা সন্ত্রাসীদের পালানোর ঘটনার মধ্যদিয়ে অনেকটা পরিষ্কারও হয়ে যাচ্ছে। সে সময় রাশিয়ার এই অভিযানে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ও তাদের মিত্রদের গায়ে তীব্র জ্বালা ধরেছে। কারণ পুতিনের সিরিয়া হামলা শুরু থেকেই পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বিরোধিতা শুরু করে। আর তাদের বিরোধিতার কারণও এখন সবার সামনে বেশ পরিষ্কার। মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে রুশবাহিনী আইএস সন্ত্রাসীদের পরাভূত করতে সমর্থ হয়েছিল।

তবে আশার খবর হলো এই, রুশবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সম্মত হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া একসঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে বাশার আল আসাদের থাকা না থাকার বিষয়টি সে দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে রাশিয়ার এই দাবি আপাতত মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোয় তিন ঘণ্টার বৈঠকে অংশ নেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। জন কেরি ও পুতিনের সে আলোচনায় সিরিয়া সংকট নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিবদমান দূরত্ব কিছুটা হলেও কমেছে। আর এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার নীতির কাছে মাথানত করল।

সিরিয়া নিয়ে আপাতত পুতিনের কথাকেই মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নিজেদের নীতি থেকে বরাবরই সরে আসার অভ্যাস রয়েছে এই পরাশক্তির। নিউইয়র্কের বৈঠকে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, তারা ইন্টারন্যাশনাল সিরিয়া সাপোর্ট গ্রুপের এই মন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনার পক্ষে। নিউইয়র্কের ওই বৈঠকে সমঝোতা হলে তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আকারে তোলার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাবে। পরিণামে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার এবং সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে অস্ত্রবিরতি এবং রাজনৈতিক আলোচনায় মধ্যস্থতা করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তথাকথিত সরকার পরিবর্তন চান না। আর রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার কোনো উদ্দেশ্যও নেই যুক্তরাষ্ট্রের।

সিরিয়ায় কীভাবে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটানো হবে তা নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ ছিল। তবে বাশার আল আসাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া চায় সিরিয়ার জনগণই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জন কেরির সর্বশেষ ঘোষণায় এটা স্পষ্ট যে, বাশারের ব্যাপারে গত কয়েক মাসে মার্কিন নীতির পরিবর্তন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান আইএস প্রভাব মোকাবেলার বিষয়টিকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে ওয়াশিংটন। সম্প্রতি বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলা ঘটে, যা ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে হলে ঐকমত্য হওয়ার বিকল্প নেই। একটি নীতিগত সিদ্ধান্তে এক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র রুশনীতির কাছে এই পরাজয়।

২০১১ সালে এক বিবৃতিতে বারাক ওবামা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সরে যাওয়ার যে হুমকি দিয়েছিলেন তা থেকেও সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সিদ্ধান্তের ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে সিরিয়া রাজনীতির ভবিষ্যৎ। তার চেয়ে বড় কথা দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সে দেশের মানুষের জীবনও ইসলামি স্টেট জঙ্গিদের কাছে জিম্মি। এই আলোচনায় যদি সিরিয়ার সংকটের সমাধান হয় তা হবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর এর জন্য পুরো কৃতিত্বই পাবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন।



(পরের সংবাদ) »



মন্তব্য চালু নেই