মেইন ম্যেনু

রেললাইনের প্রতিটি স্লিপারে লাশ

কিছু কিছু স্থান ও পাত্র আছে যার নাম শুনলে পিলে চমকে উঠে। রহস্যপ্রিয় মানুষের জাগে জানার কৌতুহল, কাজ করে দূর্নিবার আকর্ষণ। এমনই পিলে চমকে ওঠা একটি নাম হলো বার্মা রেলওয়ে। এটি ডেথ রেলওয়ে বা বার্মা-সায়াম রেলওয়ে বা থাইল্যান্ড-বার্মা রেলওয়ে নামেও পরিচিত। এই রেলপথ দিনে দিনে ডেথ রেলওয়ে বা মৃত্যুর রেলপথ নামে পরিচিতি পেয়েছে। উল্লেখ্য, বার্মার নাম বর্তমানে মিয়ানমার এবং এর প্রাক্তন রাজধানী রেঙ্গুনের নাম ইয়াংগুন।

যারা চলচ্চিত্র প্রেমী তারা হয়তো ১৯৫৭ সালে অস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ব্রিজ অন দ্য রিভার কাউয়াই দেখেছেন এবং এই সিনেমা থেকে কিছুটা হলেও ডেথ রেলওয়ে সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। থাইল্যান্ডের কাঞ্চনাবুড়ি এলাকায় থাইল্যান্ড-বার্মা রেললাইনের কাউয়াই নদীর উপর রেলওয়ে সেতুকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে এই ছবির। মূলত: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাবাহিনী থাইল্যান্ড থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও রসদ সহজতর উপায়ে তৎকালীন বার্মায় আনা নেয়ার প্রয়োজনে তৈরি করে এই রেললাইন। কাউয়াই নদীর ওপর দিয়ে গেছে লাইনটি। এখানে নির্মিত হয় সেতু।

১৯৩৯ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের একপর্যায়ে জাপান সিদ্ধান্ত নিল থাইল্যান্ড থেকে বার্মা পর্যন্ত রেলসড়ক নির্মাণের। উদ্দেশ্য চীনের সাথে সহজে যোগাযোগ রক্ষা করা আর ভারতীয় উপমহাদেশের উপর সহজে নজরদারি। মূলত: কৌশলগত কারণেই জাপান থাইল্যান্ডের বান পং থেকে বার্মার থানবায়ুজায়াত পর্যন্ত ৪১৫ কিলোমিটার (২৫৮ মাইল) দীর্ঘ রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যতগুলো মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতমটি ঘটে এই থাইল্যান্ড-বার্মা রেলওয়ে নির্মাণের সময়।

জাপান এই রেলপথ নির্মাণে সময় নিয়েছিল মাত্র ১৬ মাস, যা বলতে গেলে অবিশ্বাস্য। অথচ তারা শুরুতে ধারণা রেখেছিল যে, এটি নির্মাণে সময় লাগবে পাঁচ বছর। তাহলে কীভাবে সম্ভব হল এত দ্রুত এত দীর্ঘ একটি রেললাইন নির্মাণ করার!

জাপানি সেনাবাহিনীর কাছে বার্মায় ১৯৪২ সালে আত্মসমর্পণ করে মিত্রবাহিনীর সেনাদল। এই বিশাল সেনাদলে ছিল ব্রিটিশ ও আমেরিকান এবং পর্তুগিজ সৈনিক। এক লাখ আশি হাজার শ্রমিক এবং ষাট হাজার যুদ্ধবন্দিকে নিয়ে এই রেলসড়কের কাজ শুরু করলেন জাপানি সেনা কর্মকর্তা হিরোশি অ্যাবি।

download (1)

এই রেলপথ নির্মাণে নিয়োজিত করা হয় এক লাখ আশি হাজার বা তার চেয়েও বেশি বেসামরিক শ্রমিক যাদের বলা হতো রমুশা। থাইল্যান্ড এবং বার্মার নাগরিকদের নিয়োগ করা হয়েছিলো নির্মাণকাজে। আরো নিয়োজিত করা হয় যৌথ বাহিনীর ষাট হাজার বন্দি সৈন্য। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর মানুষগুলোর প্রতি দিনের পর দিন চলতে থাকে অমানবিক আচরন। তাদের প্রতিদিনের দুই বেলা খাবার ছিল ভাত আর সবজি সেদ্ধ। সামান্য কারণে পেতে হত মারাত্মক শাস্তি। কথায় কথায় শ্রমিকদের জুটতো অমানুষিক নির্যাতন। পয়:নিষ্কাশনের অব্যবস্থার কারণে বন্দি সেনারা আক্রান্ত হতেন কলেরা, বেরিবেরি এবং ম্যালেরিয়ায়। এর কোন চিকিৎসা হতো না। ফলে পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। এই রেললাইন নির্মাণের সময় প্রাণ হারায় এক লাখ ছয় হাজার মানুষ। এর মধ্যে রমুশা অর্থাৎ বেসামরিক শ্রমিক মারা যায় ৯০ হাজারের বেশি। যৌথ বাহিনীর বন্দি সৈন্য মারা যায় ১২ হাজার ৬ শ’ ২১ জন। এর মধ্যে ব্রিটিশ ৬ হাজার ৯ শ ৪ জন, অস্ট্রেলিয়ান ২ হাজার ৮শ ২ জন, ওলন্দাজ ২ হাজার ৭শ ৮২ জন এবং আর্মেনিয় একশ তেত্রিশ জন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এই রেলপথ নির্মাণে যুক্ত জাপানি সেনাবাহিনীর একশ এগারো জন কর্মকর্তার বিচার শুরু হয় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে। বন্দি সৈন্যদের ওপর বর্বর আচরনের দায়ে ৩২ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়।

এই রেলপথ নির্মাণের কাহিনী নিয়ে রিচার্ড ফ্লানাগান একটি উপন্যাস লিখেন ‘দ্য ন্যারো রোড টু দ্য ডিপ নর্থ’ নামে। এই উপন্যাসের কাহিনী অবলম্বনে তৈরি হয় চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাউয়াই’।

মূলত: এই রেলসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলো ব্রিটিশ সরকার অনেক আগেই। সেই উদ্দেশ্যে ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাদের তৎকালীন কলোনি বার্মা থেকে থাইল্যান্ড পর্যন্ত রেলসড়ক নির্মাণের জন্য জরিপ চালায়। কিন্তু রুটটি অত্যন্ত দুর্গম ও বন্ধুর হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালের প্রথম দিকে জাপানি সেনাবাহিনীর হাতে বার্মার পতন ঘটে এবং জাপানিরা সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে জাপানি সৈন্যদের জন্য রসদ ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর উপায় ছিলো সমূদ্রপথ। মালয় উপদ্বীপ ঘুরে মালাকা প্রণালী ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে জাহাজ পৌঁছতো বার্মায়। এতে পাড়ি দিতে হতো ৩ হাজার ২শ কিলোমিটার (২ হাজার মাইল) সমূদ্র পথ। এই দীর্ঘ জলপথে মিত্র বাহিনীর সাবমেরিনের হামলার আশঙ্কা তাড়া করে ফিরতো জাপানি নৌবাহিনীকে। এই পরিস্থিতিতে রসদ সরবরাহ যাতে সহজ হয় এবং সময় কম লাগে সেই উদ্দেশ্যে জাপান সরকার বিকল্প পথ হিসেবে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে বার্মার রেঙ্গুন (ইয়াংগুন) পর্যন্ত রেলসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ১৯৪২ সালের জুনে রেলসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। প্রাথমিক কাজ শেষে মূল কাজ বার্মা অংশে শুরু হয় সে বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর আর থাইল্যান্ড অংশে শুরু হয় নভেম্বরে। রেলপথ নির্মাণ শেষ করার সময় ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর নির্ধারিত থাকলেও তা শেষ হয় ১৯৪৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর।

ব্যাংককের পশ্চিমে বান পং থেকে বার্মার থানবায়ুজায়াত পর্যন্ত এই মিটার গেজ রেল লাইনের ১১১ কিলোমিটার (৬৯ মাইল) বার্মার মধ্য আর ৩০৪ (১৮৯ মাইল) কিলোমিটার থাইল্যান্ডের মধ্যে। পরবর্তী সময়ে এই রেললাইন ব্যাংকক ও রেঙ্গুন পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়।

download

বলা হয়ে থাকে এই রেলপথ নির্মাণে প্রতিটি স্লিপারের জন্য প্রাণ গেছে একজন মানুষের। আর এ কারণেই এই রেলপথের নাম ডেথ রেলওয়ে। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হয়। এই রেললাইন দাঁড়িয়ে যায় কালের সাক্ষী হয়ে।

১৯৪৭ সালে লাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১০ বছর পর ১৯৫৭ সালে থাইল্যান্ডে লাইনের কিছু অংশ চালু করা হয়। বর্তমানে থাইল্যান্ডে কাঞ্চনাবুড়ি প্রদেশের কাঞ্চনাবুড়ি জেলার কাঞ্চনা স্টেশন পর্যন্ত এই রেললইন চালু আছে। থাইল্যান্ডের জিথ মিউজিয়ামে আজো প্রায় অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে রেল লাইন নির্মাণের সময় ব্যবহৃত রেল ইঞ্জিন, সে সময়কার সব স্মারক চিহ্ন। লাইন তৈরির সময় যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে প্রায় আট হাজার যুদ্ধবন্দি সৈনিকের সমাধি রয়েছে কাঞ্চনাবুড়ি শহরে সামাধিক্ষেত্রে।






মন্তব্য চালু নেই