মেইন ম্যেনু

রোকেয়ার প্রতি অবহেলা-৩

রোকেয়া পরিবারের ৩০০ একর জমির খোঁজ নেই

উপমহাদেশের নারীসমাজকে কুসংস্কারের দেয়াল ভেঙে আলোর দিগন্ত দেখানো বেগম রোকেয়ার নিজ বাড়ি পায়রাবন্দেই এখন সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে।

বিশ্বব্যাপী যখন রোকেয়াকে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, সেখানে পায়রাবন্দে তার আতুরঘরটি পড়ে আছে সীমাহীন অবহেলা আর অযত্নে। বেহাত হয়ে যাওয়া রোকেয়া পরিবারের সাড়ে ৩০০ একর জমি উদ্ধারে নেই কোনো উদ্যোগ।

সরেজমিনে রোকেয়ার জন্মভূমিতে গিয়ে দেখা যায় সব করুণ চিত্র। জেলা পরিষদ ৩০ শতক জমির ওপর সীমানাপ্রাচীর আর আঁতুরঘরটির ৫ বর্গহাতের মতো জায়গায় টাইলস বসিয়ে দায় এড়িয়ে গেছেন। দেয়ালের ভিতরের পুরো অংশে শ্যাওলা পড়েছে। যেন শ্যাওলার কার্পেট। রোকেয়ার সাড়ে ৩০০ বিঘার বেশি লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল। সেই জমিসহ প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে রোকেয়া পরিবারের ভিটেমাটি-পুকুরসহ মূল্যবান সব সম্পদ। অনেকে এসব নিজের নামে দলিল পর্যন্ত করে নিয়েছেন। কেবল ৩ একর ২৫ শতকের মধ্যে স্মৃতিকেন্দ্র এবং মাত্র ৩০ শতকের উপর বসতভিটার ধ্বংসস্তূপটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রোকেয়ার পৈতৃক নিবাসটি ঘিরে রাখার চেষ্টা করা হলেও পারিবারিক মসজিদটির গেটটি এখনো অরক্ষিত অবস্থায় অবহেলা-অযত্নে পড়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্মৃতি কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশে হোস্টেলের পাশের বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে পড়েছে। স্টোর রুম ও ভিআইপি রুমে উইপোকা ধরেছে। কমপ্লেক্সের দেয়ালে শ্যাওলা পড়েছে। এসব মেরামতের জন্য গণপূর্ত বিভাগ ২০১১ সালের ২৪ আগস্ট ১৮ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৭ টাকা অনুমোদন করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) বরাবর চিঠি দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই টাকা পাওয়া যায়নি। এখানকার দায়িত্বে থাকা বিকেএমইর সাবেক কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিলেও কেউ তাদের বলতে পারেনি টাকাটা ওঠানো যাবে কি না।

স্থানীয় শরিফুল ইসলাম ও শামিম মিয়া জানান, বেগম রোকেয়ার সাড়ে ৩০০ বিঘার বেশি লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল। কিন্তু তার নামে এখন এক শতক জমিও নেই। সম্পত্তিগুলো কোথায় গেল এর কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আজ পর্যন্ত পায়নি এলাকাবাসী। তিনি বলেন “রোকেয়া দিবস এলে কোনোমতে ধোয়ামোছার কাজ হয় এখানে। মেলা বসে। মেলাকে কেন্দ্র করে যারা রোকেয়ার জমি-জিরোত দখল করেছেন, তারাই লাভবান হন।

রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রর সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল জানান, বেহাত হওয়া জমিগুলো কুষ্টিয়ার টেগর লজ প্রপার্টিজের মতো সরকার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রোকেয়া স্টেটের নামে উদ্ধার করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য দীর্ঘ দাবি থাকলেও সরকারের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে একেবারেই উদ্যোগহীন বলে দাবি করেন তিনি।

বেগম রোকেয়ার ভাতিজি মসিহুজ্জামান সাবেরের মেয়ে রনজিনা সাবের বলেন, “আমাদের বেহাত হওয়া জমিগুলো উদ্ধারের জন্য দাবির পর দাবি জানিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে প্রশাসন রোকেয়াকে নিয়ে তামাশা করছে।”

বেগম রোকেয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ একরামুল হক জানান, আগে জেলা পরিষদের জায়গাটিতে মহিলাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। এখানে কোরআন শিক্ষার একটি প্রকল্প ছিল, সেটিও বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। এখন সেটা বন্ধ করে হ্যান্ডিক্রাফটের একটা সংস্থাকে লিজ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যেমে রোকেয়া স্মৃতিকে বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে।”

রংপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক মমতাজ উদ্দিন জানান, ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত জেলা পরিষদ নিজস্ব অর্থায়নে কুটির শিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরে প্রশিক্ষণার্থী সংকটের কারণে তা বন্ধ করে দিয়ে একটি বেসরকারি সংস্থাকে লিজ দেয়া হয়েছে।

স্মৃতিকেন্দ্রটির বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধান কর্তৃপক্ষ বিকেএমইএর সাবেক কো-অর্ডিনেটর আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল বলেন, “আমি নিজে গিয়ে জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে আদেশের কপি দিয়ে এসেছি। কিন্তু কোনো সদুত্তর পাইনি। সংস্কারের অভাবে ভিআইপি রুম ও স্টোর রুমের সব জিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সীমানাপ্রাচীর ধসে পড়ায় পুরো কেন্দ্রটি নিরাপত্তাহীন।






মন্তব্য চালু নেই