মেইন ম্যেনু

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কার হাতে?

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের সঙ্গে স্থানীয় বৌদ্ধদের চলমান সংঘাতের বাস্তবিক সমাধান কে করতে সক্ষম, তা নিয়ে অনেকে কৌতূহলী। অনেকে এই দায়িত্ব দেশটিতে গত বছর ক্ষমতায় আসা অং সান সু চি ও তাঁর ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকারের ওপর দিতে চায়।

রোহিঙ্গা ইস্যুটি ২০১২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ান, বাংলাদেশ সরকারসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ এই সমস্যার সমাধানে সহায়তা করতে পারে বলে অনেকের ধারণা।
তবে চূড়ান্ত দায়িত্ব মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণের ওপর নিহিত।

মিয়ানমারে ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধান দেশটির সেনাবাহিনীকে তাৎপর্যপূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে। সংবিধান অনুয়ায়ী, জাতীয় ও রাজ্যসভায় সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্ত বিষয়ের মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ সশস্ত্র বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করা ১১ সদস্যের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদে সেনাবাহিনীর আধিপত্য রয়েছে।

সেনাবাহিনী ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মন্ত্রণালয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে রোহিঙ্গা এলাকায় সহিংসতা মোকাবিলায় যুক্ত থাকায় সেখানে এনএলডির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারের চেয়ে সেনাপ্রধানের মনোভাবই প্রাধান্য পায়।

সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির হাইব্রিড কাঠামোর কারণে সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের বিপক্ষে যাওয়া সু চি ও প্রেসিডেন্ট থিন কিউয়ের জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জের বিষয়। আইনের শাসনের গুরুত্ব এবং রোহিঙ্গা ইস্যু তদন্তে একটি স্টেট অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল গঠনের বিষয়টি পুনরুল্লেখ সত্ত্বেও সেনাবাহিনীর অনুমোদন বা সহযোগিতা ছাড়া সহিংসতার অবসান ঘটানো সু চির জন্য কঠিন হবে।

বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সেনাবাহিনী যদি সত্যিকার অর্থে আগ্রহী হয়, তবে রোহিঙ্গা সমস্যার কার্যকর ও দ্রুত সমাধান আসতে পারে।

রোহিঙ্গা-সংকট সমাধানে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সুশীল সমাজের কণ্ঠস্বর। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো মিয়ানমারের স্বাধীন সুশীল সমাজ সংগঠিত বা শক্তিশালী না হলেও তারা পরিবর্তনের প্রতিনিধি বা চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে পারে।

বার্মিজ নৃগোষ্ঠীর প্রাধান্য থাকা সুশীল সমাজের গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গাদের পক্ষে কাজ করতে অনাগ্রহী। কারণ, তারা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের প্রকৃত নাগরিক বিবেচনা করে না। অধিকাংশ বার্মিজ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি সামরিক ও বেসামরিক এলিট দ্বারা প্রভাবিত। আবার এর বিপরীতও আছে।

রোহিঙ্গা বিষয়ে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা পালনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এই ইস্যুতে স্বাধীন গণমাধ্যম নিরপেক্ষভাবে তথ্য ও আলোচনা উপস্থাপন করছে। কিন্তু রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যমে তেমনটি হচ্ছে না।

বিভিন্ন ধর্মীয় পটভূমির মানুষের গোষ্ঠীসহ সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো যদি রোহিঙ্গাদের দুরবস্থার প্রতি ব্যাপকভিত্তিক সমবেদনা জানায়, তাহলে এখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়টির পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে।

রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কী উপায়ে করা উচিত, তা নিয়ে মিয়ানমারে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত। অথবা রোহিঙ্গা গ্রহণে ইচ্ছুক দেশগুলোতেও তাদের পাঠানো যায়। অবশ্য অন্যদের এই প্রশ্নের শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে সত্যিকারের ভাবনাচিন্তা আছে।

সাধারণ মানুষের ভূমিকা সুশীল সমাজের আচরণ প্রভাবিত করবে। রোহিঙ্গাদের সমর্থনে সামরিক নেতৃত্ব বা এনএলডি সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের আন্দোলন কিংবা চাপ থাকলে সামরিক-বেসামরিক এলিটরা রোহিঙ্গাদের প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নরম করতে পারেন।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাস করলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে স্বীকার করার বিষয়টি কঠিন বা কল্পনাতীত বলে অনেকে মনে করে। মিয়ানমারের জনগণের জন্য এই বিষয়টি বুঝতে পারা গুরুত্বপূর্ণ যে রোহিঙ্গাদের পরিচয় বা নাগরিকত্বের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সুরাহা ছাড়া দেশটি সব নেতিবাচক কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় থাকবে। আর রোহিঙ্গা ইস্যু নিরাপত্তা ও ভূখণ্ড-সম্পর্কিত হুমকি তৈরি করতে থাকবে, দেশটির শান্তি ও উন্নতি বাধাগ্রস্ত করবে।

সংখ্যালঘু এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ, সুশীল সমাজ ও জনগণের যথেষ্ট সোচ্চার না হওয়ার অন্যতম কারণ তাদের বিতর্কিত নামকরণ। সংখ্যালঘু মুসলিম গোষ্ঠীটি নিজেদের রোহিঙ্গা বলে। আর বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীর প্রতি ইঙ্গিত করে তাদের বাঙালি বলে মিয়ানমারের অধিকাংশ জনগণ।

অধিকারকর্মী ও গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদে রূপান্তর করা সু চিকে অবশ্যই সার্বিকভাবে ভোটারদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিতে হয়। সু চি নিজে একজন বার্মিজ। তিনি তাঁর দলের সহকর্মী ও সংখ্যাগরিষ্ঠ নৃতাত্ত্বিক বার্মিজ জনগোষ্ঠীকে হতাশ না করতে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত স্বাধীন কমিশন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উপায় খুঁজছে। এদিকে এনএলডি সরকার হয়তো ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের আওতায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

কঠোর এই আইনে কিছু রোহিঙ্গা হয়তো নাগরিকত্ব পাবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সরবরাহে ব্যর্থ হওয়ায় অনেকেই নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

রাখাইনে চলমান সহিংসতা তদন্ত এবং সেনাবাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে আনান কমিশনের পাশাপাশি মিয়ানমার সরকার গত বছরের ডিসেম্বরে একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেয়। এই কমিশনের প্রধান দেশটির সেনা-সমর্থিত ভাইস প্রেসিডেন্ট মিন্ত সোই। কমিশনে আরও ১২ জন সদস্য আছেন।

রাখাইনে সেনা অভিযানের সময় দমন-পীড়নের বিষয়ে বাইরের প্রতিবেদনের যথার্থতা যাচাই এই কমিশনের দায়িত্ব। আইন মেনে অভিযান হয়েছে কি না তা দেখবে তারা। ভবিষ্যতে সহিংসতা প্রতিরোধে তারা সুপারিশ দেবে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হামলা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের অভিযোগের পর কমিশনটি গঠন করেছিল মিয়ানমার।

বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করার সম্ভাবনা নেই। বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, যখন সম্প্রতি সফররত মিয়ানমারের এক প্রতিনিধিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ জনগণ কর্তৃক রোহিঙ্গাদের স্বীকারের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান রয়েছে।

আনান ও সরকার নিয়োজিত কমিশন সংকটের সম্ভাব্য সমাধান খুঁজছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমার সরকারকে সম্ভাব্য সব সহায়তা করা।

রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট। সংঘাত সমাধানে বিলম্ব হলে তা মিয়ানমার সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সূত্র : প্রথম আলো






মন্তব্য চালু নেই