মেইন ম্যেনু

লকেট মনে করাবে টিকার সময়

শিশু জন্মের পর প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন বা টিকা না দেয়া না হলে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হয়। সমাজের শিক্ষিত শ্রেণি এ ব্যাপারে সচেতন হলেও পিছিয়ে থাকে সমাজের নিরক্ষর মানুষ। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, টিকা দেয়ার হার পৃথিবীর অন্যান্য দেশের চেয়ে ভারতে সবচেয় কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সব দেশে যেখানে শিশুদের ৯০ শতাংশ টিকার হার নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে, সেখানে ভারতে এর হার মাত্র ৬০ শতাংশ।

আর এর কারণ হিসেবে ভারতের জণস্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষদের নিরক্ষরতাকেই দায়ি করে। তবে দেশটির শহরকেন্দ্রিক মানুষ সচেতন হলেও শিশুদের টিকা দানে পিছিয়ে আছে গ্রামের প্রান্তিক সাধারণ মানুষ। তেমনি একটি রাজ্য হলো দক্ষিণের রাজস্থান। শিশুদের টিকার ব্যাপারে রাজস্থানের অধিবাসীদের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে রাজ্য সরকার একটি ব্যাতিক্রমধর্মী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।

একটি লকেট তৈরি করা হয়েছে যাতে কিনা ইলেক্ট্রোলাইসিস প্রক্রিয়ায় সব ধরণের ডাটা বা তথ্য সংগৃহিত থাকবে। একটি শিশু জন্মের পর তার যাবতীয় চিকিৎসা তথ্য ছোট ওই লকেটের মধ্যে সংরক্ষিত থাকবে এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানের জন্মের পর তাকে তা পড়িয়ে দেয়া হবে। প্লাষ্টিকের এই লকেটটি কালো সূতা দিয়ে বেধে শিশুদের গলায় পড়িয়ে দেয়া হয়। এই লকেটটি রাজাস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামে বেশ সাড়া ফেলেছে। আর এই অভাবনীয় লকেটটির নাম দেয়া হয়েছে খুশি বেবি।

এই লকেটি শিশুর গলায় পড়া থাকলে খুব সহজেই একটা শিশুকে কখন কোন টিকা প্রদান করতে হবে তা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি বাবা-মা যদি ভুলেও যায় তাতেও নেই কোন সমস্যা। লকেটটিতে থাকা ডাটা বা তথ্যের সূত্র ধরে স্বাস্থ্য কর্মীরা ঠিকই সেই নির্দিষ্ট শিশুটির কাছে পৌছে যাবে এবং যথাসময়ে গিয়ে শিশুটিকে সঠিক টিকা প্রদান করে আসবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা চাইলেই যখন তখন খুশি বেবি নামে এই লকেটিতে সংরক্ষিত ডাটায় প্রবেশ করতে পারবে।

রাজস্থানেই জন্ম নেয়া আট মাস বয়সের গুড়িয়া দামুর নামের একটি শিশুর গলায় কিছুদিন হলো এই লকেটটি পড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে এখন পর্যন্ত তাকে যত প্রকার টিকা দেয়া দরকার সবগুলোই বেশ ভালোমতো পেয়েছে সে। গুড়িয়াকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে গ্রামের অন্যান্য মায়েরাও তাদের শিশুদের জন্য টিকার তথ্য সংগৃহীত এই লকেটটি পড়ানোর জন্য তাদের সন্তানকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। হাতে কলমে লিখা টিকার যাবতীয় তথ্য সব বাবা-মায়ের পক্ষে মনে রাখা সম্ভব না। তার উপর বাবা-মা যদি নিরক্ষর হয় তাহলে তো কথাই নেই। তাদের সন্তানটিকে জন্মের পর কোন টিকা দিতে হবে বা কোন টিকাটি দেয়া হয়েছে কোন ব্যাপারেই তারা অজ্ঞাত থাকে না। ফলে এই ছোট লকেটটি তাদের সব সমস্যা দূর করবে এবং প্রত্যেক শিশুর সঠিক সময়ে সঠিক টিকা পাওয়ারও সূযোগ পাবে।

এই ব্যাপারে গুড়িয়ার মা বাবলি বলেন, ‘এই লকেটটির কাছে আমি খুবই কৃতজ্ঞ। আমি পড়ালেখা জানি না। তা ঠিক মতো বলতেও পারবো না কখন আমার শিশুকে কোন টিকা প্রদান করতে হবে। কিন্তু এই লকেটটি অনেকাংশে আমরা চিন্তা দূর করে দিয়েছে।’ এই লকেটটির ডিজাইন তৈরি করা হয়েছে কিছুটা এরকম যা দেখতে তাবিজের সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্য আছে। এ বিষয়ে বাবলি আরো বলেন, ‘আমাদের এই অঞ্চলের নারীরা তাদের সন্তানদের গলায় কালো সুতা দিয়ে তাবিজ পড়ায়। যাতে করে সন্তান নানারকম অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়। কিন্তু বর্তমানে এই লকেটটিই আমাদের কাছে সেই তাবিজের মতো’।

লকটটি তৈরির পেছনে কাজ করেছেন এমন একজন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ বলেন, সাধারণত গ্রামের মানুষের কুসংস্কারকে আমরা তথ্যপ্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করেছি। লকেটটি কিনতে পাওয়া যাবে নূন্যতম দামে। এই লকেটটি সবার প্রথম ডিজাইন করেছে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাত্মক বিভাগের শিক্ষার্থীরা ২০১৩ সালে। ধাপে ধাপে সেগুলো পরবর্তীতে গ্রামের এনজিওগুলোতে পাঠানো হয়। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারত সরকারের তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার ইউএস ডলার ব্যয় হয়। ইতোমধ্যে ১৫’শ শিশুকে এই লকেটটির আওতায় আনা হয়েছে। আর এই সেবা আরো উন্নত করার লক্ষে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন অনেক স্বাস্থ্যকর্মীরা। উল্লেখ্য যে, সঠিক সময়ে সঠিক টিকা প্রদানের মাধ্যমে ভারতের শিশুদের উন্নত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করাই এই লকেট প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।






মন্তব্য চালু নেই